মুক্তধারা

আমি কথন | সুস্মিতা জাফর

মাঝে মাঝে আম্মুকে দেখে আমার খুব কষ্ট লাগে,যদিও কখনো বলি নাই,বুঝতে দেই নাই।

আমার মা-খালা-মামারা বড় হইসে এক চমৎকার সাংস্কৃতিক পরিবারে। আমার নানা একজন আর্টিস্ট ছিলেন, আমার নানুও, তিনি ঢাকা আর্ট কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্রী! শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ছিলেন আমার নানুর সরাসরি শিক্ষক!

বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে আমার শুধু মনে হত পাশের বাসার ইশার আম্মু, নিচতলার সোনিয়ার আম্মু, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড মনীষার আম্মু, কারো আম্মু তো চাকরি করে না,তাহলে আমার আম্মু কেন করে? আরো বড় হওয়ার পর মনে প্রশ্ন এল, আম্মুদের কথা না হয় বাদই দিলাম, আমার দুই খালা চাকরি করে,অর্থাৎ তাসমি আর শ্রাবন্তী-র আম্মু চাকরি করে, আচ্ছা অন্যদের নানুরা তো চাকরি করে না,আমার নানু কেন করে?

স্বভাবতই এই প্রশ্ন মনে আসত, কারণ আমরা তিনটা ভাই-বোন সারাক্ষণ আম্মুকে মিস করতাম,আর বিকাল থেকেই বারান্দায় দাঁড়ায় থাকতাম-আম্মু কখন আসবে বাসায়,আম্মুকে খুব মিস করতাম। এই আম্মুদের চাকরি করা ব্যাপারটাকে আমরা আসলে তখন একটা ভয়াবহ ঘটনা বলে মনে করতাম! আব্বু বাসায় না থাকলেও আমাদের এতটা একাকী লাগত না, যতটা আম্মু না থাকলে লাগত!

আমার নানা-নানুর মত আমার খালা-মামারা এক একজন জিনিয়াস। আম্মুরা তিন বোন ১৯৬৯ সালে ছবি আকায় All Pakistan Award পেয়েছিল। জন্মের পরেই দেখতাম,আম্মু কার্ডবোর্ড কেটে কাপড় দিয়ে পুতুল, শো পিস বানাত। ঢাকা শহরে থেকেও প্রতি শীতে আমরা দুই বোন আগুন পোহাতাম বাসার রান্নাঘরে, আম্মু পাশে গ্যাসের চুলায় ভাপা,চিতই,দুধ পুলি-একের পর এক পিঠা বানাত। সেলাই মেশিনের শব্দ শুনলেই বুঝতাম,সামনে ঈদ আসছে, আম্মু দুই বোনের পোশাক বানাচ্ছে! ঘর জুড়ে বিছানার চাদর,কুশনের কাভার বিছিয়ে চলত আম্মুর হ্যান্ড পেইন্ট এর কাজ!! আমরা দুই বোন ৪ এবং ২ বছর বয়স মুগ্ধ হয়ে আম্মুর কাজ দেখতাম। আম্মুর বানিয়ে বানিয়ে বলা গল্প না শুনে আমরা ভাতই খেতে পারতাম না! আমাদের দুই বোনেরই হারমোনিয়াম এ হাতেখড়ি হয় আম্মুর কাছে ৪.৫ বছর বয়সে!

আম্মুর সেই সব দিন সৃজনশীল দিনগুলো আচমকা অদৃশ্য হয়ে গেল, কারণ, আম্মুর চাকরি হয়ে গেছে! সেলাই মেশিনটা একদিন বিক্রি করে দিল। ঘর ভর্তি রঙ গুলো শুকিয়ে গেল কবেই চাকরি হওয়ার পরও কিছু কিছু কাজ সে করত। কিন্তু ভাই জন্মানোর পর সেসবও গেল আস্তে আস্তে আম্মু সব বন্ধ করে দিল,অথবা সব আসলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সংসারের চাপে, চাকরির চাপে,আমাদের চাপে! কলেজে উঠার পর বাসা গুছানোর সময় আম্মুর একটা এত্ত মোটা স্কেচবুক খুঁজে পাই আমি,যেটায় প্রায় ১৫-১৬ বছর নতুন কিছু আর আঁকা হয় নাই।

আমরা তিন ভাই-বোন আমার মা-খালাদের কোন গুণই পাইনি, এখন আমি টুকটাক হাতের কাজ শেখার জন্য আম্মুকে কিছু বললে,বলে,কী জানি,কিছু তো এখন আর পারি না,সব তো ভুলে গেছি। কেন যেন মনে হয়,কোথায় যেন একটা দীর্ঘশ্বাস ঘুরে বেড়াচ্ছে!!

আমি জানিনা, সবকিছু ভুলে যাওয়ার কারণে আম্মুর মনে কোন কষ্ট আছে কিনা, কিন্তু আমার আছে,আমার ভিতরটা আফসোস এ ভরে যায়, মনে হয়, সারাটা জীবন আম্মু শুধু আমাদের জন্যই ইনভেস্ট করল,তাহলে নিজের সত্ত্বাটা কোথায় গেল? অবশিষ্ট কী থাকল?

সংসার-সন্তান-চাকরি সব তো হল এর বাইরেও নিজের জন্য কিছু সময় তো রাখতে হয় নিজের জন্য কিছু একটা করতে তো হয় একদম নিজের মত কিছু।

So,Invest time for yourself!