অনুরণন

এক বাবার কথা

মা আমার মা, মা যে আর আগের মত মুখ ফিরে চায় না। আগের মত আর আমায় বাবা বলে ডাকে না। কোন কথা ছাড়া আর আমার কাছে খুব একটা আসে না। মা আমার মা পুতুল মা সোনার মা আমার আদরের লক্ষ্মী বেটি। বেটি আমায় আগের মত আর ডাকে না।

এমনও হয় তিনদিন পর সে আমায় বাবা বলে ডাকে। হ্যাঁ আমার বেটি আমার যত্ন ঠিক আগের মতই নেয়। আমায় নিয়ম করে ঔষুধ খাওয়ায়। আমার দিকে অনেক খেয়াল রাখে। সব কথার উত্তর সে হাসি মুখেই দেয়। আমি জানি আমি জানি আমার মেয়ে আমাকেই সব থেকে বেশি ভালোবাসে।

এখন আমি নিজেই তার কাছে স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য ভাবে আগের মত কথা বলতে পারি না। মেয়ে যতই আগের মত কথা বলুক কিন্তু মেয়ের চোখের ভাষা যে আমি বুঝতে পারি।

ওর চোখের ভাষা বড় অভিমান। খুব করে বলেছিলো ওর বিয়েটা না করে দিতে। খুব বলেছিলো শুধু পা টাই ধরেনি।

তখন মেয়ের কোন কথা শুনিনি। ভেবেছিলাম মেয়ে হয়তো না বুঝেই এসব বলছে। তাই মেয়ের কোন কথার গুরুত্ব আমি দেই নি।

আমি মেয়ের ভালর জন্যই মেয়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়েটা দিলাম। মেয়ে আমায় বার বার করে বলেছিলো ছেলের সাথে আমার কথার কোন মিলে না শুধু ঝগড়া লাগে। এ্যাংগেজ টা বাতিল করতেই পারো এটা কোন ব্যাপার না। শুধু বিয়েটা হতে দিও না।

মেয়ে আমায় অনেক অনুরোধ করেছিলো আমি কোন কথা শুনিনি। মেয়ের ভাল হবে ভেবে মেয়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়েটা দিলাম। মেয়ে বার বার বলেছিলো যেখানে ঝগড়া লাগে পরিবারের কোন ম্যাচিং হচ্ছে না এভাবে সম্পর্ক করা সাধারণত সম্ভব হয় না।

এটা সারাজীবনের ব্যাপার তাই নিজেকে গুছিয়ে ধীরে সুস্থে তারপর বিয়েটা করতে চাই। কিন্তু এই ছেলেকে বিয়ে করবো না।

মেয়ের আমি কোন কথা শুনিনি। শুরু থেকেই সে না করছিল যখন আলাপ চলছিল । ভেবেছিলাম আঠারো বছরের মেয়ে আমার কিইবা বোঝে ।

মেয়ের বিয়ের পর ছেলের আর ছেলের পরিবারের যা বুঝতে পারলাম তাতে বুঝলাম মেয়ের আমি অনেক বড় সর্বনাশ করে ফেলেছি। এখন আমার মেয়ের কি হবে! কি হবে আমার মেয়ের! বাবা হয়ে মেয়ের আমি এত বড় সর্বনাশ করে ফেললাম।

আমি তো ওর ভাল চেয়েছিলাম। আমার ছোট্ট আদরের খুকির আমি ভাল চেয়েছিলাম। এমন মেয়ে খুব কম আছে ঘরে। খুব কম মেয়েই আছে যে কিনা কোন ছেলে ডিস্টার্ব করলে বা চিঠি দিলে তা সরাসরি বাবার হাতে তুলে দেয়। বাবাকে সব বন্ধুর মত খুলে বলে। এমন কথাও সে সরাসরি বলে দেয় আমার বাবা এটা পছন্দ করেন না আমাকে স্কুলে পাঠানো হয় পড়ানোর জন্য প্রেম করার জন্য না।

যখন মেয়ে আমার পড়া নিয়ে সিরিয়াস হয়ে কথা বলল তখন আমি ওকে বিয়ে দিয়ে দিলাম। না রে মা তোর সর্বনাশ আমি করতে চাইনি তুই আমাকে ভুল বুঝিস না।

ঠিক আছে তুই আমাকে আগের মতই ভালোবাসিস কিন্তু তোর চোখে যে আমি অভিমানের ভাষা বুঝে যাই। এখন বলিস মুখে ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়াই কিছু মনে করিস নি কিন্তু তোর চোখ বলে আমার কথা কেন তুমি শুনলে না।

আমায় ক্ষমা করে দিস মা যখন কথাটা আমি বলি তখন আমাকে খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিস যে এটা তো আপনার কোন ভুল নয়। যা হবার তো হয়েই গেছে । উল্টো কত শান্তনা দেস আমার অসুস্থ শরীরের কথা ভেবে ।

আমি সব বুঝি মা তুই আর আগের মত নেই রে মা আমি সব বুঝি।

আমার আদরের ছোট্ট খুকিটির মুখে শিরশির দিয়ে আমার পুতুলের মত মেয়েটাকে ঘুমিয়ে দিতাম। তুই যখন ঘুমাতি তোর মুখটা আর্ট করা এক অপূর্ব সুন্দর লাগতো। আমার মেয়ে কত সুন্দর দেখতে।

জানিস আমি না খুব দুষ্ট ছিলাম বাড়ির সবাই আমার ব্যবহারে অতিষ্ঠ ছিল। খুব ছোটবেলায় আমি আমার মাকে হারিয়েছি তোর দাদুমনিকে খুব ছোট্টবেলায় হারিয়েছি। ঠিকভাবে আর বড় হয়ে উঠতে পারছিলাম না। খাপছাড়া বেখেয়ালি চলাফেরা ছিল আমার।

তুই যখন পৃথিবীতে আসলি তোর ছোট্ট সুন্দর মুখখানা আমায় শিখিয়ে দিল কিভাবে চলতে হবে ফিরতে হবে। তুই আমায় পরিবর্তন করে দিলি। মা হয়ে আমায় যেন মানুষ করলি। তোর ওই মায়ামাখা মুখ আমার পৃথিবী বদলে দিল। আমি বেশ খেয়ালি মানুষ হয়ে গেলাম।

তোকে ছাড়া আমি ভাল থাকতে পারি না। একবার নানুবাড়ী গেছিলি বেড়াতে এগারো দিন ছিলি। আমার ঘরে তোর ছবি টাঙ্গিয়ে রাখলাম কারণ তোকে আমার একদিন না দেখলে আমার দিন যায় না। তুই তা বুঝবি না মা হলে তারপর ঠিক বুঝবি। তোকে যে আমি কত্ত ভালোবাসি এ কথা আমার ফুরুবে না।

তোর জীবনটা যে এলোমেলো হয়ে গেলো। চোখের সামনে তোর এই এলোমেলো জীবন আমি আর দেখতে পারছি না। জানি তোর সংসারটা টিকবে না।

কোন উপায় না পেয়ে তোর নামে জায়গা বাড়ি করে দিতে চাইলাম কোন রকম সংসারটা যেন টিকে এই ভেবে। কিন্তু ছেলে উল্টো যখন কিছু টাকা দিয়ে তার নামে জায়গা বাড়ি করে চাইলো তখন আমার কিছু টাকার সমস্যায় তোর নামে আর করা হল না। ব্যাপারটা ওই পর্যন্তই থেমে থাকল।

বাবা হয়ে বুঝি তোর সামনে অনেক অন্ধকার। সেই অন্ধকারে এই আমিই তোকে ঠেলে দিয়েছি। এই অপরাধী বাবা তোর সামনে দাড়াতে পারে না লজ্জায়। খুব অপরাধী লাগে রে মা।

তুই যতই হাসিমুখে কথা বলনা কেন তোর অভিমানের ভাষা যে আমি বুঝি ঠিক বুঝি। তোর চিন্তায় দিন দিন আমি অসুস্থ হচ্ছি এইটা বুঝতে পেরে তুই আমাকে আর কত শান্তনা দিবি মা। বাবার ভুলে কোন মেয়ের এত বড় সর্বনাশ কোন বাবাই সহ্য করতে পারে না। আমায় ক্ষমা করে দে মা আমায় ক্ষমা করে দে।

তোর সামনে যেতে আগের মতো পারি না। জড়িয়ে ধরতে পারি না বুকটা খালি খালি লাগে। দূর থেকেই বলি এই বাবা তোকে অনেক দোয়া দিল দেখবি একসময় এত সমস্যা তোর আর থাকবে না। জীবনের প্রথম দিকে এত কষ্ট পেলি তো পরে এত কষ্ট তোর আর থাকবে না।

আমি ভাল নেই তুই ভাল না থাকলে আমি ভাল থাকি কি করে। তোর ভাল সময় ফিরে আসলে তখন আমিও ভাল থাকবো রে মা।

লিখেছেন: জিলফিকা জুঁই