অনুরণন

ইতি মৃণালিনী

এই বুঝি হাত ফসকে গেলো জীবন!! ইদানিং এই কথাটাই ঘুরেফিরে বারবার মনে হয় মৃনালিনীর। না পাওয়া তো থাকেই সবার। ওরও আছে। না পাওয়া আর কষ্ট দেয়না ইদানিং। বরং না দিতে পারাটাই ঘুরে ঘুরে মনে আসে ইদানিং। কতো হাজারো কারণে জীবনে কতো কিছু দেয়া হলো না, জীবনকে কতো কিছু দেয়া হলো না…! তাই কি জীবনটাই অমন অভিমানী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো! হায় জীবন….. তোমার কাছে আমার সব সীমাবদ্ধতা জিতে গেলো! শুধু তুমিই হেরে গেলে বারবার!

তপ্ত দুপুরে কাঠঠোকরার একঘেয়ে ঠুকঠুক আর কোন এক নাম না জানা পাখির ডাকে সেই জীবনটাকে একটু একটু করে মিলিয়ে নেয়া যায় যেনো! জীবনটাও ঠিক যেনো এরকমই ছন্দে গাঁথা। নানা রকম নাম না জানা ডাক, আর পরিচিত একঘেয়ে ঠুকঠুক, এইই যেনো জীবনের পরিচয়, এককথায়! আহ জীবন! হাত ফসকে গেলো বুঝি….

নাম না জানা সেই পাখির ডাক, অবিকল মৃণালিনীর ডাকনামের মতন! মিনু মিনু মিনু করে পাখিগুলা ওকেই যেনো ডাকে সারা দুপুর। যেমন এক দুপুরে ডেকেছিলো অতুল, তেমনি করে! আহ অতুল…. তোমাকে ভুলেই গিয়েছি সেই কবে! তবু তুমি প্রতি দুপুরে নাম না জানা পাখির ডাকে ফিরে ফিরে আসো আমার মনে। তোমাকে আর তোমার সেই মিনুকে কবেইতো হারিয়ে ফেলেছি জীবনে! আহ আবার সেই জীবন… হাত ফসকে গড়িয়ে গেলো শুকনো বালুর মতন! ধরতে গিয়ে মুঠো শক্ত করতে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখি, আরো যেনো সব পালিয়ে গেলো! আহ জীবন…. কতো কিছুই শেখালো এই জীবনে…

ছেলেবেলায় মৃণালিনী খুব ভিতু ছিলো। শৈশব কৈশোরের দুরন্তপনা কম ছিলো ওর। মা কে ভয় পেতো, বাবাকে তো বটেই! দুপুরে সবাই ঘুমিয়ে গেলে ওর ঘুম আসতো না। সেই একলা একা জেগে থাকা দুপুরটাকেও ভয় লাগলো কখনো! ভিতু ছিলো বলেই তো অতুলকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো! ওর আত্মার একটা অংশ অতুলের সাথে চলে গিয়েছিলো বলেই কি সারাজীবন এমন শূন্য লাগলো ওর! কম বয়সে তখন বুঝে উঠতে পারেনি, কী হতে যাচ্ছে। যার মাশুল সারাজীবন ধরে দিয়ে গেলো মৃণালিনী। সময় সবকিছুই বলে মিলিয়ে দেয়, সারিয়ে দেয়। কিন্তু সময় নিজে কখনো ফেরে না! এইযে দীর্ঘ সময় ধরে ও একা চললো জীবনে, অতুলকে হারানোর দুঃখের চেয়ে বেশি দুঃখ নিজেকে চিনতে দেরী হয়েছিলো বলে। এই যে এখন ও দুর্বিনীত, জেদী, রাগী, একরোখা, গোয়ার, সাহসী আর একা, তার সবটাই যেনো সময় মতো নিজেকে কিছু দিতে না পারার আক্রোশে। অতুল শুধু সেই সবকিছুরই একটা প্রতীক হয়ে জ্বলে রইলো।

একা থাকতে ভাল্লাগে মিনুর। এটাও এর পাওনা, এটাই চেয়েছিলো হয়ত একসময়। সময় সেই চাওয়া পূরণ করলো ঠিকই, কিন্তু অনেক কিছুর বিনিময়ে। গোটা জীবনটাই যে হাত ফসকে চলে গেলো এই অবসরে, এই প্রহেলিকায়! অতুলের চেহারাটাও প্রায় ভুলে গেছে মৃণালিনী। লম্বা ছিলো কি খুব? ফর্সা নাকি মেটে রঙা..? কিছুই মনে নেই। শুধু চোখজুড়ে একটা বিপন্ন বিস্ময় খেলা করতো সবসময়, সেই চোখজোড়া অবিকল মনে গেঁথে রইলো সারাজীবন। নাহ, অতুলকে নিয়ে কেনো জানি কোন দুঃখ হয় না ওর। শুধু সারাজীবনের সব না পাওয়ায়, সব না দেয়ায় ঐ চোখজোড়া চোখের সামনে চলে আসে। অতুল….. মৃণালিনীর মনের চিলেকোঠার ডাকনাম হয়ে রয়ে গেলো সারাজীবন!

লিখেছেনঃ রিফাত লাইলা