মুক্তধারা

শিশুবেলা

জিলফিকা জুঁইঃ আম্মু এটা কিভাবে ব্যাবহার করে ? এটা কি ?
প্রশ্নটা করতেই আম্মু কোন উত্তর দিল না উল্টো আরো ভয় দেখিয়ে বলল এখানে ভুলেও হাত দিবা না অনেকটা ধমক আর ব্যস্ততার সুরে । এতই ভয় পেলাম ভাবলাম না জানি হাত লাগালেই শক করবে । কারেন্ট কিনা কিন্তু যন্ত্রটার উপর তো সুতা প্যাঁচানো । কারেন্টের জিনিসে তো সুতা থাকে না !
তাহলে অন্য কিছু হবে হয়তো ।

এটার নাম কি কাকে প্রশ্ন করবো বুঝতে পারলাম না । সবসময় চুপচাপ থাকতে ভালও লাগে না । আম্মু যখন কোন প্রশ্নের উত্তর দেয় না তখন নিজেকে কেমন জানি লাগে । কেন জানি সবসময় চুপচাপ বসে থাকতে হয় ।

সারাদিন আম্মু ছোটাছুটি করে কিন্তু আমার জন্য আম্মুর যেনো একমিনিটও সময় নাই ।
ফুফুর বাসায় বেড়াতে গেছিলাম । ফুফুর মেয়ে ফুফুকে যে প্রশ্নই করুক সব প্রশ্নের উত্তর দেয় ফুফু কত্ত ভাল । তাদের কথা বসে বসে শুনতে আমার খুব ভাল লাগে ।

আচ্ছা আম্মু কোন প্রশ্নের উত্তর দেয় না কেন ? সারাক্ষণ খালি ছোটাছুটি করে ।
আচ্ছা ফুফুকে আমি মামণি বলে ডাকি কেন ? ফুফুকে প্রশ্নটা করলে নিশ্চয় উত্তর দিবে । বললাম মামণি তোমাকে আমি মামণি বলে ডাকি কেন ? বাকি সব ফুফুদের ফুফু বলে ডাকি কিন্তু তোমাকে কেন মামণি বলি ।

মামণি বলল আমি তোমাকে মামণি বলি তাই তুমিও আমাকে মামণি বলো ছোটবেলা থেকেই তোমার শুনতে শুনতেই এমনটা অভ্যাস হয়ে গেছে । কথাগুলো কি সুন্দর আদরের সুরে বলল মামণি । অবশ্য বাকি ভাই বোনেরাও সবাই আমরা এই ফুফুকে মামণি বলেই ডাকি । ইশ মামণি দেখতে কত সুন্দর । আমি যদি বড় হয়ে মামণির মত দেখতে হতাম । এত সুন্দর মানুষ হয় কি করে । মনে হয় আমি অনেকটা মামণির মত দেখতে হয়েছি । তা ছোটবেলায় মনে হত আর এখন মনে হয় মামণির মত সুন্দর হই নাই ।

মামণির বাসায় বেড়াতে এসেছি অনেকদিন পর কি মজা । মামণির বাসা পার হয়ে একটু পাশে বেশ বড় নদী । নদীর নাম যে কি কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয় নি ।
সকালবলা খেয়েদেয়ে ঘুরতে বের হতাম । নদীর কাছেই আমার থাকতে বেশি ভাল লাগতো । কি যে হাওয়া ! মনে হয় আমায় উড়ে নিয়ে যাবে । আচ্ছা হাওয়া কি মানুষকে উড়ে নিয়ে যেতে পারে ? এ প্রশ্নটাও আর কাউকে করা হয় নি । ভাবলাম বোনটাকে বলবো থাক না জানি হাসাহাসি করবে । মনের এত প্রশ্ন কাকে যে করব বুঝে উঠতে পারি না ।

লোকগুলা কি সুন্দর নৌকায় উঠে ওপারে চলে যাচ্ছে । নৌকাটা কত বড় কি সুন্দর নদী । নদীর পাশে পাশে মাটির কিছু ফাটল ধরা । পাশে কিছু কিছু মাটি পরে যেতে ধরে পরে যায়নি । আমি যদি সেখানে দাড়াই মাটির সাথে আমিও সেখানে পরে যাবো । আমি তো সাতার জানি না লোকগুলো কি আমায় তখন বাঁচাবে । দাড়িয়ে দেখি তো পরে যাই কিনা । অমনি বোনটা চিৎকার করে উঠল পরে যাবে পরে যাবে ওখানে যাও না এই পাশে দাড়াও । এমনভাবে বলল যেনো এখানে দাড়িয়ে বড় বোকামি করেছি ।

বোনের সাথে আরেকটা মেয়েও জুটেছে । বোনটা একদম কথা শুনতে চায় না ঘুরাফেরা হতে না হতেই খালি বাড়ি বাড়ি করে । কি একটু ভাল করে ঘুরবো খালি বাড়ি যাবো বাড়ি যাবো । এবার ওকে বাদ দিয়ে এই মেয়েটার সাথে ঘুরতে হবে ।

মেয়েটা চঞ্চল এর সাথে ঘুরতে মজা লাগবে । বোনটার যন্ত্রণায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছি ওমনি একটা সাইকেলে উঠা ছেলে সাইকেল থামিয়ে বলছে এই মেয়ে তোমার নাম কি ? নাম বলবো না তাই চলে আসছিলাম আর উনি পিছু নিয়েছেন । বোনটা বলতে বলছিলো,বলো নাম শুনে তোর কাম কি ? কিছুই বলিনি আমি । কি জানি বাবা ছেলেধরা কিনা কে জানে । এমন অবস্থায় বোনটা অমন পাকনা হাসি হাসছে কেন ? এতে পাকনামোর কি আছে আমি তো ছোট মানুষ । ছেলেধরা কিনা একটু তাড়াতাড়ি হেঁটে বাড়িমুখে দৌড় ।

এবার বোনটাকে না বলে সেই চঞ্চল মেয়েটাকে নিয়ে ঘুরতে বের হলাম । আবার নদীতে গেলাম ঘুরলাম ফিরলাম । কথায় কথায় জানলাম ওর দাদার নৌকা আছে । বললাম চলো আমরা তোমার দাদার নৌকায় চড়ে ওপারে ঘুরতে যাই । মেয়েটি বলল বাড়িতে রাগ হবে না । আমি বললাম ঘুরে আসবো কেউ জানতেই পারবে না । মেয়েটিও রাজি হয়ে গেলো ।

পরেরদিন হাতে সময় নিয়ে বের হলাম যেনো সন্ধ্যার আগেই ফিরতে পারি। নৌকায় চড়ে ওপারে গেলাম কি যে আনন্দ সে কি আর বলব ।

অনেকদূর হাটার পর বাড়ি পেলাম খুব কম । কোন রকম ঘর বানানো। এখানে কোন দোকান দেখছি না । বেশকিছু জায়গায় জমি চাষ করা । জমিগুলোর সৌন্দর্য একেবারেই আলাদা যেনো ফুলেফলে ভরা জমি । ছোট ছোট বাচ্চারা খেলছে । এই বাচ্চারা এখানে স্কুলে যাবে কিভাবে বুঝতেছি না । মনে তো হয় না এখানে কোন স্কুল আছে । ঘরগুলো কোনরকম বানানো হলেও একটা আর্ট আছে । মনে হচ্ছে ওই ঘরেই বাস করতে অনেক ভাল লাগবে । কেউ রান্না করছে কেউ কিছু একটা রোদ দিচ্ছে । কি রোদ দিচ্ছে সেটা বুঝতেছি না । কেউ কেউ অনেক শক্ত কাজ করছে এসব কাজ করতে গেলে অনেক শক্তির দরকার । দেখেতো সবাইকে অভাবি লাগছে । ঠিকভাবে খাওয়া দাওয়া না করলে এত শক্তি হবে কিভাবে জানি না ।

এরই মধ্যে মেয়েটা বাড়ি যাওয়ার জন্য ছটফট করতেছে বলছে এখন না গেলে সন্ধ্যা হয়ে যাবে । একটু পরে নৌকা এদিকে আসবে পরে নৌকা পাবো না চলো এখন চলে যাই।

ওহ কিছু ভাল করে দেখা হল না কি যে বলবো মেয়েটা বুঝতেছে না । কি আর করার ফিরতে শুরু করলাম।

হাঁটতে গিয়ে মনে হচ্ছে কিছু কিছু সবুজ চিকচিক সাদা বালি কি সুন্দর আকাশ সামনে এত পানি অনেক আনন্দ লাগতেই কি যেনো মনে হতেই আনন্দে দৌড় দিতে শুরু করলাম । আমার দৌড়ে মেয়েটিও আমার সাথে দৌড়াচ্ছিলো আর দৌড়াতে নিষেধ করছিলো । সেদিকে আমার কোন খেয়াল নাই । হঠাৎ একটা জায়গায় আটকে গেলাম একটু একটু করে ডুবতে শুরু করলাম । হাঁটু পর্যন্ত প্রায় ডুবে গেছে । বুঝতেছি না আমি ডুবে যাচ্ছি কেন । আমাকে দেখে মেয়েটি এতক্ষণ হাসছিলো হাসিতে মনে হচ্ছে আমি বেশ বড় বোকামি করেছি । এখন ওর চোখে মুখে ভয় যদি আমি পুরোটা ডুবে যাই । আমিও ততক্ষণে বুঝে গেলাম আমার ডুবে যাওয়ার রিস্ক আছে । উঠতে চেষ্টা করছিলাম পারছিলাম না চেষ্টা করতে গিয়ে আরো ডুবে যাচ্ছিলাম । মেয়েটি নড়াচড়া করতে নিষেধ করলো । আমি ভয় পেয়ে গেলাম ভাবলাম বাড়ি ফেরা বুঝি আর হবে না । মামণির কথা মনে হচ্ছিল বড়দের কথা অবাধ্য হলে বুঝি এমন হয় । একটু একটু কান্না পাচ্ছিলো ।
মেয়েটি চারপাশে চিৎকার করে ডাকছিলো । কিন্তু আশেপাশে তেমন কেউ নেই । হঠাৎ একজনকে দেখা যাচ্ছে একটু একটু তখনি আমিও চিৎকার করতে শুরু করলাম মেয়েটির সাথে । সে লোক শুনতে পায়নি চলে গেলো বিপরীত পাশে । ভাবলাম টিভিতে বাঁচার জন্য চিৎকার করলে কেউ না কেউ চলে আসে কিন্তু এখানে তো কেউ শুনতেও পাচ্ছে না । বাস্তব আর টিভি তো আর এক নয় । শেষে মেয়েটি অনেক কষ্টে আমাকে সেদিন বাঁচিয়েছে । এখন মেয়েটি কোথায় আছে আমি জানি না ।

স্কুল ছুটির কারণে মামণির বাসায় ঘুরতে আসা । ছুটির সময় শেষের দিকে তাই বাড়িতে ফিরে যেতে হবে । মনটা খারাপ হয়ে গেলো মনে হল মামণির বাসায় যদি সারাজীবন থাকা যেতো । তা তো আর হবে না তাই মনটা খারাপ করে বাড়ি ফিরে যেতে হল ।

সেদিন একটা অদ্ভুত কান্ড ঘটেছিলো । ফুফার সাথে টেম্পুতে করে বাড়ি ফিরছিলাম । এই টেম্পুগুলা এখন অবশ্য নাই । বেশিদূর নয় বাড়ি ফিরতে দুঘন্টার মত লাগবে ।এরই মাঝে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম কিছু জায়গায় লোক উঠানামা করাতে বেশ কিছু জায়গায় আমাকে কয়েকজন চোখ মেরেছে চার থেকে পাঁচ জন হবে । ভাবলাম আমি তো ছোটমানুষ আমাকে চোখ মেরে কি বোঝাচ্ছে বুঝতেছি না । চোখ মারা মানে কি পছন্দ করা ? আমি তো ছোটমানুষ ক্লাস ফোরে পড়ি আমাকে তো পছন্দ করবে না বড় মেয়েদের পছন্দ করবে । কিন্তু আমাকে চোখ মারছে !

ক্লাসের একটা ছেলের কথা মনে হল সেও আমাকে চোখ মেরেছিলো । ক্লাসের সবাই বলে সে নাকি আমাকে পছন্দ করে । চোখ মারা মানে কি পছন্দ করা ? ফুফাকে প্রশ্নটা করতে লজ্জা পাচ্ছে তাই আর প্রশ্ন করা হয় নি । ভাবলাম এরপর কেউ চোখ মারলে গুণবো ।

সত্যিই তো আবার একজন চোখ মারল ছয় সাত আট গুণতে গুণতে উনিশে গিয়ে থামল । আরেকজন যোগ করলাম মামণির ভাসুরের ছেলে আমার দু এক বছরের বড় হবে সেও চোখ মেরেছিলো । অবাক একেক জায়গায় সবাই চোখ মারছে কি অদ্ভুদ !

বাসায় আসলাম চোখ মারার কথা কাউকে বলা হয় নি আর সেদিন চোরাবালিতে ডুবে যাওয়ার কথাটা ভুলেও কাউকে বলিনি জানতাম নির্ঘাত বকা দিবে ।