অনুরণন

বিবর্ণ ভালোবাসা

ছেলেটা বলেছিলো কোনো এক শীতের সন্ধ্যায় দেখা হবে। ওরা তখন নিজেদের একটু একটু করে জানার চেষ্টা করছে, বলা যায় একটা গল্পের শুরু হচ্ছিলো কেবল। যদিও ভালোলাগাটা তার অনেক আগের। শেষ বর্ষার পরও একটু একটু বৃষ্টি, ঠিক সেই সময় এক অন্ধকার রাতে জেগে ছিল মোহিনী। ঘুমের কোনো সমস্যা না, তবুও কেন যেন সেই রাতে ঘুম আসেনি, কিছুক্ষ্ণন ইউটিউব এ ঘুরাঘুরি তারপর হঠাৎ কিভাবে যেন সেল ফোনের রেডিও অপ্শন এ আঙ্গুল চলে গেলো। এতো রাত জেগে যে এই মানুষ গুলো কথা বলে ব্যাপারটাই জানতো না, চুপচাপ শুনলো কিছুক্ষন। ৩/৪ জন একসাথে আড্ডা দিচ্ছে স্টেশন থেকে, সেইসাথে রাতে জেগে থাকা শহরের মানুষ যোগাযোগ করছে টেক্সট আর ফোন কলস এর মাধ্যমে। বেশির ভাগ ফোন কলারস গুলোই স্কুল কলেজ পড়ুয়া মেয়ে, বাচ্চা মেয়েগুলা মা বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে মধ্যরাতে রেডিও স্টেশন এ ফোন করছে, ওদের দুষ্টুমি হাসি আর কথার ফাঁকে ফাঁকে ৩/৪ জন যুবকের আড্ডা, মনে মনে হাসল মেয়েটা। কথা বন্ধুদের কথা এর আগে কখনো এত মনোযোগ দিয়ে শুনে নি সে।

মোহিনী যে সময়টাতে ইউনিভার্সিটি তে পড়ে, দেশে তখন বেসরকারি রেডিও চ্যানেল গুলোর ট্রেন্ড শুরু হলো। ট্রাফিক জ্যাম এ সময় কাটানোর সবচেয়ে উপযুক্ত বিনোদন ছিল রেডিও চ্যানেল গুলো। ইয়ং জেনারেশনদের এখানে সেখানে দেখা যেত কানে হেডফোন নিয়ে দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর রেডিও টিউন করছে যখন তখন ।

পড়াশোনা নিয়ে ডুবে থাকা মেয়েটা ইউনিভার্সিটি যাওয়ার সময়টাতে ট্রাফিক জ্যাম এর কবলে পরে কখনো কখনো যে রেডিও শুনেনি তা না, তবে নিজে কোনোদিন টিউন করে নি। কোনো কোনো দিন জ্যাম এ বসে ড্রাইভার মাথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করতো ”আপা রেডিও ছাড়ি?” এক্সাম থাকলে মাথা ঝাকিয়ে নিষেধ করেছে, বই এর উপর থেকে মুখ না তুলেই।

মিনিট কয়েক শো শুনে হঠাৎ হোস্ট এর আমন্ত্রণে রেডিওতে টেক্সট পাঠাবে ঠিক করে ফেললো । কথা বন্ধুদের কথার একটা বিষয়বস্তু দিলে কেমন হয়, নিজের মনে ভেবে প্রথম টেক্সটটা করলো একটু তির্যক ভাবে “আপনারা প্রোডাকটিভ কিছু নিয়ে কথা বলুন, যেমন ধরুন “স্বপ্ন”, যারা কল করছে তাদের স্বপ্ন নিয়ে কথা বলা যেতে পারে”। এই টেক্সট এর পরপরই মধ্যরাতের কেবল হাসি-মজা সৰ্বস্ব শো এর গতি রোধ হলো বলা যায়। ৩/৪ জন রেডিও জকি আলোচনায় মোড় ঘুরিয়ে দিলো, তার ভিতর একজন একটু ভারী মতো কণ্ঠ বাকিদের থেকে একটু সিনিয়র হয়তো হবে; মোহিনীর টেক্সট এর জবাব দিল গম্ভীরভাবে। আলোচনা স্বপ্ন থেকে তখন ডালপালা ছড়ালো বহুদূর। কথার পিঠে কথা বেড়েই চলেছে আর মেয়েটার মনে হতে লাগলো, টেক্সট এর মাধ্যমে মধ্যরাতে এই মানুষ গুলার সাথে কথা বলতে খারাপ লাগছে না বরং বেশ ভালোই লাগছে। যে মানুষটা একে একে কথার জালে আটকে রাখছিলো; সেই গম্ভীর কণ্ঠের ভদ্রলোকের কথায় ভিতরে ধাক্কার মতো লাগলো । এই মানুষটার কথা বার্তা একটু ভিন্ন, খুব গতানুগতিক না । ভাবনা গুলো হুবুহু আমার সাথে মিলে যায়; মানুষের চিন্তা শক্তি কতটা শক্তিশালী হতে পারে তা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ রেডিও-খুদে বার্তা আদান প্রদান হলো সেই ভারী কণ্ঠের সাথে । বাকিটা শো তে যেন শুধু এ দু’জনেরই অস্তিত্ব ছিল; স্বপ্ন, চিন্তাশক্তি, কল্পনায় হারিয়ে গেলো সস্তা হাসি-মজার কথোপকথন।

খুব কাছাকাছি কোথাও থেকে ভোরের পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ ভেসে আসলো । ভোরের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে কেড়ে নিলো চোখের অবশিষ্ট ঘুমটুকুকেও। তবুও দুজনের আলাপ যেন অসমাপ্ত থেকে গেলো, বাকি দিন গুলোর জন্যই হয়তো।

আজ সোমবার। সকাল থেকে আমি অপেক্ষায় ছিলাম রঞ্জন এর শো শুনবো বলে । প্রথম যেদিন পরিচয় হলো সেদিন কথার পিঠে ছেলেটা বলেই ফেললো তার শো-স্ক্যাজুল । প্রথম দিনই বাকি শো শোনার আমন্ত্রণ পেয়ে নীরবে হেসেছিলাম খুব । শো শুরু হলো “মা” নিয়ে কবিতা দিয়ে । মা কে নিয়ে এত সুন্দর কবিতা কোনোদিন শুনি নি । মুগ্ধ হয়ে শুনলাম সেদিন ।এত সুন্দর করে আবৃত্তি করে ছেলেটা! প্রোগ্রামটার কনসেপ্ট আমাকে প্রচন্ড ভাবে মুগ্ধ করলো, মাকে আমরা সবাই ভালোবাসি, কিন্তু কতজন সেটা বলতে পারি!

– “ভাই মায়ের থেকে অনেক দূরে থাকি, কিন্তু বলতে পারি না মাকে কত ভালোবাসি । খুব দেখতে ইচ্ছা করে, সবসময় দেখতে যেতে পারি না; ঢাকায় থাকি আর মা থাকে গ্রামে”।

সারা দেশ থেকে এরকম বহু মানুষ মায়ের প্রতি ভালোবাসা জানায় এই শো তে ফোন করে কিংবা টেক্সট করে । আমি কখনো কখনো নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেলি, কখনো রঞ্জনের আবেগ জড়ানো কথায় ভিতরে ভিতরে শিহরিত হই।

– “মা কে ভালোবাসি জানানোর দরকার হয় না, পৃথিবীর সব মায়েরাই জানে সন্তানের মনের ভালোবাসার কথা । তবুও এক কাজ করতে পারেন, আমি বুঝতে পারছি হয়তো লজ্জায় মা কে বলতে পারছেন না; মায়ের কাছে গিয়ে হুট্ করে “ভালোবাসি মা” বলে দৌড়ে চলে যান”।

মাকে ভালোবাসা জানানোর এই উপায় শুনে মনে মনে সেদিন অনেক হাসলেও, আমি জানি অনেকেই মা কে বলতে পারে না ভালোবাসার কথা; তাদের জন্য মন্দ না এই ট্রিকস ।

ধীরে ধীরে এই ছেলেটার শো-এর প্রতিদিনকার শ্রোতা হয়ে গেলাম আমি । অনেকটা রুটিন করেই শুনতে আরম্ভ করলাম। প্রতিদিন সকালে, অফিস এর পথে তার গম্ভীর কণ্ঠই আমার সঙ্গী; আবার কখনো রাতের শো আমার ঘুম কেড়ে নিতো, পরদিন অফিস এ যেতাম ঘুম ঘুম চোখে ।

আমি আর সে যোগাযোগ করি রেডিও টেক্সট এর মাধ্যমে । সর্বসাধারণের সামনে উপস্থাপন যোগ্য বার্তা বিনিময় চলতে থাকে; আমার পাঠানো রেডিও টেক্সট আর ছেলেটার ভারী কণ্ঠ।

এভাবে চলে গেলো প্রায় দু’ মাস। আমি অদ্ভুত ভাবে লক্ষ্য করছি, আমার পাঠানো রেডিও টেক্সট এর অপেক্ষায় থাকে সে। ঠিক সেরকম আমিও, কোনোদিন যদি নির্দিষ্ট সময়ে তার কণ্ঠের দেখা না পাই ভিতর ভিতরে অস্থির হয়ে যাই। নিজেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করেই বসি ” যার জন্য এই হাহাকার তাকে কি আমি চিনি? তাহলে কিসের মায়া ?” অজানার প্রতি আকর্ষণ? নিজের প্রশ্নের জবাব খুঁজে না পেয়ে আবার টিউন করি রেডিও, যেন কোনো চৌম্বকীয় আকর্ষণে ভাসছি আমি।
একদিনের কথা মনে আছে, ঠিক করে ফেলি আজকে কোনো টেক্সট করবো না, চুপি চুপি শুধু শুনবো । আমার অনুপুস্থিতিতে তার কণ্ঠের কোনো পরিবর্তন আসবে কি? আমার নীরবতা কি তাকেও একটু হলেও নিস্তব্ধ করবে না? এরকম হাজারো প্রশ্ন নিয়ে শুনতে শুনতে বুঝতে পারি খুব অস্থিরতা নিয়ে কথা বলছে ছেলেটা; সেদিন শো-এর আরেক সঞ্চালক বলেই ফেললেন
” রঞ্জন তুমি কি কারো টেক্সট মিস করছো? এত অস্থির কোনো?”
মুহূর্তে নিজেকে সামলে নেয় ছেলেটা ” না, না… কাকে মিস করবো আবার?”
” হুম, তোমার সাথে এত দিন ধরে একসাথে শো করছি, কিছু তো বুঝতে পারি ”

আমি প্রচন্ড লজ্জা পেয়ে যাই । আমাদের এই যোগাযোগ তাহলে অনেকেই অন্যভাবে দেখছে? আবারো নিজের ভিতর অস্থিরতা কাজ করতে থাকে, এই অস্থিরতা থেকে বোধয় মুক্তি নেই।

তারপর দিন প্রথম বুঝলাম আমার উপর আজকাল অভিমান করার অনুশীলন হচ্ছে। আমার রেডিও টেক্সট পড়তে কখনো একটুও যেখানে দেরি করতো না, সেখানে আধ ঘন্টা ধরে কেবল ” শুভ সকাল” এর জবাবে আমার জন্য রবীন্দ্র সঙ্গীতই বাজলো । কখনো ” মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না ” আবার কখনো “কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো, কে তুমি কে তুমি আমায় ডাক”.

গানে গানে অভিমান পর্ব শেষ হলো না সেদিন ও! মনে মনে ভাবলাম ” ছেলেদের এত্ত অভিমান!”

কখনো ভাবি নি কথা হবে তার সাথে । রাতের শো তে একদিন ফোন করেই ফেললাম ।
– হ্যালো
ফোনের ওপাশে একসাথে তিন জন ” জি শুনছি, নাম বলুন আপনার”।

আমি আমার রেডিও-টেক্সটিং এর ছদ্দনামটা বলতেই রঞ্জন নিশ্চুপ হয়ে গেলো । হয়তো নিজেকে একটু সামলে নিচ্ছিলো । বাকি দু জন খুব সাবলীল ভাবে কথা বললেও রঞ্জনের নীরবতা আমাকে বিব্রত করছিলো, হয়তো বা একটু অভিমান হচ্ছিলো ভিতরে ভিতরে ।

প্রথম সঞ্চালক: আপনি! অবশেষে ফোন করলেন তাহলে! আমরা সবাই আপনার ব্যাপারে আলোচনা করি, খুব গোছানো আপনার টেক্সট গুলা ।
এবার তাহলে কিছু মজার প্রশ্ন করি, আপনি তো জানেন রাতের এই শো তে আমরা বন্ধুদের মজার প্রশ্ন করি। বলুন তাহলে আপনি প্রথম কার প্রেমে পড়েছেন?
: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
দ্বিতীয় সঞ্চালক: এরপর?
: এর পর আর কেউ সেই যায়গা নিতে পারে নি
নীরবতা ভেঙে রঞ্জন তখন বলে উঠলো ” রবীন্দ্রনাথ এর প্রেমে পরে যেই মেয়েগুলো ওরা অন্য অনেকের থেকে আলাদা । আপনার রেডিও তে পাঠানো প্রথম টেক্সটটা এখনো আমার মনে আছে, আপনি সবার স্বপ্ন নিয়ে প্রশ্ন করতে বলছিলেন, আপনার স্বপ্ন কি আমাদের বলুন ? ”
: আমার স্বপ্ন নিরাপদ বাংলাদেশ। আমি গভীর রাতে একা একা রাস্তায় নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে চাই, রাতের ঢাকা দেখতে চাই । আমি লেখাপড়ার জন্য অন্য দেশে গিয়ে অন্য শহরের রাতের সৌন্দর্য দেখেছি; আমার শহর হয়তো রাতে আরো সুন্দর। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন বাংলাদেশ ও ঠিক অন্য নিরাপদ দেশ গুলোর মতো হবে। দিনে – রাতে সমান নিরাপদে আমরা মেয়েরাও ঘুরে বেড়াতে পারবো।
রঞ্জন: খুব সুন্দর আপনার স্বপ্ন
আমি কি প্রশ্ন করতে পারবো, নাকি শুধু উত্তরই দিয়ে যাবো ?
রঞ্জন: না না…. প্রশ্ন করুন ।
: আপনার ব্যাপারে প্রচলিত এমন কিছু বলুন যা সত্য নয়? কোনো রিউমর ?
রঞ্জন: সবার ধারণা আমার গার্ল ফ্রেন্ড আছে, কিন্তু আসলে নেই ।

উত্তর শুনে ভিতরে ভিতরে সেদিন হেসেছিলাম খুব; এভাবে সবার সামনে আমাকে না জানালেও হতো যে তুমি সিঙ্গেল, বোকা ছেলেটা!

রেডিও-ফোন আলাপের পর অভিমান পর্বের সমাপ্তি হলেও রবীন্দ্র সঙ্গীত বেজেই চললো। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যেই ছেলে সকালের শো তে হিপ হপ কিংবা ট্রেন্ডি গান গুলো বেশি বাজাতো এখন সেখানে একচেটিয়া ভাবে যায়গা করে নিয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেম-বিরহ মিশানো গান।

এর পরের দিন গুলো ঠিক একই ভাবে চললো ।দু’ জনের রেডিওর মাধ্যমে এক অদ্ভুত নিয়মে যোগাযোগ হতে থাকলো; যেখানে দু’পক্ষেরই অস্থিরতা বেড়েই চলছিল। আমি যেমন বুঝতাম রঞ্জনের ভিতরের সেই হাহাকার, কিভাবে কিভাবে যেন সেও বুঝতে পারতো আমিও প্রচন্ড ভাবে চাইছি সরাসরি যোগাযোগ হোক।

রঞ্জন বহু বার অনুরোধ জানিয়েছে রেডিও শো তে গেস্ট হিসেবে আসার জন্য, মনে মনে আমি ঠিকই বুঝেছি এই আমন্ত্রণ দু’পক্ষের যোগাযোগ সহজ করবে। কিন্তু রেডিও স্টেশনে গিয়ে যোগাযোগ করতে কখনো মন থেকে সারা পাই নি । একটা চাপা অভিমান কাজ করতো । রঞ্জন তো খুব সহজেই আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারে, আমি তো এস এম এস করি আমার নিজের নম্বর থেকেই! তাহলে কেন এতো দিনেও যোগাযোগের চেষ্টা করছে না! পরক্ষনেই আবার মনকে বোঝাই এভাবে তার দিক থেকেও যোগাযোগ করা সহজ না, যেখানে যোগাযোগের মাধ্যম রেডিও- খুদে বার্তা; ওদের কিছু নিয়ম তো মেনে চলতেই হয়।
(চলবে)

লিখেছেনঃ জ্যোতি নীহারিকা