অনুরণন

এসপিওনজ হিস্টরি | স্পাই থ্রিলার

রহস্য রোমাঞ্চ স্পাই থ্রিলার পড়ে এবং সিনেমা দেখে আমাদের মনে স্পাই জীবন সম্পর্কে অনেক ধারণা গড়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে তা গল্প বা সিনেমার বর্ণনা থেকে বহু দূরে । গল্প বা সিনেমায় স্পাই’রা সাধারণত হয়ে থাকে যুবক/যুবতী এবং দেখতেও হয়ে থাকে সুন্দর আর স্মার্ট। বাস্তবে স্পাই’রা হয় মাঝবয়সী এবং চেহারা হয় খুবই সাদামাটা। না বেশি ভালো, না বেশি খারাপ। সুন্দর চেহারার কেউ হলে সবার চোখে পড়ে যায়, ফলে গোপনে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। মনমরা গোমড়ামুখো আঙ্কেলমার্কা লোককে কেউ ভালো করে মনেও রাখে না। তাই ঐ আঙ্কেলমার্কা লোকটিই হতে পারে সফল স্পাই।

মাঝবয়সী লোক নেওয়ার আরেকটি কারণ হল এরা আবেগ বিবর্জিত হয়ে কাজ করতে পারে যা যুবকদের পক্ষে কঠিন। ‘অবজেক্ট’ হাতে এসে গেলে স্পাই বাধ্য থাকে বাকি সব কিছু বাদ দিয়ে হেড কোয়ার্টারে ফিরে আসতে। এ সময় পৃথিবী উলটে গেলেও স্পাই নিজ থেকে কোনো নতুন পরিকল্পনায় যেতে পারে না। কাছের কেউ মারা যাচ্ছে/খুন হচ্ছে শুনলেও স্পাই আবেগতাড়িত হতে পারবে না এবং ঠাণ্ডা মাথায় হেড কোয়ার্টারের পথেই রওনা দেবে। ভাবুকতা, ভাবালুতার কোনো স্থান এখানে নেই। অন্যমনস্ক হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। যুবকশ্রেণীর দ্বারা এই ভুলগুলো করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। স্পাইদের দীর্ঘদিন এসবের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরা হয় আক্ষরিক অর্থেই ঠাণ্ডা মাথার লোক । প্রয়োজনে এরা গুলি করবে এবং অনুশোচনাও করবে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান ইন্টেলিজেন্স অফিসার গেহলেন জার্মান স্পাই বাহিনীর প্রধান হয় এবং অনেক সফলতাও পায়। এ সময় স্পাইদের অনেক অলিখিত আইনও তৈরি হয়। ঠাণ্ডাযুদ্ধের সময় জার্মান স্পাই’রা পুরো বিশ্বে অনেক সফল অভিযান চালিয়েছিল। মার্কিনী আর যায়নবাদীদের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য গেহলেনের বাহিনী আরব-ইস্রায়েল যুদ্ধে আরবদের বিপক্ষে স্পাইগিরি করে বহু তথ্য আমেরিকা আর ইস্রায়েলকে জানিয়ে দিয়েছিল, ফলশ্রুতিতে অল্প সময়েই আরব’দের প্রচুর সামরিক ক্ষতি করতে সক্ষম হয় ইস্রায়েল।

স্পাই ইতিহাসে যে কয়েকজন মোটামুটি জেমস বন্ডের কাছাকাছি এসেছিলো এরা সবাই ছিল মাঝবয়সী দাদু। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও বোঝা যেতো না এরা একেকটা ঝানু স্পাই।

কিম ফিলবি ছিল ব্রিটিশ স্পাই, মাঝবয়সী, দেখতে সাধারণ আর কথা বলতে গেলে মাঝে মাঝে তোতলামি করতো। এই লোকটি উপর দিয়ে মার্কিন-ব্রিটিশ পক্ষের হলেও তলে তলে ছিল রাশিয়ার ডবল এজেন্ট। বিশ বছর ডবল এজেন্ট হিসেবে প্রচুর তথ্য রাশিয়ায় পাচার করেছিলো ফিলবি সফল ভাবে। সে হিসেবে গোপনে আরব’দের পক্ষে ছিল সে। তার গোপনীয়তা ফাস হওয়ার পরপরই আমেরিকার ভিতর থেকে সি আই এ’র নাকের ডগা থেকে ফিলবি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং রাশিয়ায় চলে যায় । সেখানে পরবর্তীতে বৃদ্ধ বয়সে সে মৃত্যুবরণ করে। কিউবা’তে একটি মার্কিন অভিযান পুরো ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়েছিলো ফিলবি। রাশিয়ার নতুন অ্যান্টি ট্যাঙ্ক রকেট যেন মার্কিনীরা না পায় সে ব্যাপারেও ফিলবি নজর রাখছিল। এই রকেটগুলো আরব-ইস্রায়েল যুদ্ধে মিশরীয় আর সিরিয়ার সৈন্যরা ব্যবহার করে ইস্রায়েলের ট্যাঙ্ক বাহিনীকে ভয়ানক বিপদে ফেলে দিতে সক্ষম হয়েছিলো। তখন সপ্তম নৌবহর থেকে সরাসরি মার্কিন পাইলটরা বিমান নিয়ে উড়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে এসেছিলো। ছয়দিনের যুদ্ধে আরব’রা হেরে গেলেও ইস্রায়েলের সামরিক বহরের শতকরা পঁচাত্তর ভাগের ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছিলো। অবশ্য এই যুদ্ধে একমাত্র বাংলাদেশি পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আযম(তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) যোগদান করেছিলেন। তিনি ছয়দিনে সাতটির মতো ইস্রায়েলি জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করেন। যুদ্ধ থেমে গেলে তিনি ফিরে আসেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি এক সময় বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ফিলবি’কে ব্রিটিশ স্পাই বিভাগ নিয়েছিলো তার মেধা দেখে। কেমব্রিজের মেধাবী ছাত্র ছিল ফিলবি। ব্রিটিশরা এক্ষেত্রে কম বয়সীদের মধ্যে থেকে স্পাই বাছাই করেছিলো। কিন্তু ফিলবি দীর্ঘদিনে মাঝবয়সে যখন পাকাপোক্ত স্পাই হলেন তখন রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়লেন। ফিলবি’র ব্যাপারে ধরা খেয়ে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স নিজেদের ভুলটি খুঁজে বের করতে গিয়ে এমন ধাক্কা খেলো যে তাদের মাথা ঘুরে গেলো। দেখা গেলো ফিলবি সেই ছাত্রাবস্থাতেই কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন আর তাদের সভা সেমিনারেও যেতেন। সে সময়ে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিলো ব্যাপারটি। তারা ফিলবি ‘কেই খাতির করে ডেকে এনে কম্যুনিস্টবিরোধী স্পাই হিসেবে প্রশিক্ষণ দেয়। তখন ফিলবি’র ডবল এজেন্ট হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। মার্কিন, ব্রিটিশ আর ইস্রায়েলি ইন্টেলিজেন্সকে দীর্ঘ সময় ঘোল খাওয়াতে সক্ষম হয়েছিলেন ফিলবি। শেষ বয়সে সে জন্য তাকে খুব নিরাপত্তা নিয়ে থাকতে হয়েছিলো।