মুক্তধারা

শূন্য বিবেক = জম্বি

আজকে আপনাদেরকে দশম শ্রেণীর সাধারণ গণিতের একটি উপপাদ্য বর্ণনা করবো। এতে করে আপনাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ আমার উপপাদ্যে সূক্ষ্ম উত্তেজিত হবেন, কেউ কেউ ইহার পক্ষে সায় দিবেন, আবার কেউ উলটো দিকে উপপাদ্যটিকে ঘুরিয়ে নিজের আরও একটি থেওরি দার করাবেন – এটাই স্বাভাবিক। যা হোক, আমরা সাধারণ নির্বচনে যাই।

সাধারণ নির্বচনঃ প্রমাণ করতে হবে যে যাহাদের বিবেক বলে কিছু নেই, তাহাদেরকেই জম্বি বলে।

বিশেষ নির্বচনঃ

মনে করি, আমরা বাংলাদেশে বসবাস করি।

বর্তমান অবস্থা – এখানে বর্তমানে শিক্ষা, এবং মূল্যবোধের পরিবর্তে টাকা নামক পার্থিব জিনিসটি জায়গা করে নিয়েছে। প্রমাণ করতে হবে যে, শূন্য বিবেক = জম্বি।

বিশ্লেষণঃ

একটা সময় ছিল যখন মানুষের মনে মূল্যবোধ এবং শিক্ষার (পুঁথিগত এবং সামাজিক উভয়ই) মূল্য ছিল। তবে তা টাকার অংকে পরিমাপ করা যেত না। কিন্তু এখন এমন দিন দেখতে হচ্ছে যে মোটামুটি সবকিছুই টাকার পরিমাপে মাপা যায়। একটা অদৃশ্য পরিমাপ যন্ত্র সমাজের মস্তিকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। যার যত টাকা, তার ততো সম্মান। এর উপযুক্ত উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প।

ফিরে আসি মূল বিষয়ে । বেশি দিন আগের কথাও নয়, আমাদের দাদারাও তাদের শিক্ষকদেরকে এতো সম্মান করতেন, যে না দেখেও উনাদের প্রতি শ্রদ্ধা চলে আসে। এর মানে এই না যে তারা অনেক টাকার পাহাড় জমিয়েছেন। আগে শিক্ষা হতো সব রকমের – পারিবারিক, সামাজিক, এবং মানসিক। শিক্ষা শব্দটাই এখন শুধু ডিকশেনারির পাতায় আক্ষরিক একটি শব্দ মাত্র।

শিক্ষা বলতে এখন আমরা যা বুঝিঃ এখন শিক্ষা মানে হল বিদ্যালয়ে বইয়ের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে যাওয়া। শিক্ষা মানে এখন তোঁতা পাখির মতো বইয়ের পাতা মুখস্ত করে যাওয়া। এখন সবার দরকার ভালো ফলাফল করা, মানুষ হওয়া না। আশ্চর্যের ব্যাপার হলেও কথাগুলো ইতিহাসের মতোই সত্য। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই মুখস্ত বিদ্যা খুব কমই মস্তিষ্কের মগজে থাকে। পরীক্ষায় বমি করার পরেও যদি কিছুটা থেকে থাকতো তাহলেও চলতো। কিন্তু তা থাকে না, তথাপি মূল্যবোধও তৈরি হচ্ছে না। এ যেন ডেভিড কপারফিল্ডের জাদুর মতো মানুষের মূল্যবোধ এবং শিক্ষা বাতাসে মিলিয়ে গেছে চোখের পলকে। এই দুই জিনিস না থাকায় বিবেক নামক বস্তুটি কর্পূরের মতো উধাও হয়ে যাচ্ছে। যা দিনকাল দেখা যাচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে ট্যালেন্ট রিয়ালিটি শোতে কেউ যদি বলে যে তার বিবেক আছে, তার বিবেক থাকাটাই একটা ট্যালেন্ট হিসেবে গণ্য হবে।

বিবেক না থাকার কারণে জম্বি উৎপাদিত হচ্ছে। জম্বি মানে বিবেকহীন দেহ যা চিনে টাকা উপার্জন, আর কোন কিছু নেই। এর ভালো উদাহরণ হল রোবট। শিক্ষা ঘরগুলো এখন প্রোডাকশন হাউজে পরিণত হয়েছে যা থেকে আমরা প্রতি বছরে জম্বি উৎপাদিত করছি। মজার ব্যাপার হল এদের এক্সপোর্ট কোয়ালিটি খারাপ না। খালি এক্সপেরিয়েন্স নামক শব্দটি কম। এখন জম্বিরা কথায় কথায় মানুষকে তাদের টাকার গরম দেখায় অথবা ক্ষমতা ব্যবহার করে কাজ হাসিল করতে চায়। উদাহরণ – আমার বাবা তমুক, আমার ভাই অমুক, ইত্যাদি। এর অর্থ হল আমরা ক্ষমতার ভয়ে তাকে তার কাজ করে দেই। যাহাদের কিছুই নেই তাহারাই এসকল কথা বলে থাকেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকেন। অবশ্য অপব্যবহার শব্দটিও এখন আর প্রচলিত নয়। যাহাদের বিবেক বলে কিছু নেই, তাহাদেরকেই জম্বি বলে। বিবেক থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, যৌতুক – এ সকল শব্দগুলো শুধুই শব্দ থাকতো, প্রচলিত সামাজিক প্রথা হিসেবে চিহ্নিত হতো না।

সুতরাং, শূন্য বিবেক = জম্বি।

[প্রমাণিত]

জম্বি চিহ্নিত করবেন যেভাবে – আপনার আশে পাশে যখন কাউকে বিবেক, মূল্যবোধ, এবং শিক্ষার অভাব দেখবেন, তখনই বুঝবেন যে উনি জম্বি। বিবেক থাকলে তারা কখনই প্রকাশে আপনাকে হুমকি দিবে না। ভাই, সোজা কথা কবরের সাড়ে তিন হাত মাটি ছাড়া আর কিছুই নিজের বলে দাবী করা যায় না। আপনার নিজের কিছু থেকে থাকলে তা হল শিক্ষা, এবং আপনার সম্মান। এখন অবশ্য তাও নেই, মানুষের মনে মানসম্মানের ভয় থাকলে এরুপ কথা বলতে পারতো না। লজ্জা থাকলে কেউ যেচে জম্বি হতো না। টাকা এবং ক্ষমতা ব্যবহার করে ইতিহাসের পাতার অক্ষর পরিবর্তন করলেও কালের ইতিহাসে জম্বিদেরকে কেউ মনে রাখে না। এখনও সময় আছে, ভালো মানুষ হওয়ার। ভালো হইতে পয়সা লাগে না।

[বিঃদ্রঃ লিখাটি পড়ার পর নিজেকে জম্বি মনে হলে লেখিকা দায়ী নয়। নিজেকে শুধরান। ধন্যবাদ]

লিখেছেনঃ কাজী নাবিলা