মুক্তধারা

সিমাদের ভাবনা আর জীবনের যন্ত্রণা

আমায় ফুল দিয়ে ভালোবাসি বললে। আমি লজ্জায় কিছুই বলতে পারলাম না। মনে মনে বললাম ভালোবাসি ভালোবাসি তোমায়। কেন যে তোমার চোখের দিকে তাকাতে পারছি না। বুঝে নাও না আমিও তোমাকে ভালোবাসি।

তোমার মুখটা তো দেখতে পারছি না। অন্ধকারে দাড়িয়ে আছো কেন তুমি।
হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায় সিমার। সে কি! তাহলে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল। লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ভাবছে মুখটা তো দেখা হল না। যাকে সে মনে মনে পছন্দ করে সে এসেছিল কিনা স্বপ্নে তাই ভাবছিল সিমা।

ঘড়ির কাটায় দেখলো সকাল ৭ টা। মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয় দুরু কে জানি কে স্বপ্নে এসেছিল সত্যি না হওয়াই ভাল।
মনে মনে যাকে পছন্দ করে সে যেন তার বর হয় এই ভেবে মুচকি হেসে বিছানা ছেড়ে উঠল।

তার পছন্দের মানুষ তার ক্লাসমেট। তেমন কথা হয় নি। সিমা ক্লাসের ফাঁকে পছন্দের মানুষের দিকে মাঝে মাঝে খেয়াল করে। কখনও কখনও ধরাও পরে এই বুঝি বুঝতে পারলো নাকি। তাড়াতাড়ি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সিমা।

একটু একটু সন্দেহ হয় মানুষটি তাকেও বুঝি পছন্দ করে। কি জানি হবে হয়তো। এসে প্রপোজ করলেই তো পারে। কেন যে বলে না। আমি বলি কি করে। এভাবেই তো দিন যাচ্ছে বলা তো আর হয় না।

কিভাবে যে বলি আমি আপনাকে পছন্দ করি। ধ্যাত তেরি পছন্দের মানুষকে কি কেউ আপনি করে বলে নাকি। তার চেয়ে বরং বলব আমি তোমাকে ভালোবাসি।

এমা! এসব আমি কি ভাবছি না না এ আমি পারবো না। কিছুতেই বলতে পারবো না।

অপেক্ষা করি মনে মনে তার জন্য অপেক্ষা করি। মনে তো হয় আমাকে পছন্দ করে। মাঝে মাঝে তাকিয়ে হাসে হয়তো পছন্দ করে বেচারা বললেই তো পারে। নাকি বেশি লাজুক কে জানে । মনে তো হয় লাজুক। তেমন কোন মেয়ে ফ্রেন্ডও দেখি না আশে পাশে। হয়তো লাজুক ভেবে একা একা হাসে সিমা।

ওর মা বলল সিমা পড়ার টেবিলে পড়া বাদ দিয়ে হাসছিস কেন? কিরে পড়ছিস তো।
হ্যাঁ মা পড়ছি একটা পড়া দেখে হাসি পেল তাই হাসলাম।
কি! পড়া দেখে হাসি।
না না একটা কৌতুক পড়ছিলাম।

পাশের রুম থেকে মা বলল পরীক্ষা সামনে কৌতুক পরে পড়িস এখন পড়। আচ্ছা মা সিমা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ভাবল একি অল্পের জন্য মা বুঝতে পারেনি।
আয়নার সামনে সিমা নিজেকে খুব যত্ন করে সাজায়, নিজেকে বড্ড ভালোবেসে যত্ন করে ঐ ভালোবাসার মানুষটির জন্য।। তার জন্য তার মনটাকে আগলে রেখেছে সে। তাকে যে বড্ড ভালোবাসে।

একদিন বাড়িতে কেউ ছিল না। সিমা ঘুমিয়ে ছিল। ঘুম থেকে উঠে সে নিজেকে আবিষ্কার করল সে হসপিটালে। সে নড়াচড়া করতে পারছে না। উঠে বসবে তাও পারছে না। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল তার মা বাবা ভাই।

সে বুঝতে পারছে না তার কি হয়েছে। শরীরটা এত ব্যথা কেন। এমন ব্যথা মনে হয় কেউ আমাকে মেরেছে।
আমার কি হয়েছে। অনেক কষ্টে সিমা মা বাবাকে বলছে আমার কি হয়েছে।
ওরা শুধু কাঁদছে কিছু বলছে না।

হঠাৎ সিমার মনে হল ঘুম থেকে জেগে সে কাউকে দেখেছিল। মনে পরল কে যেন তাকে চড় মেরেছিল। এভাবে কয়েকবার চড় খেয়ে সিমা আর কিছু বলতে পারে না।

এসব কথা মনে হতেই সিমার বড্ড ভয় করছে।
সে বার বার মাকে বলল, মা আমার কি হয়েছে।
বলো মা আমার কি হয়েছে।
সে বেশি কথা বলতে পারছে না।
তারপরও সে বার বার মাকে বলছে,মা বলো মা বলো আমার কি হয়েছে।
আমার কি হয়েছে বলো বলো বলো ।
সিমা কান্নাকাটি জুড়ে সে আর পারছে না সে অনেক ভয় পাচ্ছে।

মেয়ের জোড়াজুড়িতে মা মেয়েকে বলেই ফেলল তোকে বিবস্ত্র অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে মা। বলেই মা চিৎকার করে কাঁদা শুরু করে দিলেন।
সিমা থেমে গেল আর কোন কথা বলল না। সে চুপচাপ রয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই তার মাথায় বাজ পরে গেল। আর কোন কথা বলল না সে। সে চুপ করে শুয়েই থাকল।

পরিবারের সদস্যরা অনেক যত্ন করে তাকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন। একটু একটু যত্নে সে সেরে উঠছে। কিন্তু সে যেন বোবা হয়ে গেল সে আর কারো সাথে কথা বলে না। সবসময় চুপ করে থাকে। একেবারেই সে যেন নিশ্চুপ নীরব। জানালা দিয়ে সে বাইরে তাকিয়ে থাকে আনমনে। কিছু ভাবতে জানে না আগের মত আর হাসতেও পারে না। তার অনুভব করার শক্তি ক্রমেই যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোন কিছুতেই সে অনুভব করতে পারে না।

পরিবার তাকে অনেক যত্ন করে সুস্থ করে তুলেছেন। পরিবার ভাবে ভাগ্যিস তারা তাদের মেয়েকে ফিরে পেয়েছেন আর সিমা ভাবে সেদিন তার মৃত্যু হল না কেন।
যেভাবে তনু,রিসা,তাসফিয়ারা জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে ঠিক সেভাবে।

লিখেছেনঃ জিলফিকা জুঁই