মুক্তধারা

বিয়ে কি সব কিছুর সমাধান!

আমার বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত এবং বলা যায় রক্ষণশীল পরিবারে। আমরা দুই বোন এক ভাই।আমাদের ভাই-বোনদের মাঝে বয়সের ব্যবধান অনেক। আমার বড় বোন যখন বিএসএস পড়ত আমি তখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি।আর আমার ছোট ভাইয়ের বয়স হবে ৩-৪ বছর।

আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার বোন একটা ছেলেকে ভালোবাসত। ছেলেটিও তাকে ভালোবাসত। একদিন তারা দুজন একত্রে এলাকার বাহিরে ঘুরতে গেলে এলাকার জনৈক ব্যক্তির সাথে দেখা হয়, ঐ জনৈক ব্যক্তি গ্রামে ফিরে বাবা-মা‘কে বলে “আপনাদের মেয়েকে অমুক ছেলের সাথে ঘুরতে দেখলাম।”

জনৈক ব্যক্তির ঐ ফোঁড়নসূচক বাচনভঙ্গি সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের নিখাঁদ ভালোবাসায় খাঁদ তৈরী করে দেয়। আমার মা সেদিন বোন বাসায় ফিরলে তার সাথে যে আচরণ করেছিলো তা মনে হলে আমাকে এখনো শিউরে উঠতে হয়,আতকে উঠতে হয়। তাকে শারীরিক ভাবে টর্চার ত করেইছিলোই. এমনকি ইলেক্ট্রিক শক দিতেও আমার মায়ের মন কাঁদেনি।

এসব ঘটনা আমার চোখে এখনো ভাসে। এই ঘটনা মনে হলে আমি তখন শুধু কাঁদতাম কিছুই করতে পারতাম না আপুর জন্য। যারজন্য এখন নিজেকে অপরাধী মনে হয়।মনে হয় আমি কোন প্রতিবাদ করিনি। বলতে পারিনি ভালোবাসা পাপ নয়।এই ঘটনার পর আমার বোনকে তড়িঘড়ি করে ডিগ্রী পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে না দিয়ে পরীক্ষার একমাস বাকি থাকতে যেমন তেমন (বললাম একারনে চাইলে আরো ভালো যোগ্যতাসম্পন্ন ছেলেকে পাত্র হিসেবে পেত) পাত্রের সাথে আপুর কোন মতামত ছাড়াই বিয়ে দেয়া হলো।

এই ঘটনাটি (বেশ কিছু বছর আগের হলেও)এখানে বলছি একারনেই যে আমাদের দেশে বর্তমানে কন্যা সন্তানের বেলায় সামাজিক ধ্যান ধারনার কিছুটা পরিবর্তন আসলেও প্রেক্ষাপট ঐ একইরমক আছে। বর্তমানে আই সি টি এর প্রভাবে প্রেম, প্রতারনার শিকার হওয়া,পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করা,ধর্ষণ এসব অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

স্কুল থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, বাজার কোথাও নারী একা নিরাপদ বোধ করেনা, সব সময় মনের ভিতর কোন না কোন শঙ্কা নিয়ে তাকে চলতে হয়। অভিভাবকগণও নিজেদের মান-সম্মান রক্ষা, সামাজিকভাবে হেয় না হওয়ার ঢাল হিসেবে কন্যা সন্তানদের বিয়ে দিয়ে দেওয়াকেই প্রধান অবলম্বন হিসেবে মনে করেন। কন্যা সন্তানটিকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে পারলেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ হয়েছে ধরে নিয়ে হাপ ছেড়ে বাঁচে। স্বামীর বাড়িতে যা ইচ্ছা তাই করুক।

তবে আমি মনে করি এক্ষেত্রে মেয়েদের বাচানোর বা নিরাপত্তার চাইতে” নিজেদের” (অভিভাবক) বাচানোকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে।এরপর মেয়ে সংসার শুরু করে কিন্তু পুরোনোকে আকড়ে ধরে মানিয়ে নেয় অনেককিছু।কিন্তু মজার বিষয় হলো কোন অভিভাবকই তার মেয়ের পূর্ব প্রেম বা অন্য কোন “মানসিক সমস্যা/ডিসঅর্ডার”। এসব কিছুই শেয়ার করেনা বরপক্ষের সাথে তারা মনে করে বিয়ে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কি সব ঠিক হয়ে যায়?

আরো একটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য অভিভাবকগণ মনে করে এটি একধরণের ব্যক্তিগত সমস্যা। এসব কথা পাঁচকান হলে আমার মেয়ের বিয়ে হবেনা। কিন্তু তারা এটিকে রোগ হিসেবে দেখে মেয়ের চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করছেননা দুই-একটা উদাহরণ বাদ দিলে প্রায় ঘটনাই একইরকম ।বিয়ে দিচ্ছে ঐ মেয়ে স্বামীর পরিবারে যাচ্ছে কিন্তু তাকে নানান মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

পরিবারের কেউ কেউ বলছে “তুমি এমন তোমার অভিভাবক ত আগে বলেনি”।এমনকি এরকম নারীদের জন্ম নেয়া সন্তানও অনেক সময় এমন হয় তবে সবক্ষেত্রে না। অবশেষে সংসারের পরিনণতি হচ্ছে “বিচ্ছেদ”।বিভিন্ন এলাকায় গবেষণা পর্যবেক্ষণ থেকে আমি দেখেছি,অধিকাংশ অভিভাবকগণ মেয়েদের বাল্যবিবাহ দিচ্ছে প্রেম করে পালিয়ে যাওয়ার আশংকা থেকে,নিজের সম্মান নষ্ট হবে এই ভেবে।কিন্তু সমাজের কিছু রিউমার আছে এরকম যে, কোন মেয়ে তার নিজের সহপাঠীর সাথে যদি একাডেমিক বিষয়েও কথা বলে তবে তা প্রেম হয়ে যায়।

এলাকার লোকজন এসে বাবাকে,ভাইকে বলছে তোর বোন/ মেয়ে এটা করছে সেটা করছে ব্লা ব্লা। বাবা – মা ভাবছে মেয়ে আমার খারাপ হয়ে গেছে কিছিদিন পর সমাজে মুখ দেখাতে পারবোনা তাই যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে দিতে হবে।তাইলেই সমস্যার সমাধান একজন নারী একজন ছেলের সাথে কথা বললে সেই নারী সমাজে খারাপ বলে বিবেচিত হচ্ছে….।

কিন্তু নারী তো একা কথা বলেনি পুরুষ ও কথা বলেছিলো কিন্তু তার বেলায় কি হবে?????ভুলে গেছিলাম “পুরুষ ” ত হাস। পুকুরে,নদীতে বা পানিতে ডুব দিয়ে ডানা ঝেরে উঠলেই সাতখুন মাফ!! যার ফল ভোগ করতে হয় কেবল নারীর।আমার মূল আলোচনার বিষয় হলো নারীকে বিয়ে দিচ্ছে তাদের অভিভাবক এই ইস্যুগুলোকে সামনে এনে। কিন্তু মজার বিষয় হলো পুরুষটার বিবাহ হচ্ছেনা। হলেও হাতে গোনা উদহারণ যা খুবই নগণ্য।

বিয়ে দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু সংসারগুলো যে টিকছেনা। অনেক মেয়ে নিজের সন্তানের দিকে তাকিয়ে হয়ত মানিয়ে চলছে কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো এটাই কি সমাধান? একজন অভিভাবক কেন মেয়ের দায়িত্ব নিতে পারেনা।তাকে কেন তার মানসিক সমস্যার জন্য সাইকায়াট্রিক দেখাতে পারেনা?????? এতেও সমাজের ভয়!! বলবে, “মেয়ে পাগল,পাগলের ডাক্তার দেখায়। তাইলে আবার বিয়ে হবেনা।”অভিভাবক কে জ্ঞান রাখতে হবে,জানতে হবে সাইকায়াট্রিক আসলে কি জিনিস?এখানে গেলে কি হয়? এসব জ্ঞান তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।

অভিভাবকদের দায়িত্ব নিতে হবে সন্তানের(বিশেষ করে মেয়েদের)।বিয়ে দিলেই যেন সব দায়িত্ব শেষ এমন ভাবনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।বিয়ে কোন সমাধান হতে পারেনা!!! এটি একটি এজেন্সি।এর মাধ্যমে আরো জটিল প্রক্রিয়ায় মেয়েরা প্রবেশ করে। যা থেকে আর বের হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনা। যদিও কোন নারী বের হতে চায় তবে তার বাস্তবতা আবার বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে আরো জটিল থেকে জটিলতর। ফলে নারীর মাঝে একধরণের “মানসিক দ্বন্দ/ডিলেমা” কাজ করে।যার প্রভাব সন্তানের উপর পড়ছে।

এভাবে যারা মানিয়ে চলতে পারছে তারা চলছে।কিন্তু যারা পারছেনা…….তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ। অনেকক্ষেত্রে আত্নহত্যার মত ঘটনাও ঘটছে।সম্প্রতি এর হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। অবশেষে বলবো একজন সন্তানের কাছে বাবা- মার চাইতে আপন বলেন আর শুভাকাঙ্ক্ষী বলে অন্য কেউ নাই। নারী সন্তানের এমন পরিস্থিতে “বিয়ে” কোন সমাধান না। বিয়ে বরং জটিল এবংসমাজ নির্মিত একটি প্রক্রিয়া এবং ব্যবসায়িক এজেন্সি।

তাই বিয়ের মাধ্যমে নয় সন্তানকে ভালোবাসুন,তার জন্য কিছু করার চেষ্টা করুন,কিছু হলেও তাদের চাওয়ার মুল্যায়ন করুন।তাদেরকে সময় দিন ।এতে মাতাপিতা আর সন্তানের যেমন বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে তেমনি দেশে জংগীবাদের প্রভাব কমবে।কমে যাবে বাল্যবিবাহ,বিবাহবিচ্ছেদ, বহুবিবাহের মত সামাজিক দমন।

লিখেছেনঃ জিন্নাতুন নেছা।