মুক্তধারা

চক্রাকারে বঞ্চিত যেখানে নিয়ম

নারীরা আজ সবকিছু বিসর্জন দিতে বসেছে সেখানে নারীর অধিকার এই শব্দ দুইটা কারো কারো কাছে শান্তনা মাত্র।খুব নীরবভাবেই ঠকছে তারা। কাছের মানুষদের কাছেই ঠকছে তারা। কাছের মানুষ যদি ঠকিয়ে থাকে সেখানে দূরের মানুষ ঠকাবে খুব স্বাভাবিক। স্বাভাবিক যে কোনটা তা কিছু মেয়ে ভুলতে বসেছে। চলবে যে কোন পথে তা জানতে পারে না। ভাববে যে কি তা ভেবেও ভাবতে পারে না। বুঝেও যেন কিছু বোঝে না। কি আর বলবে সেখানে।

যখন দেখে আসে সকালের রান্নাঘরটা মা ঝকঝকে করে রান্না সেরে ঘোমটা দিয়ে সংসার সামলায়। তখন সেই চিত্রটা যেন একটা মা মা ভাব চিত্র মনে গেঁথে যায়। সেখানে এই চিত্রটাই সে স্বাভাবিক মনে করে।

দুজন কিংবা তার অধিক ভাই বোন মিলে একসাথে বড় হওয়ার মজাটাই যেন আলাদা। সেই সুখগুলোও মনে লেগে থাকে সুখের স্মৃতি হিসেবে। মনে যেন এক সুখানুভূতি।সেই চিত্র থেকেও যেন একটা চাওয়া পাওয়া মনে লেগে থাকে নিজের অজান্তেই। যা দেখে মানুষ বড় হয় তাই যেন অনেক সময় তার চাওয়া পাওয়া বা রীতিতে পরিণত হয়।

বাবা সংসারের এক কর্তৃত্বের নাম। বাবা বাড়ী এলে সবাই চুপচাপ হয়ে যান। বাড়ীর চিত্র তখন বদলে যায়।অনেক সময় ফাঁকিবাজি ভাইবোনেরা বই নিয়ে পড়তে বসে যায়। মজার মজার সব স্মৃতি থেকে যায়।একাধিক ভাইবোনেও কেউ ডাক্তার কেউ ইঞ্জিনিয়ার হয় কেউবা আরো ভাল কিছু। এমন অনেক পরিবার আছে একাধিক ভাই বোন সবাই মানুষের মত মানুষ হয়েছেন। এই গল্পগুলো কেন যেন দিন দিন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।

মেয়ে যখন দেখে বাবার কাছে ঠকে যাওয়ার কারণে ব্যর্থ মা জীবনের কাছে হেরে যাওয়াই নিজের শিক্ষাগত সার্টিফিকেট আগুনে পুড়ে ফেলে। জীবনের কাছে হেরে যাওয়ার জ্বালায় উনুনের আগুনে হাত লাগিয়ে বলে তাকে আর বিশ্বাস করবো না। তার কথায় চাকরী না করে আমি আজ বড় ভুল করেছি। আগুনে হাত লাগানোর এমন ঘটনা যখন মেয়ের সামনে ঘটে তখন সে বুঝে যায় সবকিছু সামলানোর পাশাপাশি নিজের দিকটা ঠিক না রাখলে হয়তো এমন কষ্টই হয়। যে মানুষটা আগুনে হাত লাগাচ্ছে বা সার্টিফিকেট রাগে পুড়ে ফেলছে সে ততদিনে বুঝে যায় তার ভুলটা কোথায় ছিল। নিশ্চয় সে ঠকেছে না হলে তার ভেতরে এত কষ্ট হবে কেন?

ততদিনে তার কাছে জব না করে শুধু বধূ সেজে থাকাটা বোকামি মনে হয়েছে। এমনটা দেখে মেয়ে বধূর পাশাপাশি জীবন সামলাবে ভেবেছে। টিভি পত্রিকা চারিদিকে যখন এত নির্যাতনের খবর তখন তো মেয়ের মনে ভীতি আরো বেড়েছে। তাই সে জীবনের ধাপগুলোর পাশাপাশি জবও করতে চায়।

যারা লেখাপড়ার সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় তাদের ঝামেলার মধ্যে আরো ঝামেলা বেড়ে যায়। পরিবার যেখানে মেয়ের লেখাপড়ার সুযোগ সুবিধা দিতে চায় না সেখানে কারো দোষ দিয়ে লাভ নেই। যে দেশে মায়ের নামে কেস করে মেয়ে তার বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে পড়াশুনার জন্য যুদ্ধ করে সেখানে এমন যুদ্ধের ধরন সম্পর্কে আর কি বা বলার থাকতে পারে। তবে শিক্ষিত বা বুদ্ধিমান বাবা মা দের মেয়েরা নিজেকে তৈরি করার সুযোগ পায়।

চারিদিকে যখন নির্যাতন বা ঠকে যাওয়ার এত হাঙ্গামা সেখানে আজ এই ২০১৮ সালে প্রতিটা মেয়েই মনে হয় জব ছাড়া কিছু কল্পনা করতে পারে না। হয়তো জবটাকেই সমাধান মনে করে। জব হলে হয়তো জীবনটা সহজ হবে। আর কিছু তারা ভাবতে চায় না। যেখানে জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে টানাটানি সেখানে অন্যকিছু ভাবার সময় কোথায়।

ভাবার সময় নেই জন্যই হয়তো আজকের মেয়েরা নিজেকে শুধুমাত্র বধূ ভাবা বোকামি মনে করে। পাশাপাশি জব করতে চায়। তাইতো জব এর পিছে ছোটে ছোটে ছোটে । এ যেন ঘোড়ার দৌড়।যেখানে জবও অনেক কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে মেধাবী আর মেধাশূণ্য দুইই মেয়েদের জন্য।মেধাশূণ্য তাদেরকে বলছি যারা পড়ালেখা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদেরকে মেধাশূণ্য ব্যঙ্গ অর্থে বলছি না তদেরকে মেধাশূণ্য ভাবা হয় জন্য বলছি। তারপরও তারাও কিছু না কিছু করতে চান।

কমবেশি সব মেয়েই প্রচুর দৌড়াচ্ছেন। একসময় গিয়ে দেখা গেল বিয়ের সঠিক বয়স কবেই ফুড়িয়েছেন। নিজেকে যোগ্য পাত্রী হিসেবে তৈরি করেছেন বেশ আত্মনির্ভরশীলও বটে কিন্তু বেশি বয়স হওয়ায় মাতৃত্বের সুখ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সেই দোষেই বর আবার আরেক জনকে বিয়ে করেছেন। অনেক সময় এ নিয়ে বর ডাক্তারি পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন মনে করেন না। আফসোস এ যুগেও কিছু মেয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যাপারেও বঞ্চিত রয়ে যায়। সাথে রইলো মাতৃত্বের সুখহারা।

যদিও কারো কপালে একটি বেবী জোটে তাও যোগ্য পাত্রী হিসেবে জব করা মা সেই একটি মাত্র সন্তানকে ভালোবেসে মায়া মমতায় জড়িয়ে আদর সোহাগ দিয়ে মানুষ করবেন এমন সময় সেই মায়ের নেই।

বাবা মা দুজনেই নিজেকে যোগ্য পাত্র পাত্রী হিসেবে তৈরি করতে গিয়ে জব করছেন। কারণ জব ছাড়া যে জীবন থেমে যাবে যে! অনেক সময় প্রয়োজন না হলেও জব করতে বাধ্য হন অনেকেই। সমাধান হিসেবে হয়তো মনে করেন অফিসে থাকবো সারাক্ষণ নির্যাতন হবো কখন! ( এটা আমার শোনা কথা)। সেই একটি সন্তানকে সময় না দেওয়ার কারণে সাধারণত সে সন্তান অমানুষ হয়। সেই সন্তানের হাতে বাবা মা খুন হয়ে গেলে সেখানে কার দোষ দেয়া যায়?

চক্রাকারে গন্ডগোল কোথাও কি?

ছোটাছুটির দোষ কি?

দোষ কার?

আর যাই হোক নিরাপত্তা অধিকার অধিকার এই শব্দগুলোর পিছে ছুটতে গিয়ে মেয়েরা যেখানে মাতৃত্বের সুখ সন্তানকে ভালোবাসার সুখ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন
সেখানে কোন অধিকার নিয়ে তারা লড়বেন?

সঠিক বয়সে পড়াশুনা শেষ?

সময়মত জব?

সময়মত মাতৃত্বের সুখ?

সন্তানকে মানুষ করার সুযোগ?

এককথায় চক্রাকারে জীবন গোছানোর সুযোগ?

যেখানে কেউ এসে গলা টিপে ধরে সেখানে এত কিছু চাওয়ার সুযোগ কোথায়?

মেয়েরা না হয় নাই চাইলো কিছু!
আর যে যাই বলুন মেয়েরা জব ছাড়া কিছু কল্পনা করতে ভুলে গেছে। যদিও জীবনের চক্রাকারের ধারাবাহিক গন্ডগোল হচ্ছে এটা নিয়ে আজকাল মেয়েরা মাথাব্যাথা করে না। ( কিছু মেয়ের কাছে শুনে এই কথাটা লেখা)।

তবে সময়ের সাথে যুগের সাথে মেয়েরা ঠিকই সবকিছু সামলে নিতে পারছে এবং পারবে। বাজারের সবজি কুড়িয়ে সবজি বিক্রী বা গার্মেন্টস কর্মী থেকে শুরু করে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার পাইলট এভারেস্ট জয়কারী ইত্যাদি প্রতিটি নারী তাদের জীবন যুদ্ধে জয়ী আর সামনে আরো জয়ীদের আগমন হবে।

আমরা সবাই চাই জীবনের ধারাবাহিকভাবে চক্রাকারে মেয়েরা ভাল থাকুক মায়েরা ভাল থাকুক। শুধু মেয়েরাই না মানুষ হিসেবে ছেলে মেয়ে উভয়ে ভাল থাকুক।

লিখেছেন : জিলফিকা বেগম জুঁই