মুক্তধারা

লেজ কাটা শিয়াল | ডিভোর্স সমাচার

লেজ কাটা শিয়াল। খুব ই আপত্তিজনক বিশেষন।
যার বা যাদের সম্পর্কে ব্যবহৃত হচ্ছিল সেটাও বেশ বেদনাদায়ক।ডিভোর্সী নারীদের ক্ষেত্রে যারা কিনা ফেসবুকে অন্যদের ডিভোর্স দেয়ার জন্য প্রচারনা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ।

অসম্ভব রকমের অবিশ্বাস্য এই অভিযোগ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একেবারেই ব্যতিক্রমী পরিবেশ বা মনমানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা ছাড়া,যারা রিলেশনশীপে বিশ্বাস রাখে তারা প্রায় সবাই খুবই আবেগপ্রবন এবং সেই সাথে যুক্তিবাদী,সমাজ ও ধর্মের ন্যায় নীতির উপরে শ্রদ্ধাশীল হয়ে থাকে সাধারনত!

কোন মেয়ে ডিভোর্স করবার উদ্দেশ্যে কখনোই বিয়ে করে না।একটা সম্পর্ক তৈরী হলে এবং সেটা বিয়েতে গড়ালে সেই সম্পর্কটাকে ভিত্তি করেই মেয়েটি জীবন চালাতে চায়।কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর মধ্যখানে এসে বিকৃত মানসিকতার কেউ যদি জীবনসঙ্গী হয়ে মধ্যযুগীয় বর্বরতায় নারীর জীবন বিষিয়ে তোলে তখন সম্পর্কহীন হয়ে বেঁচে থাকার দুঃস্বপ্নময় অধ্যায় নিয়ে ভাবতে নারী বাধ্য হয়।

আমি বলব না সব ডিভোর্সের ক্ষেত্রে পুরুষ দায়ী বা অপরাধী!এ ও বলব না যে পুরুষ কখনোই নারীর অন্যায় বা অত্যাচারের শিকার হয় না।

কিন্তু একজন ডিভোর্সী পুরুষের প্রতি সমাজের সেই বিদ্বেষ,রোষ বা অপমানজনক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে না – যা একজন নারীর ক্ষেত্রে করে।একজন ডিভোর্সী পুরুষ নিজের বা তার পরিবারের দৌরাত্ম,অত্যাচার বা মিথ্যাচারের কারনে ডিভোর্সী হলেও ট্যাগ পেয়ে যায় বিবাহযোগ্য পাত্র। ঢাক ঢোল বাজিয়ে আবার কুমারী কন্যার স্বামী হয়ে যায়। সোনার আংটির বাঁকা কোথায় ফর্মুলায় তারা আবার হয়ে যায় গৃহী পুরুষ। কখন ও আগের বিয়ের সন্তান ও এবজরব হয়ে যায়।

তাহলে একই ঘটনা নারীদের ক্ষেত্রে নয় কেন?আয় করে না বলে তারা সোনার আংটি নয়?আর আয় করলেও তাকে কেন পতিত উপাধি পেতে হয়?তার প্রতি ই কেন দৃষ্টি বাঁকা হয়?সব কটুক্তি কেন তাকে উদ্দেশ্য করেই করা হয়?

ফিল্ম ইন্ড্রাষ্টি কিংবা মিডিয়া জগতের বহু নারীদের উচ্ছৃংখল পোষাক,উদ্ভট জীবন যাপন সব জেনেও আমরা তাদের অটোগ্রাফপ্রার্থী হই।আর স্বামীর পরকীয়া,শাশুড়ীর অত্যাচার সইতে না পারা নারীটি এত ই কেন চোখের বালি আমাদের?

একজন নারী যদি লিখে থাকেন,ডিভোর্স জীবনের শেষ নয়,জীবনের শুরু।
তার মানে এই নয় যে তিনি হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালার মত সবাইকে সুখী সাজানো ঘর সংসার ছেড়ে ডিভোর্সী হতে বলেছে।এর মানে এই যে,মেয়ে ডিভোর্স হয়েছে বলেই তুমি শেষ হয়ে যাওনি।

ডিভোর্সের পর কেউ যদি অনৈতিক জীবন কাটায় – এই দ্বায়ভার ঐ নারী বা পুরুষের। এই দ্বায়ভার ডিভোর্স নামক ইভেন্টের নয়।

কোন উচ্চ শিক্ষিত আর্নিং মেয়ে স্বামীর হাতে মার খাওয়ার কারনে যদি ডিভোর্সী হতে বাধ্য হয় এবং মার খাওয়ার ভয়ে পরবর্তী কোন সম্পর্কে যেতে ভয় পায়,সেখানে আমাদের সমাজের দুরবস্থা ভেবে লজ্জিত হই।

আমরা পরোক্ষ ভাবে অত্যাচারীর পক্ষ নেই।জীবনের এত বড় সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী কনসিকুয়েন্স এ অনেক সময় ডিভোর্সী হয়ে মেয়েরা আবার কোন নতুন প্রতারনার শিকার হয়।কেউ সত্যিই জীবন যুদ্ধের এই ধাক্কায় পরাজিত হয়,হারিয়ে যায়।

কেউ আবার প্রচন্ড মানসিক শক্তি আর পরিশ্রম দিয়ে টিকে যায়।এই টিকে যাওয়ার গল্পটা প্রচার হওয়া জরুরী।

যে পুরুষ অটিজম সন্তান জন্ম হলো বলে স্ত্রীকে ডিভোর্স দেয়,সেই ডিভোর্সী নারী যখন তার স্বল্প পুঁজি দিয়ে ব্যবসা কিংবা সামান্য বিদ্যার জোর দিয়ে চাকুরী করে সেই মহান স্বামীর ফেলে যাওয়া অবহেলিত,অসহায় সন্তানের হাতটি শক্ত করে ধরে।মুখে অন্ন তুলে দেয়,শিক্ষা দেয়!

সেই অটিজম বাচ্চাটি যখন তার অটিজম স্কুলে প্রথম হয়,ঐ মায়ের জীবনের বিশ টি বছরের এই কঠোর এবং করুন কাহিনী কেন সবাই জানবে না?কেন অন্যরা সাহসী হবে না? কেন সদ্য ডিভোর্স হওয়া কোন হেল্প সিকিং বাচ্চার মা এই শক্তি পাবে না,যে তিনি পেরেছেন। আমিও পারব!

তাই,আপনি তাকে লেজকাটা শিয়াল বলে কেবল আপনার পশ্চাৎপদতা আর হীনমন্যতার ই পরিচয় দিলেন।

যিনি মহান,লোকচক্ষুর অন্তরালে অন্যের দায়িত্বহীনতার পাষান ভার কাঁধে তুলে তার অনাড়ম্বর,রংহীন জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন,তিনি আপনাদের তীর্যক দৃষ্টির অগোচরে তার প্রাপ্য সম্মান ইহলোকে বা পরলোকে পাবেন ই!!

লিখেছেনঃ ডা.শিরীন সাবিহা তন্বী