মুক্তধারা

উৎসবে মনের ঘর

প্রিয়জনদের সাথে উৎসব পালন করছি। চারিদিকে কি দারুণ সাজসাজ রব।লাল সাদা হলুদ জলছাপা রং এর নানান রং এ সব সাজুগুজু মানুষেরা। কি দরুণ অনুভূতি। এমন পরিবেশ কার না ভাল লাগে। মাথায় একেক জন রং বেরং এর ফুল লাগিয়েছে।

কাউকে জলপরী কাউকে আকাশের পরী কাউকে বা পুতুলের মত লাগছে। সাথে একেক জনের ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক। চারিদিকে নানান স্বাদের খাবার কেনার হিড়িক। সবাই কত হাসাহাসি করছে গল্প করছে অনেক মজা করছে সবাই।

বাহ্ কি দারুণ পরিবেশ। মাঝে মাঝে এমন উৎসবের আয়োজনে জীবনের একঘেয়েমির সমস্যা দূর হয়।যা বোরিং লাগে না মাঝে মাঝে। সবকিছু অসহ্য লাগে তখন। যাক আজকের এই উৎসবে একঘেয়েমি দূর হয়ে যাবে। মনটা বেশ ভাল হয়ে যাবে।

কি খাবার কিনবো প্রিয়জনদের সাথে প্লান হচ্ছে। সামনে এগিয়ে যাচ্ছি খাবার কিনতে। এমন সময় চলার পথের ধারেই চোখ পড়ল এত বড় একটা নোংরা পোশাক এখানে পরে আছে কেন? খেয়াল করলাম পোশাকটা নড়াচড়া করছে। তারপর বুঝলাম এটা একটা জীবন্ত মানুষের শরীর। খাবার কষ্টে দূর্বল হয়ে সে এখানে পরে আছে।

কিছুক্ষণের জন্য যেন অন্ধ হয়ে গেলাম। কোথায় আছি বুঝতে পারলাম না। চোখের জল লুকালাম। যেন যেভাবে মানুষ তার মনের ইচ্ছেগুলোকে লুকায়। নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে খুব খারাপ লাগলো। মনে হল কেমন যেন চাকচিক্য পোশাক পরে আছি। নিজেকে বড্ড বেমানান লাগলো। তারপর হুশ ফিরে আসলো আমার।

ততক্ষণে প্রিয়জনদের কথা কানে আসলো। তারপর তাদের কথার সাথে সুর মিলালাম। যেন যেভাবে আমরা সবার সাথে সুর মিলিয়ে মিলিয়ে চলি। মনে হল যেন ঠিক সেই ভাবেই সুর মিলালাম। পরে বার বার ঐ দৃশ্যের কথা মনে হয়েছে নোংরা বস্ত্রে পরে থাকা লোকটা। কিছুই ভাল লাগছিলো না।

আমার মনে হচ্ছিল এই উৎসব টা কি আমার জন্য খুবই দরকার ছিল। সেদিন আমার যা বাজেট ছিল এই টাকা আমার একদিনের উৎসবের জন্য।এছাড়া এই উৎসবের পোশাকগুলো আলমারিতেই পরে থাকে।

আমি তো সিম্পল ম্যাচিং পোশাক পরেও এইদিন ঘুরতে পারতাম। এতে কি আমাকে প্রিয়জনরা চিনতো না তাতো নয়। হয়তো একটু সিম্পল লাগতো বা বেমানান লাগতো। কিন্তু ঐ নোংরা বস্ত্র পরা লোকটা কি বেমানান হয় নি?

বছরে ৩৬৫ টি দিন পরে আছে। আমার একঘেয়েমি দূর করার জন্য কি আর কোন উপায় ছিল না? তা তো নয়। কিন্তু ঐ লোকটার একঘেয়েমি বলে কি ঐ সময় কিছু ছিল?

সেদিন যে আমাদের এত ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক। সেদিনের উৎসবের স্মৃতিটাকে ধরে রাখতে। কিন্তু লোকটা ঐ উৎসবের দিনে যে পরিমাণ কষ্টে দিন পার করছে তার কাছে সেদিনের স্মৃতি টা নিশ্চয় মনের ক্যামেরায় বন্দি থাকবে। মুছে যাবে না কখনো।

একেক টা মুহূর্ত তার কাছে বাস্তব হয়ে থাকবে বর্তমান হয়ে থাকবে। উৎসবে আমরা মাথায় ফুল দিয়ে সাজে সজ্জিত। সাজটা বেশ দারুণ। কিন্তু ঐ লোকটার পেটে যে দারুণ ক্ষুধা তার কি হবে?

হতে পারে নিয়তির শিকারে বা কোন না কোন কারণে এইটাইপ পোশাকের বেশগুলোতে ভন্ডামি লুকিয়ে থাকে। মিথ্যে লুকিয়ে থাকে। হতে পারে অনেকেই এই অভিনয় করেই টাকা উপার্জন করে। সে দৃষ্টিতে তারা চোর।

আমি যে চোখের জল লুকিয়ে গল্পের সাথে সুর মিলিয়ে চলে গেলাম। চোখের জল লুকালাম। আমি কি তবে বিবেকের কাছে চোর না?

আমরা যে এত্ত এত্ত আনন্দ করি। আনন্দে আত্নহারা হই।

ঐ লোকটা ঐ সময়ে কি বাঁচার জন্য আত্নহারা ছিল না?

এতগুলো প্রশ্ন আমার কারো কাছেই না শুধু নিজের বিবেকের কাছে। কেউ শুনুক বা না শুনুক বিবেক তো সব জানে। নিজের যন্ত্রণা গুলোতো বোঝে। তাই আর চোখের জল লুকানো নয়। চোখের জলের সাথে মনের ঘরও খুলতে হবে। তাই আর লুকানো নয়।

উৎসবে আমি যাবো তবে সিম্পল ম্যাচিং পোশাকে। সেইদিনের বাজেটের টাকা হাতে নিয়ে। সারাদিন অনেক অভুক্ত মানুষের দেখা পাবো। তাদের আমার এই বাজেটের সাধ্যে খাবার কিনে দেবো। সেই উৎসবের ভীড়ের মাঝে আমি হয়তো বেমানান হবো।

তবুও আমি আমার বিবেকের কাছে সুখি থাকবো। ভাল থাকবো। সেদিন আমায় চোরের মত চোখের জল লুকাতে হবে না। মনের ঘর খুলে সেদিনের উৎসবটা উপভোগ করবো আমি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।