মুক্তধারা

পরিবার সন্তান এবং ভুল থেকে শেখা

সকালে উঠে দেখি তুমি ঘুমাচ্ছো। তাই স্কুল ব্যাগ নিয়ে পরিপাটি হয়ে বাসি খালি পেটেই টিউশনে যাচ্ছি। সকালে বাইরে কিছু একটা কিনে খেলাম। তারপর টিউশন শেষে বাসায় ফিরে খেয়েদেয়ে স্কুলে গেলাম। ক্লাস করলাম। বন্ধুদের সাথে টিফিনে খেললাম। স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরে আসলাম।

এসে দেখি তুমি ঘুমাচ্ছো। হাত মুখ ধুয়ে টেবিলে খাবার নিজে নিয়ে খেলাম। তখনও দেখি তুমি বিকেলের ঘুম ঘুমাচ্ছো। বিকেলে খেলতে বের হলাম। খেলাধুলা শেষে সন্ধ্যার আগে ফিরলাম। হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসলাম। তুমি আমাকে রাতের খাবার খেতে ডাকলে। আমি খাবার খাচ্ছি আর তুমি টিভি দেখছো।

তোমার পছন্দের সিরিয়াল দেখছো। সিরিয়াল টা আমার ভাল লাগে না। সেখানে শুধু মেয়েরা ঝগড়া করে। সিরিয়ালে মেয়েরা যখন ঝগড়া করে তখন তাদের হার জিত নিয়ে তোমার মুখের রিঅ্যাকশন দেখতে পাই। আমার ব্যাপারটা একদম ভাল লাগে না। তোমার রিঅ্যাকশন দেখে আমার মাঝে মাঝে হাসি পায়। খাবার শেষে আবার পড়তে বসলাম। তুমি একটু পরে টেবিলে এক গ্লাস দুধ দিয়ে মাথায় আলতো বুলিয়ে চলে গেলে। বলে গেলে দুধটা খেয়ে ঘুমাতে। আমি একটু পড়ে তারপর দুধটা খেয়ে ঘুমিয়ে পরলাম।

সকালে উঠে আবার নিত্যদিনের রুটিনে চললাম। এভাবেই চলতে চলতে কলেজে উঠলাম। প্রতিযোগিতার যুগ প্রতিযোগিতার পড়াশুনা। ক্রমেই ছুটতে লাগলাম। কিন্তু কোথায় ছুটছি তা জানি না। ছুটছি তো ছুটছি। তখন ফার্স্ট ইয়ারে আমি। নতুন নতুন বন্ধু জুটলো আমার। জীবনটা এত সুন্দর কখনো তা বুঝিনি।

এই প্রথম জীবনকে অনেক সুন্দর মনে হচ্ছে। প্রেমে পরলাম। ছ্যাকা খেলাম। বন্ধুরা সব ব্যাপারেই পাশে ছিল আমার। তারা আমার খুব সহজেই সমাধান দিয়ে দিত। কখনও ভাবিনি তারা আমার এত আপন। তাই বন্ধুদের ছাড়া আমি কিছুই ভাবতে পারি নি। বন্ধুদের সাথে আড্ডা গল্প লাইফ ইনজয় সবি চলতো আমার।

যখন আমার বন্ধুদের ছাড়া বাঁচা অসম্ভব তখন পরিবার তুমি আমার সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে দাড়ালে। বললে বন্ধু নির্বাচনে সচেতন হতে হয়। ভাল বন্ধুদের সাথে মিশতে হয়। আমি বললাম ওরা ভাল অনেক ভাল। ওদের সাথে আমি ভাল সময় কাটাই। তখন বললে এখন না বুঝলে পরে পস্তাবে। বড়দের কথা শোন। ওদের সাথে আর মিশবে না। এখন থেকেই সচেতন হয়ে যাও।

হাজার হাজার কথা তোমাদের। তোমাদের এত শাসন ভাল লাগছে না। কোনদিন তো এত কথা বলোনি। আমার স্বাধীনতায় কেন হস্তক্ষেপ করছো। আমাকে আমার মত থাকতে দাও। তোমরা সব সময় তোমাদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলে আমার জন্য তোমাদের এতটুকু সময়ও ছিল না। আমাকে আমার মত বাঁচতে দাও। এতকথা বলার পর পরিবার আমার গালে চড় বসালে।

অভিমানে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম। বন্ধুরা কিছুদিন পাশে ছিল। তারপর সবাই যে যার মত ব্যস্ত হয়ে গেল। ভাল লাগলো না আবার ফিরে আসলাম। পরিবারকেও ভাল লাগে না। বন্ধুদেরও আর ভাল লাগে না। সম্পূর্ণই একা হয়ে গেলাম আমি।

এত সমস্যায় আমার প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়েছি। আত্মীয় স্বজন,বাড়ি গাড়ি, টিভি নাটক সবটার জন্যই তোমাদের সময় ছিল। কিন্তু আমার জন্য কখনই সময় ছিল না। যার কারণে আমার আজকের এই একাকিত্ব।

এখন তো আরো ফেসবুক বা অনলাইন দুনিয়া হয়েছে।যা আমি প্রয়োজনের বাইরে কখনই ব্যবহার করি না।আমার গল্পটা হতে পারতো কলেজে পড়ুয়া ছেলের অজানা কোন কারণে আত্মহত্যা।

আমি চাইনা আমার সন্তান আমার মত একাকিত্বের শিকার হোক। তাই আমি সন্তানকে যথেষ্ট সময় দেই। পরিবারের ভুল থেকে আমি শিখেছি। আশা করি এমন ভুল আমি করবো না। কারণ আমি বুঝতে পারি সন্তানের মানুষ হওয়ার অবদানের মূল ভূমিকা পরিবার রাখে। আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে চাই।

লিখেছেন: জিলফিকা বেগম জুঁই