ইচ্ছেঘুড়ি

মেঘের রাজ্যে আমরা

পাহাড় কেমন দেখতে হয়, সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে কেমন লাগে মনে অনেক প্রশ্ন ছিল। সবাই সবসময় ঘুরতে যাচ্ছে, আমিও সুযোগ পেয়েছি ২-৩ বার, বিভিন্নসময়, কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন পরে আর যাওয়া হয়নি।

প্রথম পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতা হল প্রায় অর্ধেক জীবন পার করে, সাথী হিসেবে আমার বর্তমান সময়ের অনেক কাছের কিছু মানুষ। ভাবলেই অবাক লাগে আট মাস পুরো হয়নি আমাদের মাস্টার্স ব্যাচের ক্লাস শুরুর, এর মধ্যে একটা ট্যুর করে ফেললাম।

“জন্মাষ্টমীর ছুটিতে কুয়াকাটা যাব, কে কে যাচ্ছে?”
– ক্লাস শেষে ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগের গেটে চা খেতে গিয়ে প্রথম ঘোষণা আদনান ভাই এর। দেখা গেল সবাই রাজি। আলোচনা ঘুরে চলে গেল সিলেট, তারপর একে একে বান্দরবান, সেন্টমার্টিন। শেষে কনফার্ম হল সাজেক।

তিন দিনের ছুটিটা পড়েছে আমাদের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে সেমিস্টার ফাইনালের ঠিক মাঝে। ঠিক করা হল একটা পরীক্ষা পিএল এ আগানো হবে। কতভাবে চেষ্টা করা হল পরীক্ষা থেকে ট্যুর আলাদা করার, কিন্তু কিছুই করা গেল না। দেখা গেল শিক্ষকরাও এই ছুটিতে কক্সবাজার যাচ্ছে। পরীক্ষার মাঝে পড়ায়, আর অনিশ্চয়তার কারণে আগ্রহীর সংখ্যা কমতে লাগল। অবশেষে ২৪ তারিখ রাতে ৮ জন যাত্রা করলাম সাজেক এর উদ্দেশ্যে।

কুমিল্লা ফুডকোর্টে যাত্রাবিরতি শেষে ঘুমানোর পরিকল্পনা নিয়ে বাসের সামনের সারিতে বসলাম। ফেনী পার হওয়ার পর ধীরে ধীরে শুরু হল পাহাড়ি রাস্তা। অন্যরকম অনুভূতি। যেমন আঁকাবাঁকা রাস্তা, তেমন দক্ষ চালক। ঘুমানো বাদ দিয়ে হেডলাইটের আলোতে রাস্তা দেখতে থাকলাম। একবার উঠছি, একবার নামছি। রাস্তায় শুধু আমরাই। এভাবে একসময় পৌঁছে গেলাম খাগড়াছড়ি। বারবার চোখ বন্ধ হয়ে আসায় পাহাড়ে ভোরের সৌন্দর্য কিছু কিছু মিস করলাম।

খাগড়াছড়ি পৌঁছে নাস্তা সেরে রওনা দিলাম জীপে চেপে সাজেক এর উদ্দেশ্যে। পথের দু’পাশে পাহাড়। পাহাড়ি রাস্তায় জীপের ছাদে চড়ার শখও মিটল। দশটার দিকে বাঘাইছড়ি পৌছে প্রচণ্ড গরমে আর্মির এস্কর্টের জন্য আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা। মুখ দিয়ে বের করে ফেলছি ততক্ষণে কেন আসলাম? এখনো কেন পৌঁছাই না? তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। একটুও বাতাস নেই।

জিপে ওঠার সময় থেকেই প্রচুর নাটকের পর যখন গন্ত্যব্যে পৌঁছলাম তখন আড়াইটা পার হয়ে গিয়েছে। বিদ্যুত নেই তাই ফ্যান না থাকাটা মেনে নিলাম কিন্তু ঘেমে নেয়ে কটেজের অপর্যাপ্ত পানি দেখে মেজাজ আর এক দফা খারাপ হল। প্রায় সাথে সাথেই মনে হল “রোমে গেলে রোমানদের মত হও” প্রবাদটি। এক দিনের ব্যাপার। আনন্দ সম্পূর্ণ উশুল করতে হবে।

দুপুরের খাবারের পর ইভান ভাই বলল উনি এক জায়গায় ছায়া আর বাতাসের সন্ধান পেয়েছেন। গেলাম সবাই বাতাস খেতে। ছবি তোলা হল কিছু। আমাদের বিরক্তি কমাতেই মনে হয় প্রকৃতি সদয় হল। শুরুটা হল হাল্কা মেঘ দিয়ে। কটেজে পৌঁছতে না পোঁছতেই শুরু হল প্রচণ্ড বৃষ্টি। আমাদের সাড়ে চারটায় কংলাক পাহাড়ে যাওয়ার প্রোগ্রাম ছিল।

বৃষ্টি না থামায় জীপ কিছুদূর গিয়ে নামিয়ে দিল ; যাদের শখ তারা হেঁটে যাবে। ছাতা কাজ করছিল না বৃষ্টিতে, অনেক বেশি বজ্রপাত হচ্ছিল। দুইভাগ হয়ে গেলাম আমরা। কয়েকজন এর মাঝেই রওনা দিল, বাকিরা কিছুক্ষণ পরে। মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই সাজেকে। যোগাযোগের সুযোগ নেই। কেউ জানি না পাহাড় কতদূর।

অনেকেই ফিরে চলে আসছে কিছুদূর গিয়ে,নিরুৎসাহিত করছে আমাদের যেতে। বৃষ্টির কারণে রাস্তা পিচ্ছিল। কিন্তু বেড়াতে এসে পিছিয়ে যেতে মন সায় দিচ্ছিল না। আমরা একজন বাদে প্রত্যেকে কংলাকের চূড়ায় উঠলাম। তারপর ফিরতিপথেও অনেকটা রাস্তা বৃষ্টিতে ভিজে গল্প করতে করতে ফিরলাম। এবার সবাই একসাথে।

রুমে ফিরে ফ্রেশ হয়ে রাতের আড্ডা, পচানি চলল রাত ১২টা পর্যন্ত। রাতে চা খেতে গিয়ে প্রথম মেঘ টের পেলাম। কিন্তু আলো কম থাকায় কুয়াশার সাথে পার্থক্য করতে পারছিলাম না। টর্চ লাইটের আলোয় গবেষণা হল মেঘ নিয়ে কিছুক্ষণ।

ভোর চারটা ত্রিশে কোনরকমে ঘুম থেকে উঠে সূর্যোদয় দেখতে স্থানীয় হেলিপ্যাডে গেলাম সবাই। কিন্তু সূর্য মেঘের আড়ালে। কি আর করা। আর এক দফা ফটোসেশন শেষে কটেজে ফিরে নাস্তা করলাম আগের দিনের অর্ডার দিয়ে রাখা স্থানীয় খাবার ব্যাম্বু চিকেন দিয়ে। হেলাল ভাই খবর আনল সাজেকের চূড়াটা নাকি অনেক সুন্দর। ওখানে পৌঁছে মনে হল এটা না দেখলে সাজেক বেড়াতে আসা অপূর্ণ থাকত। এত সুন্দর !!! পুরোপুরি মেঘের রাজ্জ্যে আমরা তখন। কটেজ ছাড়লাম তার একটু পরেই।

সাজেক থেকে বাঘাইছড়ির রাস্তা রোলার কোস্টারের থেকে কোন অংশে কম না। জীপগুলো চালায়ও সেইরকমই। আমাদের একজনের ক্যাপ উড়ে গেল। সংরক্ষিত এলাকা পার হয়ে গাড়ি দাঁড়াল হাজাছড়া ঝর্ণার কিছু আগে। পায়ের ব্যথা উপেক্ষা করে অনেকগুলো নালা পার হয়ে এক সময় ঝর্ণার কলকল ধ্বনি শুনতে পেলাম।

আরও এগিয়ে জীবনের প্রথম প্রাকৃতিক ঝর্ণা দেখলাম। কিন্তু সকালে মেঘের কাছে গিয়ে এটা অতো একটা দাগ কাটছিল না মনে। ঝর্ণায় না ভেজাটা একটা কারণ হতে পারে। সারাজীবন যা দেখিনি, খুব অল্পসময়ের মধ্যে এতসব সুন্দর দৃশ্য হজম হচ্ছিল না সম্ভবত। অভাব পূরণ করল রিসাং ঝর্ণা। এটার কাছে পৌঁছানো যেমন কষ্ট, তেমনই ঝুঁকিপূর্ণ বর্ষায় এটাতে ভেজা। অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, প্রচন্ড পিচ্ছিল হওয়ায় আর সময় কম থাকায় মূল ঝর্ণার কাছে পৌঁছাতে পারিনি।

ভ্রমণ শেষ হয় মশাল জালিয়ে আলুটিলা গুহা দর্শনের মাধ্যমে। এটি প্রকৃতপক্ষে একটা ছড়া, গুহার মধ্যে দিয়ে এটায় উঠতে হয়। এখানে প্রাকৃতিক কোন আলো পৌঁছায় না। রাতে ডিনার সারলাম স্থানীয় খাবার বাঁশের তরকারি দিয়ে। রাত নয়টায় ঢাকার বাসে যখন উঠছি তখন মনে হচ্ছিল সুন্দর সময়গুলো এত দ্রুত শেষ হয়ে গেল!!!!

সাজেক আমার প্রথম ট্যুর ছিল। সেটা আরও আনন্দদায়ক হয়েছে আমাদের টিমের কারণে। প্রতিটা মুহূর্ত অসাধারণ কেটেছে প্রত্যেকের। প্রকৃতির অনেক কাছে ছিলাম আমরা। পরিশেষে একটি কথাই বলব যে আমরা আবার যাব।

(ঢাকা ইউনিভার্সিটির আই আই টি ডিপার্টমেন্ট থেকে আমরা সহপাঠীরা ফাইনাল সেমিস্টারে আর একটি ট্যুর করেছিলাম। সেবার ভেন্যু ছিল সেন্টমার্টিন, সাথে কাপ্তাই। সেবারও আমরা প্রচুর মজা করি, তবে এটা সত্যি যে প্রথম ট্যুরের ফিলিংস সবসময়ই একটু ভিন্ন, অনেক বেশি স্বপ্নময়, অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।)

ভ্রমণের সময়কাল : আগস্ট, ২০১৬
লিখেছেনঃ সানজানা ইসলাম সৌমী