মুক্তধারা

মনের রাজা | ভালবাসার গল্প

২০১৩ এর ডিসেম্বর মাস !
পোস্ট অপারেটিভ কেয়ার এ ভিজিটরদের কিছু সময়ের জন্য allow করা হয়েছিল। সেই সময় আমি দেখলাম আম্মা আর শাহীন ও এসেছে সুপ নিয়ে।
আমার যেহেতু থাইরয়েড সার্জারি হয়েছে মাথা তুলে বসতে আরেক জনের সাহায্য লাগল!

শাহীন বলল “সাবি, কিছু খাও”!
আমি মাথা নেড়ে আর মুখে কিছু বলে বোঝাতে চাইলাম সম্ভব না।

পুরো পোস্ট অপারেটিভে যতজন রোগী ছিলেন ঐদিন ,তারা বোধ হয় প্যাথেডিন নিয়েও ঘুমাতে পারেনি আমার বমি করার শব্দে!
পেটে কিছুই ছিল না তারপরও ভমিটিং রিফ্লেক্স এ শব্দটুকুই জোড়ালো ছিল! আম্মা আর শাহীন যেহেতু জানে না তাই ওরা অন্য সব রোগীদের মত আমাকে খেতে বলছে।

আমি বোঝাতে ব্যর্থ হলাম! তারা আমাকে কিছু খাওয়াবেই! সুপ আমার বিশেষ পছন্দের খাবার না তাই আগের চেয়ে তিনগুন বেড়ে গেলো বমি!!
সাথে সাথে বিএসএমএমইউ এর স্টাফ রা আম্মা আর শাহীন কে বেড়িয়ে যেতে অনুরোধ করলেন।

আমাকে এভাবে রেখে যেতে তাদের কতখানি কষ্ট হচ্ছিল জানিনা। তবে আমি জানতাম আমার এই তীব্র কষ্টের মুহুর্তে তারা পাশে থাকলেই বরং ওষুধের চেয়ে বেশি কাজ করত!
রাতে নার্স যখন লাস্ট এম্পুল টা পুশ করেছিলেন তখন রেগে বলেছিলেন “এইটাই শেষববারের মতন আপনার বমির ইনজেকশন আর দিতে পারবনা “।

একদিন বাদে আমি বেডে ফিরলাম। খুব সকালে শাহীন হটপটে করে খাবার নিয়ে আসল।নরম খিচুড়ি!খাবারের চেহারা দেখে আমি অবাক! এতো ভালো শাহীন কিভাবে রান্না করল!খেতে নিয়ে বুঝলাম ডাল অনেক বেশি দেয়ায় কেমন তিতকুটে হয়ে গেছে।

কিন্তুু এ খাবারে যে সীমাহীন ভালোবাসারা মাখামাখি করে ছিল সে স্বাদটা এখনো হৃদয়ে লেপ্টে আছে!তাই মুখে কিছু না বলে ওর কৌতুহলী চোখের সামনে জোর করে খানিকটা খেয়ে নিলাম।

বিয়ের সাত বছর পর পাকাপাকি ভাবে সংসারে ফিরেছি। ডাক্তারি পড়ার জন্য আমি এক যায়গায় আর ও আরেক যায়গায়। এতদিন ভ্রাম্যমাণ জীবনে যে মানুষটাকে চিনতাম সে ছিল একরকম।

সংসার জীবনে তাকেই আবার নতুন করে আবিষ্কার করলাম! দেখলাম, মানুষটার প্রথম প্রায়োরিটি তার আপনজন!
কিভাবে যেন সে পুরোটা সময়ই আমার পাশে থাকার চেষ্টা টুকু করে যায়। যতক্ষন অফিস করে তার বাদে কোনোদিন একটা আড্ডাতেও যেতে দেখিনি! অথচ অফিসের পর সে আগে অনেক দেরি করে ঘরে ফিরত।

চেম্বার থেকে আসতে আমার দেরি হোক না হোক, আমি দেখি সে মেয়েকে ভাত খায়িয়ে খাবার গরম করে টেবিলে সাজিয়ে রেখেছে। আজ পর্যন্ত আমাকে ফেলে সে রেয়ারলি একা খেয়েছে।

আমাদের কোনো পার্মানেন্ট হেলপিং হ্যান্ড না থাকায়, কোনোদিন সে বলেনি বা ভাবেনা “এটা আমার কাজ আর ঐটা তোমার কাজ ”
সে বলবে “এটা আমাদের সংসার ”

আমি আর সে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। এতটা অনারম্বর বিয়ে হয়ত এখনকার যুগে কেউ কল্পনায় আনতে পারবেনা। সে আর আমি বরকনে সাজতে পারিনি।
ঐ আফসোস টা আগে অনেক কষ্ট দিত। কিন্তু এখন আর হয়না।

বাস্তবতার ভিড়ে অনেক রকমের “বাস্তবতা ” লুকিয়ে থাকে।সেখানে কেউ হয়ত physically অথবা mentally অথবা দুটো দিকেই সাফার করে!
সেই গল্পগুলো সেই কষ্ট গুলো ও যেমন হরহামেশাই সামনে আসে না তেমনি আমারও এই জীবনটাকে বিশেষায়িত করা হয়না।

মুখ ফুটে ভালোবাসি বলার সময় হয়না,বিশেষ দিবস পালনের আয়োজন ও হয়না! তারপরও চারপাশে কিছু কষ্টের গল্প কানে আসে,কিছু নিরব নিপিড়ন, কম্প্রোমাইজ এর ভিড়ে নিজেকে বড্ড সুখী মনে হয় আমার।

আগে অনেক চিরকুট লিখতাম আমি। যখন বাসায় এসে কিছুদিন থেকে আবার ফিরে যেতে হত। আমার অভিমানের অভিযোগ ছিল “তুমি কিছু লিখতে পারোনা আমাকে? ”
ও বলে “আমি পারিনা বাবু ”
এখন আর অভিযোগ নেই, এখন আর চিরকুট লিখিনা আমি।কিন্তু এখন ঠিক বুঝি, এই মানুষটা যা লিখতে পারেনা সেটা সত্যিই লেখা সম্ভব নয়!
আমার প্রতি তার ভালোবাসা শুধু ভালোবাসা নয় সেখানে মায়া, শ্রদ্ধা, দায়িত্ব মিলে যে ছোটবড় বিশাল এক কাব্য সেটা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়।

আমার জন্মগত পায়ের সমস্যা (ক্লাব ফুট) ছিল বলে আম্মা বলতেন “তুই যেনো রাজ সুখ পাস মা …এই দোয়া করি… ”
আম্মার দোয়াটা মনে পরে রোজ, অনুভব করি সেটা আল্লাহ কবুল করেছেন!

“রাজ্য হলেই হয়না রাজা
মনের গরিব হলে
আমি হলাম রাজার রানী
মনের ধনী বলে
মাগো তোমার পুতুল ছিলাম
তেমনি সুখে আছি
দোয়ায় রেখো এমন করেই
দুপারেই যেন বাঁচি ”
—আলহামদুলিল্লাহ্

লিখেছেনঃ ডাঃ সাবিহা পারভীন
(উৎসর্গ: আমাকে আগলে রাখেন যাঁরা- আম্মা ও শাহীন)