'ও ডাক্তার'

কর্কট কথা’র শুরুর গল্প

আজ এতোটা বছর পরে আমি ঠিকমতো ঠাহর করতে পারছি না কিছু।আমি কোথায় আছি এখন!সবকিছু ঝাপসা লাগছে। আসলে এতটা লম্বা সময় স্যুটকেসে বন্দী ছিলাম,সয়ে আসতেও তো অনেক সময় লাগার কথা।

ফাইজা আমার নাম দিয়েছিল অলক। ওর সাথে আমার পরিচয় পর্ব কিছুটা অদ্ভুত। প্রথম প্রথম তো ও আমাকে সহ্যই করতে পারত না। আসলে আমি তো দেখতে সুন্দর না।

কালো আমি ঠিক আছে কিন্তু রেশমী,কোমল না।ফাইজার আসল চুলগুলো নাকি খুব সুন্দর ছিল। অনেক প্রশংসা শুনেছি ওর বন্ধু-আত্মীয়দের মুখে। ওর রুমে একটা ছবি ছিল-ঝলমলে হাস্যোজ্জ্বল ফাইজার;গোলাপগ্রামে তোলা ছবিটা। ছবি দেখেই বুঝেছি কী চমৎকার সুন্দর ছিল ওর আসল চুল। শেষ বিকেলের কনে দেখা আলোর কিছুটা ওর ডান গালে আর কিছুটা চুলে ঠিকরে পড়ছিল।এত্ত মায়াবী ছিল ছবিটা!ফাইজাকেই মনে হচ্ছিল একটা ফুটন্ত গোলাপ যেন।

সেই মায়াবী মেয়েটার বয়স যখন ১৬,তখন অসুস্থতার শুরু। এই ডাক্তার,সেই ডাক্তার;কত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ধরা পড়লো মেয়েটার শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার!লিউকেমিয়া তার নাম।

মাত্র এস.এস.সি. পরীক্ষা দিয়েছে তখন মেয়েটা।রেজাল্ট দিয়েছে,এ+ পেয়েছে।কলেজে ভর্তি হবে। একমাত্র মেয়ের এই রোগ ধরার পড়ার পর মা-বাবার অবস্থা পাগল্প্রায় ছিল। কী করবে,কোথায় নিয়ে যাবে মেয়েকে কিছুই ভাবতে পারছিলেন না।মেয়ে কিন্তু ছিল যথেষ্ট সাহসী। ফাইজা নামের অর্থ যে বিজয়িনী!সে ঠিক তার মা-বাবার সাহস ফিরিয়ে আনে।

শুরু হয় দেশসেরা ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসা। শক্তিশালী কেমোথেরাপীর কারণে দেখা দেয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। রেশমী চুলগুলো পড়ে যেয়ে মাথা খালি হতে থাকে ফাইজার। আয়নার সামনে চিরুনী হাতে দাঁড়িয়ে থাকতো মেয়েটা।মাথায় চিরুনী দেয়া মাত্র যে থোকা থোকা হয়ে উঠে আসবে তার রেশমী কোমল চুল।খুব কান্না পেতো ফাইজার। তবে ডাক্তার আঙ্কেল বলেছেন,এটা ঠিক হয়ে যাবে।আপাতত চুল পুরোটা ফেলে দিতে বলেছেন আঙ্কেল।

আসলে এসবই আমি শুনেছি পরে।

সেই চুল ফেলে দেয়ার কিছুদিন পরই ফাইজার সাথে আমার সাক্ষাত হয়। ফাইজার কাজিন তানি আপুর বিয়ে ছিল মাসখানেক পর। কত জল্পনা-কল্পনা ছিল ওদের এই বিয়ে নিয়ে সেই ছোটবেলা থেকে!তানি আপু ওদের কাজিনদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। আপু তো বিয়ে প্রায় ভেঙ্গেই দিতে চাচ্ছিলেন ফাইজার অসুস্থতা জানার পর। ফাইজা আপুকে বুঝায়। সাহস দেয়।

পরে একদিন তানি আপু আর ফাইজা মিলে সারাদিন ঘুরে,শপিং করে। সেদিন নিউমার্কেটের এক পরচুলার দোকান থেকে আমাকে কিনে বাসায় নিয়ে আসে। মূলত বিয়েতে পরার জন্যই আমাকে নিয়ে আসা। এমনিতে বাইরে যাওয়ার সময় ফাইজা স্কার্ফ পড়তো বা ওড়না মাথায় দিয়ে দিত। কিন্তু বিয়েতে সবাই একইরকম সাজবে ঠিক করেছিল,একইরকম চুল বাঁধবে!কিন্তু সময় সবসময় তো পক্ষে থাকে না।তাই বিকল্প হিসেবে আমার আগমন।

হ্যাঁ,আমি পরচুলা অলক বলছি। ফাইজা খুব ইমোশনাল একটা মেয়ে। কিন্তু বাইরে ভাব ধরতো যেন প্রচন্ড শক্ত মনের অধিকারী। ফাইজা প্রথম প্রথম আমাকে একটুও পছন্দ করতো না। কিনে এনে অযত্নে ফেলে রেখেছিল।একদিন গভীর রাতে আমাকে দু’হাতে তুলে মাথায় বসায় সুন্দর করে। সেদিনই ও আমাকে নাম দিয়েছিল অলক।

ফাইজা অনেক রাত জাগতো প্রায়ই।ডায়েরী লিখতো। একা একা কথা বলতো। মাঝে মাঝে আমাকে মাথায় নিয়ে কতভাবে বাঁধতো! আমার অনেক ভাল লাগতো।
তানি’পুর বিয়ের দিন ফাইজা খুব সাজলো অন্য কাজিনদের সাথে। পারলারে গেল,আমাকে সেট করলো।সবার মত ফুল জড়ালো আমার গায়।দিন দিন অসুস্থতার ছাপ প্রকট হচ্ছিল ফাইজার চেহারায়,তবু পরীর মত লাগলো মেয়েটাকে।আমি নিজেকে আয়নায় দেখে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে এটা আমি।

সেদিনই ছিল ফাইজার সাথে আমার প্রথম এবং শেষবারের মত এতোটা দীর্ঘ সময় কাটানো। এর তিনদিন পর ফাইজার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।শুনেছি সাত দিন আই.সি.ইউ. তে ছিল ফাইজা।ওকে আর তখন চেনা যেতো না। হাসপাতালে ভর্তির ঠিক ১৪ দিন পর মারা যায় ফাইজা।

এরপর সময় যায়,আমার গায়ে ধুলোর আস্তরণ জমে। ফাইজার রুমের দেয়াল থেকে ওর ছবিটা নেমে যায়।ধীরে ধীরে আমার আবাস হয় এই স্যুটকেসে। এটা ফাইজা ব্যবহার করতো।

জাকিয়া আন্টির কন্ঠ শুনতে পাচ্ছি- ‘বাবা,তোমরা কাজ করছো জেনে ভাল লাগলো। আমার ফাইজার এই ক’টা জিনিসই আছে স্যুটকেসে। ডায়েরী তো পড়েছোই। এটা বাকি ছিল,নাও।

পড়া শেষ হলে আবার ফেরত দিয়ে দিবে।ওর লিখা থেকে যদি অন্যান্য কর্কট-যোদ্ধারা কিছু সাহস পায়,সে তো ভাল। আর অলক মানে পরচুলাটা তোমাদের সংগঠনে রেখে দাও।আরেক ফাইজাকে না হয় দিও।‘

-‘আন্টি,তোমাদের বলছেন কেন? আপনারা শুরু না করলে এর জন্মই হতো না। আজ পাঁচ বছর হয়ে গেল আমাদের ‘কর্কট কথা’ এর। ফাইজার সাহসটুকু যদি আমরা কর্কট যোদ্ধাদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারি,ওরা তাহলে ভেংগে পড়বে না। ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পাবে।অন্তত জীবন্মৃত হয়ে কেউ থাকবে না। আর কুসংস্কারগুলোও দূর করতে হবে।সবসময় মাথার উপর আপনাদের ছায়া লাগবে আন্টি। দোয়া করবেন।’

জাকিয়া আন্টি কান্না করছেন;টের পাচ্ছি।

আমি আড়মোড়া ভেঙ্গে প্রস্তুত হচ্ছি।এবার তাহলে যেতে হবে। অন্য কোন যোদ্ধার কাছে।

লিখেছেনঃ ডা.ফাহমিদা ফারহানা পিংকি
(Assistant Surgeon at Ministry of Health and Family Welfare)