মুক্তধারা

প্রথম মা

কৈশোরের গন্ডি না পেরুলেও জীবনের গন্ডিতে মা হবার সৌভাগ্য হয়ে গিয়েছিল! মনে হয় এইতো সেদিন, ২৩৩ নাম্বার বাড়ির দোলতায় একদম দক্ষিণের কামরায় জন্মেছিল আমার প্রথম সন্তান, আমার ছোট্ট প্রজাপতি !

৩০ তারিখ বিকেলেও ছাদে দাঁড়িয়ে একাকি কথা বলেছি অনাগত প্রজাপতি’র সাথে।দু’দিন আগেও চেকআপ করিয়ে এসেছি ডাঃ মালিহা রশিদ এর কাছে।
বলেছিলো তিনি, বাচ্চার পজিশন ঠিক নেই, তবে ২১ শে ফেব্রুয়ারির আগে আশা করি ঠিক হয়ে যাবে।

৩০ তারিখ ১৬ মাঘ রাত ১১ টায় খেতে গিয়ে ভালো না লাগায় উঠে চলে যাই! ১২.৩০ এর দিকে ব্যথা সইতে না পেরে উঠে হাটা হাঁটি শুরু করি !
এক পর্যায়ে বরকে ডেকে বলি মা কে ডেকে পাঠাও। জানতে চায় কেনো কি হয়েছে? বললাম আমার কষ্ট হচ্ছে।

বর বলে ডেট তো আরো ২১ দিন পরে এতো আগে মনে হয় ফলস্ পেইন । আমি বলি ভাবী মানে আমার বড় জা কে ডাকো।
বলে ভাবি হাইপারটেনসন এর রোগী উনাকে এখন ডাকলে উনার প্রেসার বেড়ে যাবে।

ব্যাথা বাড়তেই থাকে,বাড়তেই থাকে রাত তখন ৩.০০ টা আমি বরকে আবার বলি আমি মারা যাচ্ছি ! তখন সে বড় জা কে ডেকে আনে। আমার মা কে ফোন করে আনিয়ে নেয়। পরিচিত একজন নার্স আসে। একজন দাইমা ও আসে।

তাঁরা সবাই এক হতে হতে ভোর ৫.০০ টা! ব্যাথায় ব্যাথায় এই দীর্ঘ রাত ভোর হয়ে গেল। এক পর্যায়ে কেউ কেউ হসপিটালে নেয়ার পরামর্শ দিলো । সেই ব্যথার মাঝেও আমি বলছি না হসপিটালে যাবো না। আমার সন্তানের প্রথম কান্না শুনতে পাবোনা। ওখানে গেলেই আমাকে সিজার করাবে।

অবশ্য এরই মাঝে নার্স ব্যাথা বাড়বার ইনজেকসন দিয়েছে দাই’মা মরিয়ম ফুল পানিতে ভিজিয়ে রাখছে।

মা মাথার কাছে বারবার দোয়া ইউনুস পাঠ করছে। মাঘ মাসের সেই হাড় কাঁপানো শীতেও বাবা ভিজে চুপচুপা পাঞ্জাবি পড়ে পায়চারি করছে ।

হঠাৎ খেয়াল হলো মাকে,
মা ও কাঁদছে…….

সেই প্রথম অনুভব করলাম আমার মা এর কষ্ট!

মা বলে আর একটু সহ্য কর সোনা, তারপর হ্যাঁ তারপর আর কাঁদিনি আমি ! শুধু উপর ওয়ালাকে বলেছি আমার মা এগারো বার এই কষ্ট সয়েছে ! সেই মার জন্যে এগারোটা বেহেস্তে বানিয়ে রেখো উপারে!

আমি যেনো অন্য এক আমি হয়ে গেলাম! মা এগারো বার সইতে পারলে আমি কি একবারও সইতে পারবো না? আমি যে সেই মায়ের’ই সন্তান।

অবশেষে,সকাল পোনে আটটায় সব যন্ত্রনার অবসান ঘটিয়ে এক ছোট্ট প্রজাপতি চিৎকার করে তার অসহায়ত্বের কথা জানান দিলো !

সবাই বলে ঘরে আলো এসেছে, আলো এসেছে! কেউ বলেনি তাকে আলোয় জড়িয়ে রাখো। তবুও রেখেছি নিজের চেয়ে হাজার গুন বেশী আলোয় ভরে !
আলোকিত জীবন গড়ার তাগিদে আমার থেকে অনেক দুরে বেশ কয়েকটা বছর কাটিয়েছে। আমরা জানি তাকে ছাড়া আমরা কতটা অন্ধকারে ডুবে থাকি।
মানুষের সব মহৎ গুনাবলী নিয়ে প্রজাপতিটা যেনো এগিয়ে যেতে পারে, আলোকিত করতে পারে এই মানব জন্ম। সবাই দোয়া করবেন। শুভ জন্মদিন আমার জান বাচ্চা। মায়ের পৃথিবীর সবটুকু ভালোবাসা তোমার জন্যে।

লিখেছেনঃ রূপকথা রুবি