অনুরণন

পারফিউম | ছোটগল্প

কলিং বেল দিয়ে সোজা হয়ে না দাঁড়াতেই দরজাটা খুলে দিলো সেলিনা,মনে হলো দরজার হ্যাজবলে হাত দেওয়ায় ছিলো। মেয়েটার মুখের হাসি সরেনা কখনই,সব সময় হাসি হাসি মুখ তার। এটা যাহিদের খুব ভালো লাগে। সারাদিন পর ঘরে এসে এমন উজ্বল মুখ দেখতে কার না ভালো লাগে।

দরজা লাগিয়ে দিয়ে সেলিনা একেবারে যাহিদের পাশে এসে দাঁড়ালো,যাহিদ জুতা খুলতে খুলতে একবার তাকালো, তাকিয়েই চোখ জুড়িয়ে গেলো। গাড়ো সবুজ শাড়ি পরেছে আজ সেলিনা। সবুজ যাহিদের খুব প্রিয় রং,আর সেলিনাও মাঝে মাঝে শাড়ি পরে কারনে অকারনে। এটাও যাহিদ পছন্দ করে। নাকে সবুজ পাথর বসানো নাক ফুলটা খুব মানিয়েছে।

সেলিনার গোলাপি গালে গাল ছোঁয়ানোর মজাই আলাদা,ছোট বাচ্চাদের মতো হেসে গরিয়ে পরে সে। সেটা এক দেখার মতো দৃশ্য আর যাহিদ ওর হাসি মুগ্ধ নয়নে দেখে তখন। যাহিদ সেলিনার কোমরে হাত দিয়ে এক টানে কাছে নিলো, গালে গাল ছোঁয়াতে যাবে ঠিক তখনই সেই পারফিউম এর গন্ধ নাকে এলো। মুহূর্ত্বেই সেলিনাকে সরিয়ে দিয়ে ঘরের দিকে চলে গেলো যাহিদ।

শুধু এই গন্ধটার কারনে যাহিদ আর সেলিনার কাছে যেতে পারছে না। সেলিনা তখনও যাহিদের চলে যাওয়া দেখছে অবাক দাঁড়িয়ে।

যাহিদ ওয়াশ রুমের আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে আছে। গন্ধটা এখনও তার সারা শরীরে লেগে আছে। সেই রাতে হোটেলের লবিতে চোখ পরতেই যেনো চোখ আটকে যায় মেয়েটার উপর, এমন স্নিগ্ধ, সুন্দর মুখ সে আগে দেখেছে বলে মনে পরে না।

ভার্সিটি লাইফে সেলিনাকে সবচেয়ে সুন্দর মনে হতো। যাহিদ আবারও না তাকিয়ে পারলো না,এবার মেয়েটার চোখে চোখ পরে গেলো। কি অসাধারন চাহনি তার,হৃদয় যেনো কয়েক টুকরা হয়ে গেলো তার চাহনীর তীব্রতায়, সমস্ত অহম,আত্মসম্মান বোধ বিলীন হয়ে গেলো। যাহিদ মনে মনে ভাবে এ কেমন সৌন্দর্য যেটা মানুষকে নিমিষেই তলিয়ে নিয়ে যায়! আজ যেমন সে তলিয়ে যাচ্ছে।

মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে বিছানার এক পাশে। যাহিদ অকারনে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে,ভীষন সুন্দর একটা গন্ধ নাকে লাগছে। মেয়েটা যে পারফিউম দিয়েছ সেটার গন্ধে পুরা ঘর ভরে গেছে।

– কি নাম তোমার?

– ববি

– তুমি কি পারফিউম দিয়েছো ববি?

-জি স্যার। আপনার যদি খারাপ লাগে তাহলে আমি এখনই কাপড় বদল করে আসছি।

– না খারাপ লাগছে না,কি পারফিউম এটা?

– ব্লু লেডি

– এটাই নাম? আমি অবশ্য এসব কিনি না তাই চিনি না।

– জি স্যর। আমিও কিনি নাই, আমার এক আত্মীয়ের দেওয়া। আমার খুব ভালো লাগে এটা।

– যাহিদ আর অপেক্ষা করতে পারছে না। মেয়েটির হাত ধরে পাশে বসালো। ঘারের চুল সরিয়ে আলতো স্পর্শেই মেয়েটি কেঁপে উঠলো। যাহিদ চাইছিলো ববির গোলাপি ঠোঁটের উষ্ণতা নিতে ঠিক তখনই ফোনের শব্দে দুজনই চমকে উঠে।

– আমার ফোন স্যার।

– এতো রাতে? অন্য কাউকে কোথাও সময় দিয়ে রেখেছো নাকি?

কোন উত্তর না দিয়ে ববি ফোন কানে তুলে নিলো। কয়েক সেকেন্ড পর তার গাল গড়িয়ে পানি পরতে শুরু করেছে। ফোন রেখে ববি এগিয়ে এলো,বিছানায় রাখা প্যকেট যাহিদের দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজের পরনের কাপড় খুলতে খুলতে বললো স্যার একটু তাড়াতাড়ি ছুটি দিবেন। আমার বাবা মারা গেলো এখনই, আমি টাকা নিয়ে গেলে বাবাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়বে। ছোট ভাইটা আমার জন্য বাবার লাশ নিয়ে অপেক্ষা করছে।

যাহিদের চোখের পর্দা যেনো নিমিষেই সরে গেলো,কি করতে যাচ্ছিলো সে এটা? কি হয়ে যেতো? তার নিজের প্রতি বিশ্বাস উঠে যেতো আজ। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে,কি করে সেলিনাকে ভুলে গেলো সে?

-স্যার? আমাকে কি একটু আগে ছেড়ে দিবেন?

-যাহিদের ঘোর কেটে গেলো যেনো। তুমি যাও ববি। তোমার ছুটি।

-তাহলে যে বাবাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়াতে পারবো না স্যার।

– কত বিল হয়েছে?

-চার হাজার টাকা

যাহিদ পাঁচ হাজার টাকা মেয়েটার হাতে দিয়ে চলে যেতে বলে সে সিগারেট হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তার গা থেকে এখনও পারফিউমের তীব্র গন্ধ আসছে।

লিখেছেনঃ সাজিয়া আফরিন