মুক্তধারা

ক্লাস ফাইভে পিরিয়ড

ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন।পড়ছিলাম কোন এক বিকালে।হঠাৎ মনে হল প্যান্টে ভেজা ভেজা কিছু একটা লেগে আছে। ভাবলাম দূরু কিছু না পড়িতো।আবার মনে হল ভেজা ভেজাটা বেশি হচ্ছে মনে হয়।

ওয়াশরুমে গেলাম।গিয়ে যা দেখলাম তাতে তো মাথা ঘুরে গেল।প্যান্টে তো দেখি পুরোটাই রক্তে ভিজে আছে। অনেক বেশি ভয় পেলাম। মাথাটা যেন মুহূর্তেই খুব বেশি ঘুরছে। বার বার মনে হল আমি মনে হয় আর বেশিদিন বাঁচবো না। তাই জন্য মনে হয় এত রক্ত।

ওয়াশরুমে কিছুক্ষণ ভয়ে থ মেরে থাকলাম।কি করব বুঝতে পারছি না। কাকে বলবো বুঝতে পারছি না। ব্যাপারটা তো খুবই লজ্জার কি করে বলি। কিভাবে বলি। কিভাবে বলবো। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। কি করব। ওয়াশরুমে কিছুক্ষণ এভাবে থাকতে থাকতে মাথাটা যেন আরো বেশি ঘুরছে। কিন্তু না বলে তো কোন উপায় নেই। ব্লাডের ব্যাপার বলতেই তো হবে।

না জানি আমার কোন বড় অসুখ হয়েছে। হয়তো আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না। এটা ভেবে কান্না চলে আসলো। কিছুক্ষণ কাঁদলাম।আর বেশিদিন বাঁচবো না ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বার বার মনে হল এত তারাতারি মারা যাব। খুব মন খারাপ হয়ে গেল। শেষে ভাবলাম বলতেই তো হবে। এভাবে কতক্ষণ ওয়াশরুমে থাকা যায়। খুব দূর্বল লাগছিলো। অনেক কষ্টে ধীরে ধীরে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসলাম। ভাবলাম এত লজ্জার কথা কাউকে বলতে পারবো না। শুধু আম্মুকে অনেক কষ্টে বললাম।

আম্মু প্যান্টটা দেখলো। তারপর খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমাকে কিছু নিয়ম বলে দিল।
আমি ভাবলাম ব্লাড দেখে আম্মু এত স্বাভাবিক কেন?
আমার কি তাহলে কিছু হয় নি?
ভয়ংকর কোন অসুখ হল কিনা টেনশনে আছি আর আম্মুর স্বাভাবিক আচরণ দেখে অবাক হচ্ছি।
তার স্বাভাবিকতা দেখে জিজ্ঞাসা করলাম আমার এমন হল কেন?

আম্মু সব নিয়ম কানুন বলে দিয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলল এটা কোন ব্যাপার না। এটা নিয়ম। এটা মেয়েদের হয়। এটাকে মাসিক বলে। এটা মেয়েদের প্রতিমাসে একবার করে হয়।
আমি টেনশনে বললাম কেন?

আম্মু বলল এটা নিয়ম। আমি আর কিছু বললাম না। শুধু মন খারাপ করলাম। প্রতিমাসে একবার করে ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন জানি ঝামেলা ঝামেলা লাগলো। বার বার এ ঝামেলা কেন করতে হবে ভেবে ভাল লাগলো না। কিন্তু কি আর করার মনটা খারাপ হয়ে গেল।

তারপর কোন একমাসে মিনস না হলে খুব খুশি হতাম। ভাবতাম এই মাসে কোন ঝামেলা হল না। ইস এই ভাবে যদি কোন মাসে না হত খুব ভাল হতো। যদিও নিয়মিত মিনস হওয়ার জন্য ঔষুধ খেতে হয়েছিল। কিন্তু কি আর করার ঝামেলা তো ঝামেলায়। এসব ভেবে খুব অশান্তি লাগতো ব্যাপারটা তখন আমার।

যাইহোক ধীরে ধীরে ব্যাপারটা ক্লিয়ার হয়ে যাই। যে এটা একটা নির্দিষ্ট সময় শুরু হয় আবার একটা সময় বন্ধ হয়ে যায়। শুরু শেষ এর ব্যাপারটা কারো কারো কিছুটা আগে বা পরে হয়।

আম্মু ইন্টার পাস সব সময় ফার্ষ্ট গার্ল ছিলেন। তারপরও একটা ভুল কথা বলেছিলেন, মিনস শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকে তিনটা দাগ দিয়ে রাখতে। একটা দিন পার হলে সেদিন একটা দাগ কেটে রাখতে। তাহলে নাকি তিনদিনের বেশি মিনস হবে না। বড় হয়ে বুঝলাম এটা কুসংস্কার। আসলে দিনের ব্যাপারটা কতদিন থাকবে তা শরীরের সুস্থ অসুস্থতার উপর ডিপেন্ড করে।

ব্যাপারটা সম্পর্কে একটু হালকা ধারণা থাকলে হয়তো ছোটবেলায় ওয়াশরুমে এত অসহায়ের মত ভয় পেতাম না। আমার মনে হয় এই ব্যাপারে না জানা অনেকেই ছোটবেলায় প্রথম অভিজ্ঞতায় অনেক ঘাবড়ে যায়। তবে এ ব্যাপারে আগে থেকে একটু হালকা ধারণা থাকা দরকার।

গল্পচ্ছলে বন্ধুত্বভাবে এই পিরিয়ড সম্পর্কে ছোট্টমেয়েটিকে কিভাবে কখন একটু হালকা হলকা করে ধারণা দেয়া দরকার এটা একমাত্র মা ভাল বুঝতে পারবেন। তাহলে ছোট্ট মেয়েটিকে অহেতুক ভয় পেতে হবে না।

এখন তো সময় অনেক বদলে গেছে তাই এ ব্যাপারে খুব স্বচ্ছ ধারণা গুলো আমাদের মায়েরা রাখতে পারেন এবং তার আদরের ছোট্টমেয়েটিকে সচেতন করে দিতে পারেন।

কেউ একজন মা তার মেয়ের পিরিয়ড হওয়ার আনন্দে বাসায় মজার মজার রান্না করে একেবারে উৎসব উৎসব লেগে গেছিল সেই বাড়িতে। বুঝতেই পারছেন সেই মা তার মেয়েটিকে এ ব্যাপারে কতটাই না ভালভাবে সচেতন করে দিতে পেরেছেন আর বেশ উৎসাহও দিয়েছেন। মা হবে তার মেয়ের প্রথম বন্ধু। তাহলে মেয়ে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে সবটা সামলে নিতে শিখবে।

আর এ ব্যাপারে ছেলেদেরকে ধারণা দেওয়ার দায়িত্ব মাকেই নিতে হবে বা এই পিরিয়ড এর বিষয়গুলো নিয়ে ছেলে মেয়ে উভয়কে বাবা মা যে কেউ বলতে পারেন। কিভাবে কখন বললে ভাল হবে তা সবার আগে বাবা মা ই ভাল বুঝতে পারবেন।

ছেলেদেরকে সবচেয়ে ভাল হয় এভাবে বললে যে, এই পদ্ধতি না থাকলে সে এই পৃথিবীতে আসতে পারতো না। এতে ছেলেটির মনে এ ব্যাপারে প্রথমেই শ্রদ্ধাবোধ কাজ করবে। শ্রদ্ধাবোধ কাজ করলে ব্যাপারটা নিশ্চয় সে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করবে।

যদিও ছেলেদেরকে বাবা মা বেশিরভাগই এ ব্যাপারে কিছুই বলেন না। বাংলাদেশে ছেলেদেরকে এই ব্যাপারে জানায় এমন পরিবার যদিও থাকে হয়তো খুব কমই দেখা যাবে। তবে এমনটা চোখে পরে নি।

লিখেছেনঃ জিলফিকা বেগম জুঁই