মুক্তধারা

অনার কিলিং | পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে চাঞ্চল্যকর ৯টি হত্যা

অনার কিলিং বা পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে নিজ পরিবারে লোককে যে হত্যা করা হয় তাকে অনার কিলিং বলে এই হত্যার পিছনে বেশির ভাগই থাকে অবৈধ সম্পর্ক অথবা গোত্রের বাইরে বিয়ে করা।

সারা বিশ্বে এই হত্যা নানাভাবে সঙ্গঘঠিত হয়েছে। আমাদের এই ভারতবর্ষেও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রায় ৫০০০ হাজারের অধিক অনার কিলিং হত্যা হয়েছে গোটা ভারত এবং পাকিস্তান জুড়ে। যার অধিকাংশই এখনো অপ্রকাশিত।

৯টি এরকম অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমাদের আজকের প্রতিবেদন-

পাকিস্তানি মডেল কান্দিল বালোচ(২০১৬)

কান্দিল বালোচ-কে হত্যা করেন তাঁর আপন ভাই, এই পাকিস্তানি মডেল কন্যার প্রতি অভিযোগ ছিল যে সে অতিরিক্ত খোলামেলা ভাবে মিডিয়াতে উপস্থাপন করতেন নিজেকে।

মিডিয়াতে আসার পর থেকেই তিনি তাঁর পরিবারের অন্যান্য পুরুষের কাছ থেকে হুমকি পেয়ে আসছিলেন। তাকে অত্যন্ত ঘৃণ্যভাবে এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর ভাবে তাঁর আপন ভাই পিটিয়ে হত্যা করেন। একজন জীবিত মানুষকে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত পিটিয়ে মেরে ফেলা তাও আপন ভাই কর্তৃক এর থেকে নিকৃষ্ট হত্যা আর কিছু নেই।

সামিয়া সারোয়ার, পাকিস্তান (১৯৯৯)

সামিয়া সারোয়ারের জন্ম পাকিস্তানের একটি প্রভাবশালী এবং বিত্তবান পরিবারে। সামিয়া কে ডিভোর্স এর সময় তাঁর উকিলের চেম্বারে হত্যা করেন তাঁর আপন মা।
সামিয়াকে তাঁর চাচাত ভাইয়ের সাথে বিয়ে দেয়া হয় যিনি ছিলেন একজন আর্মি অফিসার। বহুদিন শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হন সামিয়া।

তিনি স্বামীর সংসার থেকে পালিয়ে একজন মহিলার কাছে আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকেই ডিভোর্স কেস ফাইল করেন। ডিভোর্সের দিন সামিয়ার মা উকিলের চেম্বারে প্রবেশ করেন কাগজ-পত্র দেবার কথা বলে, কিন্তু তাঁর সাথে তিনি একজন গুপ্তঘাতক কেও নিয়ে প্রবেশ করেন।

সামিয়াকে সকলের সামনে চেয়ারে বসা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়। সামিয়ার মৃত্যুর পর এই ব্যাপারে কোন কেস হয় নাই। তাঁর পরিবার সকলকে জানায় যে “তারা সামিয়ার হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিয়েছনে”।

গজল খান, ডেনমার্ক(২০০৫)

গজল খানকে তাঁর পরিবারের ৮জন ব্যক্তি এবং আরো ৩জন বন্ধু মিলে হত্যা করেন।

গজল খানকে হত্যা করা হয় কারণ সে ইমাম খান নামের এক ছেলেকে ভালবেসে বিয়ে করেছিল। তাঁর পরিবার এতে নারাজ ছিলেন।

তারা গজল এবং ইমামকে কাছের একটি রেলওয়ে স্টেশনে ডেকে এনে প্রথমে গজলকে গুলি করে এবং ইমাম কে ২ বার গুলি করেন গজলের বড় ভাই আখতার আব্বাস। বর্তমানে এই খান পরিবারে সব্বাইকে হত্যার দায়ে কারাগারে রাখা হয়েছে।

সামিরা নাজির, গ্রেট ব্রিটেন(২০০৫)

সামিরা পাকিস্তানি বংশভূত ব্রিটিশ নাগরিক, যার অপরাধ ছিল সে আগফগানিস্তানের এক ছেলেকে ভালবেসেছিল।

সামিরাকে তাদের পরিবারের সামনে এবং কি যেখানে ২জন শিশু উপস্থিত ছিল তাদের সামনে সামিরাকে তাঁর ভাই এবং চাচাত ভাই ১৮বার ছুড়ি দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলন। এরমধ্যে ৩টা আঘাত কণ্ঠনালী বরাবর করা হয়।

ব্রিটিশ কোর্টে এই মামলাটি সব থেকে হৃদয়বিদারক মামলা বলে আখ্যায়িত করা হয়। সামিরার ভাই এবং তাঁর চাচাত ভাইকে ব্রিটিশ আদালত সাজা দিলেও সামিরার বাবা ও পরিবারের অন্যান্য পাকিস্তানে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।

সাদিয়া শেখ, বেলজিয়াম(২০০৭)

সাদিয়া শেখকে তাঁর পরিবার বেলজিয়ামের এক বাসিন্দার সাথে বিয়ে দিতে আগ্রহী হন, তিনি এই বিয়েতে রাজি না থাকায় তাঁর ভাই তাকে গুলি করে হত্যা করেন।
২০১১ এই হত্যা মামলা বেলজিয়াম আদালতে হোনার কিলিং হিসাবে প্রমানিত হয়।

মনোজ এবং বাবলী বানওয়ালে, ইন্ডিয়া(২০০৭)

মনোজ এবং বাবলি ২০০৫ সালে পরিচিত হন এবং তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে। তাদের গোত্র মিল না থাকায় পরিবারের কেও এই বিয়ে মেনে নেয় নাই।

তারা ২০০৭ সালে বিয়ে করেন তখন বাবলীর পরিবার মনোজের নামে মামলা করেন যে সে বাবলীকে কিডন্যাপ করেছেন।

পরে তারা মনোজে এবং বাবলীর সাথে কথা বলবে বলে তাদের কে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে প্রচণ্ড মারধর করেন। মনোজকে বাবলীর চাচা এবং তাঁর ছেলে গলায় দুপাশে দড়ি টেনে হত্যা করেন এবং বাবলীকে তাঁর আপন বড় ভাই ফসলের কীটনাশক খাইয়ে মেরে ফেলেন।

পিলা আরতোসী, ইরান-কুর্দিস্থান(২০০৮)

পিলা আরতোসী হত্যাকাণ্ড ছিল প্রায় বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের একটি। অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন থেকে আরতোসী পরিবার কুর্দিস্থানে আসেন পিলা কে হত্যা করতে।
পিলার অপরাধ ছিল সে তাঁর পরিবারের পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করতে চান নাই।

পিলার পরিবারের বিপক্ষে গিয়ে তাঁর আপন বোন ব্রেনি, পিলাকে বাচাতে চান কিন্তু তিনি সক্ষম হতে পারেন নাই বরং নিজের জীবন বাচাতে এখনো তিনি পালিয়ে আছেন।

আহমেত ইলদিজ, তুর্কি(২০০৮)

আহমেত ইলদিজ ছিলেন LGBT গ্রুপের সদস্য, গে- সম্প্রদায় হবার কারণে তাঁর আপন বাবা এবং দুই চাচা মিলে তাকে হত্যা করেন।
আহমেত’ই প্রথম যে গে-হবার কারণে সবার সামনে হত্যার স্বীকার হন।

ফারজানা পারভিন, পাকিস্তান(২০১৪)

ফারজানা পারভিন কে গর্ভবতী অবস্থায় পাথর মেরে সবার সামনে তাঁর পরিবার হত্যা করেন। তাঁর অপরাধ ছিল পরিবারের অমতে ভালবেসে বিয়ে করা।

তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বাবা প্রকাশে বলেন- “আমি আমার মেয়ের মৃত্যুর জন্য অনুতপ্ত নই সে আমাদের মতের বিরুদ্ধে বিয়ে করে আমাদের সম্মানহানি করেছে তার জন্য আমি অনুতপ্ত”।

সাবা কায়সার, পাকিস্তান(২০১৪)

সাবা কায়সারকে হত্যার চেষ্টা করেন তাঁর জন্মদাতা বাবা, সাবা’র অপরাধ ছিল ভালবাসা।

সাবাকে তাঁর মাথায় ২বার গুলি করে মৃতপ্রায় অবস্থায় নদীর পাশে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। সাবাকে সেখান থেকে পাকিস্তানের এক হাসপাতালে নিয়ে এলে তাকে জীবিত দেখে ডাক্তাররা তাঁর প্রানরক্ষা করেন।

সাবা কায়সারকে নিয়ে একটা মুভি বানানো হয়েছে। মুভিটি বানায় শারমিন চিন্ময়, সাবার সাথে চিন্ময় এর হাসপাতালে পরিচয় হয়। মুভিটির নাম A girl in the River – মুভিটি ২০১৪ তে একাডেমিক এওয়ার্ডে নমিনেশন পায়।

সাবার বাবাকে জেলখানায় প্রশ্ন করার সময় সে বলেনঃ “আমার মেয়ের মরে যাওয়া উচিত, সে আমার পরিবারের কলঙ্ক, এক গ্যালন দুধের মধ্যে এক ফোঁটা পেশাব দিলে সেই দুধ নষ্ট হয়ে যায়, সাবা ঠিক সেভাবে আমাদের পরিবারের সম্মানকে নষ্ট করেছে”।

হোনার কিলিং নিয়ে সবখানেই কিছু আইনের গাফলতি পাওয়া যায়, হোনার কিলিং এর শিকার সব থেকে বেশী মেয়েরাই হয়েছে এখন পর্যন্ত। এইটা যেন কোন ব্যাপার না একটা মেয়ের জীবনকে পরিবারের সম্মানের অজুহাতে হত্যা করা।

লিখেছেনঃ আনিকা সাবা