মুক্তধারা

কন্যাসন্তান | সৌভাগ্য না সর্বনাশ

সকাল সকাল খবরটা পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল…কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ায় কুপিয়ে বধূ নির্যাতন।

আমরা দুই বোন, ছোটবেলা থেকে মেয়েমানুষের বদলে মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠলেও কিছু অতি-উৎসাহি বারবার মনে করিয়ে দিতেন যে আমার মা বাবা কতটা হতভাগ্য। ভেবেছিলাম ওরা পুরানো মানুষ, এসব পুরানো চিন্তাধারা ওরা আঁকড়ে আছে। দিন বদলে গেছে। মেয়েরা এখন অনেক স্বাবলম্বি, কারো বোঝা নয়। কিন্তু এখন বুঝি আমরা বই পড়েছি ঠিকই,আত্মস্থ করতে পারিনি, আধুনিকতার লেবাস পড়েছি ঠিকই বস্তাপঁচা নোংরামির গন্ধ এখনো প্রবল দাপটে রাজত্ব করছে আমাদের মাঝে।

বেশকিছু তথাকথিত শিক্ষিত পরিবারকে দেখেছি, মেয়ে হবে শুনতে পেয়ে সে কি আর্তনাদ!

*গর্ভবতীর সামনে শাশুরিমায়ের আহাজারি- ” কোন পাপে আল্লাহ এ শাস্তি দিল, কোন পাপে তার ছেলের বউ মেয়েসন্তান জন্ম দেবে”।

*হবু বাবার সন্তান জন্মের আগে থেকেই দম্ভোক্তি-“এবার মেয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে, বারবার সন্তান জন্ম দিতে হবে যতদিন না ছেলে সন্তান আসছে ঘরে”

* মেয়ে জন্মের পরে তো আরো নাটক। মেয়ের নাক ছোট, পাঁচলক্ষ তো শুধু নাকের জন্যই বিয়ের সময় বেশি দিতে হবে, মেয়ে দেখতে কালো, কে বিয়ে করবে এই মেয়ে.. আরো নানা জল্পনা কল্পনা

* মেয়ে জন্মদেবার গঞ্জনা শুনতে শুনতে এক নব্য মা তার স্বামীকে বলেই বসল” সাধারন বিজ্ঞান পড়নি ক্লাস নাইনে, ছেলে মেয়ে জন্মের জন্য কোন মানুষ যদি দায়ি হয় সেতো বাবা, x/y ক্রোমোজম তো সে ই দেয়”। শিক্ষিত স্বামী প্রবরটির জবাব-“আরে ওসব সরকারের জোচ্চুরি, মেয়ে হলে যেন বউ না পেটায়, তাই একটা বানোয়াট কথা শেখাচ্ছে”

এই আমাদের সমাজের চিত্র। এই সমাজে বাস করে বড়বড় বুলি কপচাই আমরা। নারী অধিকারের কথা বলি। অথচ এ সম্পর্কে বহুআগেই সৃষ্টিকর্তা সতর্ক করেছেন মানুষকে।

আল্লাহ বলেন-অর্থাৎ ‘নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব আল্লাহ তা’আলারই। তিনি যা ইচ্ছা, সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা-সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাশীল। (সুরা আশ-শুরা : আয়াত ৪৯-৫০)

‘আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে, সে দুঃখে সে কওমের থেকে আত্মগোপন করে। আপমান সত্ত্বেও কি একে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে? জেনে রেখ, তারা যা ফয়সালা করে, তা কতই না মন্দ!’ {সূরা আন-নাহল : ৫৮-৫৯}

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যাকে কন্যা সন্তান দিয়ে কোনো কিছুর মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়; আর ওই ব্যক্তি তাদের (কন্যা সন্তানের) প্রতি যথাযথ আচরণ করে, তবে তা তার জন্য (জাহান্নামের) আগুন থেকে রক্ষাকারী হবে।’ (মুসলিম, মুসনাদে আহমদ)

আপনারা হজ্ব জাকাত পালন করে বড় বড় সাধু হচ্ছেন, ধর্মের গান গাচ্ছেন, আর একই গলায় তাঁর সৃষ্টিকেই হেয় করছেন। মেয়ে হয়ে আরেকটি মেয়ের সহায় না হয়ে তার জীবন অতিষ্ট করার জন্য আদা জল খেয়ে নামছেন। বাবা হয়ে নিজের সন্তানকে অবমূল্যায়ন করার সময় ভাবছেন ও না যে ও আপনারই অংশ। তারপরও আপনারা নিজেদের মানুষ দাবি করেন, সৃষ্টির সেরা জীব হবার দাবী নিয়ে বুক ফুলিয়ে হাঁটেন। আপনার চে তো গুয়ের পোকাটাও উন্নত।

মনে রাখবেন, আজ যে অবিবেচক হয়ে কন্যা সন্তান দেখে রাগান্বিত হচ্ছেন, কন্যার মাকে যাচ্ছে তাই বলছেন, কাল হয়তো এর জন্যই আফসোস করবেন। আমরা ভুলে যাই ফাঁকাদৃষ্টিতে অনেক কিছু মন্দ মনে হলেও অনেক সময় তা মঙ্গল বয়ে আনে। এ দিকে ইঙ্গিত করেই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,‘আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন।’ {সূরা আন-নিসা, আয়াত : ১৯)

লিখেছেনঃ আমরীন খাইরুল