মুক্তধারা

একই ভুক্তভোগী বাসিন্দারা | ডিভোর্স

রিনা ভাবির (ছদ্মনাম) স্বামী বিদেশ থাকে। বিয়ের পরেই স্বামী বিদেশ চলে গেছে।তাই ভাবি সুযোগে পড়ালেখাটা ভালভাবে শেষ করবে ভেবে রেখেছে। তাই মন দিয়ে পড়ালেখাও করছে। কিন্তু অনেকেই ভেবে বসেছে রিনা ভাবির স্বামীতো বিদেশে তাই একটু সুযোগ নেওয়া যায় কিনা। দেখি যদি একটু চান্স মেরে পরকীয়া করা যায় কিনা। তারা ধরেই নেয় অনেক মেয়েই তো আছে স্বামীর অবর্তমানে পরকীয়ায় জড়িয়ে পরে।

তেমন মেয়ে রিনা ভাবিও তো হতে পারে।এই ভেবে রিনা ভাবির পিছে শুরু হল নানান টিটকারির পালা।কলেজে বাড়িতে কেউ না কেউ চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে রিনা ভাবিকে পটাতে যদি পরকীয়া করা যায়। কিন্তু রিনা ভাবি যে অমন টাইপ মেয়ে না কে বোঝে কার কথা।দুষ্ট লোকেরা পরকীয়া করার জন্য নানা ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। এদিকে রিনা ভাবিও বেশ অস্বস্তি নিয়ে এসব ঝামেলা এড়িয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আর দুষ্ট লোকেরা ব্যর্থ হয়ে নানান কূটনীতি চালাতে থাকে।

এমন টাইপ ঘটনাগুলোতে অনেক সময় অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটে যায়। শুরু হয় আলোচনা সমালোচনা নানান ঘটনার দোষারোপ।
কেউ যদি ভেবেই নেয় মেয়েটি তার স্বামীর অবর্তমানে পরকীয়া করবেই করবেই। এখানে তাহলে দোষটা কার?
স্বামীর অবর্তমান?
মেয়েটির মমতাময়ী মনে একাকিত্বের দিন পার?
নাকি আমরা এসব দেখতেই অভ্যস্ত?
সমস্যা থাকলেও তার সমাধান আছে কিন্তু সুস্থ মন নিয়ে সচেতন মন নিয়ে চলি কতজন?

পরীর মত মেয়ে আমার। পড়ালেখা করে মানুষের মত মানুষ হবে। তারপর এক রাজপুত্রের সাথে বিয়ে দেব। সুন্দরী কন্যাকে নিয়ে বাবা মা র কতরকম স্বপ্ন।
কিন্তু সমস্যা বাঁধলো পরে যখন মেয়ে বড় হল।বড় হয়ে আরো রূপসী হলো।বোরকা দিয়েও তার রূপ ঢাকা সম্ভব হলো না। তারপরও কোন না কোনভাবেই কেউ কেউ বুঝতে পারে মেয়েটি সুন্দরী। নাহ্ স্কুলে সে শান্তিমত যেতে পারে না।কেউ না কেউ তার পিছু নেয়। টিটকারি ছোড়ে।বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। শেষমেশ এমন অস্থির অবস্থা যে মেয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি।

কি আর পড়ালেখা করাবে তার তো কোন সুস্থ উপায় দেখছে না। কোথায় যাবে বা কিভাবে আইনের সাহায্য নিবে। এতেই বা কতটুকু স্বস্তি পাবে। আইনের সাহায্য কেউ নিতে পারে কেউ পারে না। এসব ঝামেলায় জড়িয়ে মেয়ের সন্মানটুকু আবার শেষ হয়ে যায় বুঝি।

নাহ্ তার চেয়ে বরং বিয়ে দিয়ে দেই। বাবা মা এই ভেবে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করে।মেয়ে পড়ালেখা করতে চায় আত্মনির্ভরশীল হতে চায়। তারপরও তার বাবা মা জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়। শেষে ঝরে যায় একটি স্বপ্ন। অনেকেই শ্বশুর বাড়িতে পড়ালেখা করতে পারে। কিন্তু সবাই পারে না। অনিশ্চিত একটি জীবনে মেয়েটি পাড়ি দেয়।

এতগুলো সমস্যায় দোষটা কার?
মেয়ে সুন্দরী?
বাবা মা র ভীতি?
নাকি আইনের সুযোগ সুবিধায় আস্থাহীন?
নাকি আমাদের প্রত্যকের অসুস্থ মন?

এক বধূ স্বপ্ন নিয়ে গেছে তার স্বামীর বাড়িতে সংসার করতে।শ্বশুর বাড়ির লোকজন নিয়ে বেশ সুখেই শুরু হয় তার সংসার। কিন্তু এক কথা দু কথায় নতুন বউ এর কানে আসে যৌতুকের ব্যাপারে। বধূ খেয়াল করে দেখলো একেকজনের মনে যৌতুক নিয়ে একেক রকম আশা। কিন্তু মেয়ের বাবা তো যৌতুক দিতে একেবারেই অক্ষম। তাই কিছুদিনের মধ্যে সেই বধূর জীবনে নেমে আসে নানান রকম নির্যাতন। কখনো শারীরিক কখনো মানসিক।

যেমনটা সে টিভিতে পেপারে দেখেছে বা লোকমুখে শুনেছে আজ দেখছে সেই গল্পের কাছাকাছি তার নির্যাতনের ধরন। নির্যাতন এতটা খারাপ পর্যায়ে চলে গেল শেষে জীবনটা নিয়ে চলে এসেছে ডিভোর্স দিয়ে। ছেলেপক্ষতো ডিভোর্স পেয়ে মহাখুশি। ডিভোর্স পাওয়ার পরপরই ছেলের পরিবার ছেলেকে আরেক জায়গায় বিয়ে দিল। এতটুকুই সে জানে আর কিছু জানতে চায়নি সে জানতে চায়ও না।

শুধু একটু সুস্থভাবে বাঁচার আশায় নিজেকে ব্যস্ত রাখা আর জীবনের প্রয়োজনে জব এর চেষ্টা করতে থাকা। পরিচিতদের কেউ কেউ জব দিতে চেয়ে সাথে একটা প্রস্তাব জুড়ে দেয় তাই সে বিপদবুঝে কোনভাবেই জব করার সুযোগ পায় না। হঠাৎ বধূ থেকে ডিভোর্সী হয়ে তার জন্য একটা জব করা বা জব খুঁজে পাওয়া কোনটাই সম্ভব হয় না। কারন তাকে তো শুধুই বধূ ভাবেই তৈরি করা হয়েছিল।কিন্তু আজ জীবনের প্রয়োজনে জীবনের বাস্তবতায় তার সত্যিই একটা জব দরকার।নিরাপদ একটা জব দরকার।ছোট্ট হলেও জব করতে হবে তাকে।

সে কি করবে কিভাবে জব খুঁজবে কোনটাই বুঝে উঠতে পারে না। সমস্যা হচ্ছে পরিচিতরাই তাকে ডিভোর্সী হওয়ায় বাজে প্রস্তাব দিচ্ছে। যাদের ক্ষমতা আছে জব এর ব্যবস্থা করার তারা যদি এমন করে তাহলে সে কিভাবে জব খুঁজবে বা কাকে বিশ্বাস করবে। সে তো ভালভাবে পড়ালেখাও শেষ করেনি। তেমন অভিজ্ঞতাও নেই। সব মিলে সে এককথায় এলোমেলো। বাঁচার জন্য কিছুতো তাকে করতেই হবে। কে তাকে সাহায্য করবে? মনে মনে আাশা করে ভাল মানুষ তো অবশ্যই আছে এই দুনিয়ায়।সে আশা নিয়েই সামনে চলতে থাকে।এ অবস্থান কোথায় গিয়ে দাড়াবে সে জানে না। কিন্তু সে সামনের দিকেই তাকিয়ে থাকে পিছনে আর ফিরে চায় না।

এখানে কি একটি মেয়েকে শুধুই বধূ ভাবা দোষ?
ভালভাবে পড়ালেখা শেষ না করা দোষ?
যৌতুকের নীরব অত্যাচার দোষ?
পরিচিতদের কি বাজে চিন্তা দোষ?
যারা জব ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন তাদের বাজে প্রস্তাব দোষ?
নিজেকে শক্ত হাতে সামনে এগিয়ে যেতে হবে এটা ঠিক কথা। কিন্তু এখানে মেয়েটির সাপোর্ট আসলে কারা হোন?

কেউ না কেউ তো অবশ্যই এইসব বিপদগ্রস্ত মানুষদের মানে ডিভোর্সীদের কষ্ট বুঝি বা বিপদে পাশে দাড়াই।কিন্তু ডিভোর্সীর সংখ্যা দেশে যেভাবে বাড়ছে তাতে আমরা প্রত্যকেই কতজন ডিভোর্সীকে সাপোর্ট দিয়েছি বা দিচ্ছি।

ডিভোর্স ডিভোর্স ডিভোর্স চারদিকে শব্দটা যতটা সহজে ছড়িয়ে পরছে ততটাই যেন অবিশ্বাসের রাজ্য হয়ে যাচ্ছে। হয়তো তার জন্যও এত বিশৃঙ্খলার ছড়াছড়ি।
প্রবাসী স্বামীর স্ত্রী, সুন্দরী মেয়ে, ডিভোর্সী এরা সবাই অনেকটায় কাছাকাছি সমস্যায়। সমস্যা অবিকল এক না হলেও সমস্যাগুলো অনেকটাই কাছাকাছি।

সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার প্রত্যেকের আছে।আমরা কি পারি না আমাদের মনমানসিকতা বদলাতে। নাকি আমরা এই হতাশার গল্পগুলো সারাজীবন পড়ে পড়েই অভ্যস্থ হয়ে যাবো।যখন আপনার বা আমার বা আমাদের সাথে এসব ঘটবে তখন কি এসব পড়তে ভাল লাগবে? নিশ্চয় ভাল লাগবে না।

লিখেছেনঃ জিলফিকা বেগম জুঁই