'ও ডাক্তার'

প্রশ্নবিদ্ধ একটি আমি

আমার যখন জন্ম হয় তখন মাঘ মাসের হাড় কাপানো শীত।নানু তাঁর গায়ের লাল রঙা উলের শাল দিয়ে আমাকে পেচিয়ে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন মুখ মলিন করে।

বড়আপু তখন ক্লাস এইটে পড়েন। আপুর পর আমার দুই ভাই। তাই আপুর খুশির সীমা নেই! এবার একটা পুতুল পেয়েছে সে,যাকে ইচ্ছে মত সাজানো যাবে।
কিন্তু আম্মা আব্বার অন্ধকার মুখ দেখে আপু কিছুই মেলাতে পারে না।

আমাকে বাসায় নেয়ার পর আম্মার আদেশ ছিল আমাকে যেন কারো কোলে দেয়া না হয় at least আমার পা যেনো ঢেকে রাখা হয়।কয়েকদিন পর আপু আবিষ্কার করল আমার ছোট্ট তুলতুলে দুটো পায়ের একটি দেখতে স্বাভাবিক নয়। সহজ বাংলায় মুগুর পা (club foot)!

আমার পিঠাপিঠি ভাইয়ের বয়স তখন একবছর মাত্র। এমনিতেই এই ব্যাপার নিয়ে আম্মাকে কথা শুনতে হয়েছিল তার উপর আমি কিনা বিশাল এক ত্রুটি নিয়ে জন্মেছি। আম্মার মানসিক অবস্থার কথা আমি অনুমান ও করতে পারিনা। এর পর শুরু হল আমার আব্বা আম্মার যুদ্ধ।

আড়াই মাস বয়সে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতাল, ছয় মাসের সময় সিএমএইচ অস্ত্রোপচার হলো। এরপর চন্দ্র গোহন সূর্য গোহন, ওঝা, বৈদ্য, এলোপ্যাথ, হোমীও প্যাথ কোনোটাই বাদ যায়নি! সবার একটাই কথা “আহা অনেকের ই তো ভালো হয়ে গেছে! আপনার মেয়েরটা হয়না??!! ”

আম্মা সাথে থাকলে নিজেকে অসহায় লাগত না কিন্তু একা অবস্থায় এসব প্রশ্নবানে জর্জরিত হওয়া ছিল ভিষণ কষ্টের।

তোমার পা এমন কেনো?
তোমার পা কি পুড়ে গেছে?
ঐভাবে হাঁট কেনো?
ঐ জুতা পরো কেনো??
খোড়াও কেনো?
দৌড়াতে পারোনা কেনো??
হাজারটা কেনো!

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর এ ইলিজারভ apparatus লাগানো হল পায়ে। টিবিয়া ফিবুলা কেটে দুই টুকরা করা হল। এবার lengthening plus correction of foot defect এর আধুনিক চিকিৎসার ভেতর দিয়ে গেলাম। সেই যন্ত্রনাদায়ক দিন গুলোর কথা মনে করতে চাইনা আর।
আল্লাহ আমাকে মুক্তি দিয়েছেন!

হুম আল্লাহ আমাকে মুক্তি দিয়েছেন লোকের বিব্রতকর চাহুনী আর জিজ্ঞাসা থেকে। ভালোভাবেই দিয়েছেন। তবে সত্যি কথা হলো ছোট বেলায় পা নিয়ে অনেক আফসোস হত, যেটা বড় হয়ে মাথাতেই আর আসতোনা। কারন ততদিনে আল্লাহ যা দিয়েছেন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে শিখেছি, কাউকে যে তার বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিচার করতে হয়না সেটাও শিখেছি,নিজেকে আরো অনেক ভাবে বিশেষ করে তোলা যায় সেই রাস্তা গুলো চিনেছিলাম।

জীবন সত্যিই খুব বিচিত্র!দিন শেষে আমি একজন সুখী মানুষ (আলহামদুলিল্লাহ)। এর চেয়ে বেশি আর কি হতে পারে আমার জন্য!

লিখেছেনঃ ডাঃ সাবিহা পারভীন
(শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ, ৪১তম ব্যাচ)