মুক্তধারা

পরিচয় যখন ব্রোকেন ফ্যামিলি

নিম্মি নানীর কাছে কবে থেকে থাকে সেটা তার জানা নাই,নানী তার আদর আবদারের জায়গা। ছোট বেলায় বাবা মাঝে মাঝে ঘুরতে নিয়ে যেতো কিছু চাওয়ার আগেই কিনে দিতো কত কিছু, তারপর দাদু বাড়ি নিয়ে যেতো বেড়াতে। দাদুবাড়ির সবাই কাড়াকাড়ি করতো নিম্মিকে নেওয়ার জন্য। নিম্নির কি যে ভালো লাগতো। অপেক্ষায় থাকতো আবার কবে বাবা আসার দিন আসবে।

মা তো আসতোই না,মার মুখ ছোট্ট নিম্মি ঠিক মতো মনে করতেই পারে না। কোন একদিন মা আসতো একটু সময়ের জন্য এসে নিম্মিকে কাছে নিয়ে আদর করেই বলতো ” নিম্মি সোনা যাও খেলা করো”। নিম্মির খুব ইচ্ছা করতো মায়ের গা ঘেষে লেগে থাকতে। মায়ের ওড়নার সাথে নিজেকে পেঁচিয়ে খেলতে,ঠিক যেমন লুবনা আপু মামীর সাথে সব সময় লেগে থাকে। কিন্তু নিম্মি তা পারতো না। মা’র নাকি ভীষন তাড়া।

নিম্মি বেরিয়ে গেলে নিম্মির মার আর নানী চুপি চুপি কি কি কথা বলতো তারপর কোন এক ফাঁকে নিম্মিকে না জানিয়েই মা বেরিয়ে পরতো,কারন সে চায় না নিম্মি তার সাথে যাবার বায়না করুক। নানী বলতো নিম্মির মা নাকি অফিস থেকে একটু ছুটি নিয়ে এসেছিলো এই বাড়িতে কি এক কাজে, তাছাড়া তো তার আসবার উপায় নাই। নিম্মি ভেবে পায়না কেনো উপায় থাকবো না,বাবা যেমন আসে তেমন করে মা ও আসবে। ছোট্ট মন ভাবে হয়তবা মা’র অফিসে রাগী কেউ আছে যে হয়ত বকা দিবে এলে। আরো

একটু বড় হলো যখন, দেখতো তরী ওর বাবা মা দুজনের সাথেই ঘুরতো,স্কুলের বন্ধুরা বাবা মা কে নিয়ে কত কত গল্প করতো কিন্তু নিম্মির তো এরকম কোন গল্প নাই। ওর তো মনে পরেনা মায়ের সাথে কখনও ঘুমিয়েছে কি না।

নানী বলতো মা বাব ওকে খুব আদর করতো, কই নিম্মি তো সেটা দেখেনি। ফিস ফিস করে অনেককে বলতে শুনেছে “নিম্মির বাবা মা’র তো ছাড়াছাড়ি হয়েছে”। নিম্মি ছাড়াছাড়ি বোঝেনা তবে অনুমান করে এমন কিছু হয়েছে যেটার কারনে বাবা-মা রাগ করে এক সাথে ওর কাছে আসো না,যেমন মামী যখন কোন কিছু ছেড়ে কোথাও যায় তখন মামা যেমন রাগ করে তেমন কিছু।

আরো একটু বড় হলে নিম্মি বুঝলো বাবা মা এখন আর ওর একার না। বাবা এখন আরও দুই জনের মাঝে ভাগ হয়েছে,আর মা সে তো আগেই অন্য কারো মা হয়েছে তারপর নিম্মির আর একটা বোনের সাথে নিজেকে ভাগ করেছে। সেই নতুন বোনের বাবা নিম্মির মাকে নিম্মির কাছে আসতে দিবেনা আর নিম্মিকে সাথে রাখা যাবে না এই পাকা কথা বলেই নিয়ে গেছে।

নিম্মির বাবা- মা তারা যে যার মতো নতুন সংসার পেতেছে আর নিম্মি শুধু এখনও পুরাতন সম্পর্কের সাথেই আছেই যেখানে তার কোন অস্তিত্ব নাই। সবাই বলে সে নাকি ব্রকেন ফ্যমিলির। নিম্মি বড় হয়েছে, সবাই এগিয়ে এসেও এখন পিছিয়ে যায়,কারন তারা ভাবে আত্মীয় স্বজনের কাছে ব্রকেন ফ্যমিলির মেয়ে পরিচয় দিতে খারাপ লাগবে।

নিম্মি সুন্দর মনের একজন মানুষকে পেয়েছে জীবন সঙ্গী হিসেবে। তারপরেও কোথাও কোন ভুল হলে আড়াল থেকে ঠিকই শুনেছে বলতে “শিখবে কি করে শিখানোর কেউ থাকলে তো শিখবে”? একটু নিজের মতামত জোর দিয়ে জানাতে গেলে শুনতে হয় তুমি তো আমাদের মতামত নিবে না কারন তুমি কম্প্রোমাইজ করতে কখনই শিখোনি।

নিম্মির বাবা মা বলেছিলো “নো কম্প্রোমাইজ ” আসলেই তাই আমারা আধুনিক সমাজের শিক্ষিত মানুষ আমরা কেনো কম্প্রোমাইজ করবো। কেনো একা স্যক্রিফাইজ করবো? নিম্মির বাবা মাও করেনি। তারা নতুন করে সব শুরু করেছে কিন্তু নিম্মি? সে তো কম্প্রোমাইজ করেছে আর করে যাচ্ছে।

বাবা-মা কে মাঝে মাঝে দেখতে পাওয়া, নানীর কাছে থাকা,ইচ্ছে হলেও মা ছুঁয়ে দেখতে না পাওয়া,বাবা-মা নিজেদের সুখে খুঁজে চলে যাওয়ায় নিম্মিকে শশুড় বাড়িতেও কথা শোনা এসব তাহলে কি?

বাবা- মার না করা কম্প্রোমাইজ আজ নিম্মিকে করতে হচ্ছে। আমরা Sacrifice বা Compromise না করলেও নিম্মির মতো আমাদের সন্তানদের সারাজীবন করতে হয়।কিন্তু এটা কি ভেবে দেখার বিষয় না? আধুনিকতা আর স্বাধীনতার কারনে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত ঠিকানা কোথায় বা তাদের মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে আমরা যদি ভাবতাম তাহলে হয়তবা একটু কম্প্রোমাইজ করতাম যেনো আমাদের সন্তানরা ভালো থাকে, যেনো তাদের কম্প্রোমাইজ করতে না হয়,শুনতে না হয় সে তো এসেছে Broken Family থেকে।

লিখেছেনঃ সাজিয়া আফরিন