মুক্তধারা

নারী মনে নিয়ে মানিয়ে নাও

আমার এক বন্ধু আমার এক স্ট্যাটাস এর কমেন্ট করেছিলো শুধু সমস্যা সামনে আনলে হবে সমাধান কিভাবে হবে তাও সামনে আনা দরকার। সত্যি তাই আমরা সমস্যাকে চিহ্নিত করি কিন্তু সমাধান নিয়ে খুব কম মাথা ঘামাই ।তাই কিছু লিখার চেষ্টা।

কিছুদিন আগে বন্ধুদের সাথে আলোচনা হচ্ছিলো ‘মেনে নেওয়া’ এবং ‘মানিয়ে নেয়া’ নিয়ে। আমার মনে হয় নারীদের সবসময় সব বিষয়ের সাথে মানিয়ে নিতে হয়। জন্ম হবার পর থেকে মা-চাচী,খালা, নানী-দাদী সবার কাছ থেকে শুনে আসছি মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছো তোমাকে সব কিছু মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

আমাদের সমাজ নারীর জন্য কিছু ‘নিয়ম’তৈরি করে রেখেছে। নারী হয়ে জন্মালে তাকে রান্না করা শিখতে হবে। তুমি নারী তাই তোমাকে কম কথা বলতে হবে,উচ্চস্বরে কথা বলা যাবেনা। তুমি নারী তাই তোমাকে স্বামী,বাবা,ভাই বা যেকোন পুরুষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতে হবে। তুমি নারী তাই তোমাকে সব জায়গায় সব কথার প্রতিউত্তর করা যাবেনা। তুমি নারী তাই তোমাকে সবকিছুর সাথে মানিয়ে চলার অভ্যাস করতে হবে।সমাজের সবকিছুর সাথে মানিয়ে চলা যেন শুধুমাত্র নারীর দায়। নারী যেন সমাজের একমাত্র জীব। সবাই যাচ্ছেতাই করবে,আর নারী তা মানিয়ে নিয়ে চলবে। এটিই নারীর একমাত্র কাজ।

কিছুদিন হলো আমার রুমমেট এর ভাগনি (৮-৯ বছর)বেড়াতে এসেছে গ্রাম থেকে। সকালে আমি এখনো ঘুম থেকে উঠিনি। আধো আধো ঘুমে চোখ বুজেই শুনছিলাম সে তার ভাগনিকে বলছে, “মামনি ঘুম থেকে উঠে বিছানা গুছিয়ে রাখতে হয়। তুমি মেয়ে মানুষ এসব কাজ শিখতে হবেনা।”
নিজের কাজ নিজে করা ভালো। এবিষয়ে সকল সন্তানদের শিক্ষা দেয়া প্রয়োজনীয়। কেবল নারীকে একা নয়। তা হওয়া উচিৎ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য। এখানে ভাববার বিষয় হলো আমার রুমমেট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী একজন নারী। কিন্তু তার সচেতনতার লেভেল কোথায়?জেন্ডার সমতার বিষয়ে তার জ্ঞান আদৌ কতটুকু?

আমার গবেষণা অভিজ্ঞতা বলে পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধে নারীদের কৌশলী হতে হবে। তাদের শিখতে হবে”মনে নিয়ে তারপর মানিয়ে নেয়া”। হতে পারে এরকম যে আমার পরিবারের এমন কোন ইস্যু যা আমার ভালোলাগছেনা। আমি আমার স্বামী, শ্বাশুড়ি বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বুঝাইলাম কোন কাজ হলো না। সেক্ষেত্রে নারীদের কৌশলী হতে হবে,ধীর বুদ্ধিসম্পন্ন হতে হবে। বিষয়টি সাময়িক মানিয়ে নিলেও তাকে মনে ধরে রাখতে হবে। একসময় সুযোগ তৈরি করে তার জন্য কথা বলতে হবে,পরিবারকে মটিভেট করতে হবে।আমার কাছে মনে হয় নারী ধীরে ধীরে তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী সমাজের প্রচলিত নিয়মকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে,এমনকি একসময় তা তার চিরাচরিত অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় যা নারী নিজেও বুঝে উঠতে পারেনা।

কিন্তু আমি বলবো নারীকে এগুলো “মনে নিয়ে তারপর মানিয়ে নিতে হবে।” এগুলোকে ভুলে যাওয়া যাবেনা।মনের মধ্যে রেখে ধীরেধীরে কৌশলে আদায় করে নিতে হবে সবকিছু। কিন্তু মানিয়ে নিয়ে একথা বলা যাবেনা যে “নারী হয়ে জন্মেছি কি আর করবো মেনে ত নিতেই হবে।
“আমার এক কলিগ আপা আছেন তিনি বলতেন, শ্বশুর বাড়িতে কোন ঝামেলার আভাস থাকলে আমি আশেপাশেই যাইনা কথা বললেই ঝামেলা। আমার মনে হয় প্রতিটি নারীর তার শ্বশুর বাড়িতে প্রথম দিন থেকেই সুভত বালিকা বা ভালো বউ সাজার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এর বিপরীতে নারী একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে রিপ্রেজেন্ট করতে হবে। তার যে অধিকার আছে সে অনুযায়ী সে অনেক কিছুই পায় তা বুঝিয়ে দিতে হবে পরিবারের সবাইকে খুব সুকৌশলে। এর জন্য নারীর জন্য যে বিষয়টি জরুরী তা হলো নারীকে নিজেকে ভালোবাসতে হবে। তাইলেই সম্ভব সবকিছু করা।নারীর প্রয়োজন নিজের প্রতি আত্নবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা।

তাকে ভাবতে হবে আমি সব পারি। সমাজের কিছু প্রচলিত ধারার মাঝে নিজেকে আবদ্ধ রাখা যাবেনা। ধীরে ধীরে হেজেমনিক প্রক্রিয়ায় এসব ভাঙতে হবে। পুরুষশাসিত সমাজ এর এজেন্ট পুরুষ যেমন দীর্ঘদিন ধরে খুব সুকৌশলে নারীদের নির্যাতন করছে,অবদমিত করছে। নারীদেরও এমন কৌশলী হতে হবে। ধরেন,একজনের স্বামী পরকিয়া করে কিন্তু তার জন্য স্বামীর সাথে ঝগড়া করে কোন সমাধান করা সম্ভব না বরং হিতে বিপরীত হতে পারে।আপনি নারী হিসেবে পারেন খুব কৌশলী হয়ে এটাকে আটকাতে। আর যদি সম্ভব না হয় তাহলে এরকম পুরুষ থেকে দূরে থাকুন।

কখনোই কোন নারীর উচিত নয় নিজের চাইতে পরিবারের সদস্যদের বেশি ভালোবাসা। আর ভালোবাসলেও তার প্রকাশভঙ্গী কম করুন।নিজেকে ভালোবাসুন আর হেজেমনিক প্রক্রিয়ায় নিজের অধিকার আদায় করুন।
আমার এক বড় আপা বলছিলেন,”আমার স্বামী বলছিলো ভালো লাগেনা আমি বারে যেতে চাই। আপার প্রতিউত্তর ছিলো, হ্যা, যাও কোন সমস্যা নাই। কিন্তু আমি ও যাবো তবে আমার ফ্রেন্ডদের সাথে তুমি কিছু বলতে পারবা না।”এভাবে প্রতিউত্তর করুন।খুব যুক্তিযুক্ত প্রতিউত্তর দিন। দেখবেন সে আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যাবে। অবশ্য এর জন্য দরকার নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি করা। নারী সচেতনতা বাড়ানো।

প্রত্যেক নারীর উচিত বিয়ের পর প্রথমেই নিজের পরিবারে তার নিজের ইমেজ তৈরি করা,সে একজন মানুষ আর মানুষ হিসেবে তার কিছু অধিকার আছে যা সে চাইতে পারে,আর পেতেও পারে। কিছু বিষয় থাকে যা সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে হয়। পরিবারের এমন কিছু বিষয় থাকে যার মাঝে নিজেকে না জড়ালেও চলে,তেমন সমস্যা হয়না। এগুলো থেকে দূরে থাকায় ভালো।

আমার বিভিন্ন গবেষণা অভিজ্ঞতা,নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমার কাছে মনে হয় বিয়ে একটি এজেন্সি। আর এর মাধ্যমেই পরিবারের সৃষ্টি। ব্যতিক্রম যে নাই তা নয়। তবে তা নিয়ে আর আলোচনা করলাম না। যেহেতু এটি একটি এজেন্সি তাই কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। আর এই ক্ষেত্রে নারীকে যেমন চতুর তেমনি সুকৌশলী হতে হবে। নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকতে হবে। নিজের ইমেজ নিজেকেই তৈরি করে নিতে হবে। বলপ্রয়োগ নয় হেজেমনিক প্রক্রিয়ায় অধিকার আদায় করতে হবে। এভাবে চলতে চলতে একসময় তা সামাজিক প্রথা হয়ে যাবে।যদিও তা সময়স্বাপেক্ষ।কিন্তু অসম্ভব কিছু নয় বটেই। একইভাবে বাংলাদেশে ধর্ষনের হার আজ মাত্রাধিক পরিমানে বেড়ে গেছে।

আমি মনেকরি এসব সমাধানেও নারীদের নিজেদের সুকৌশলী,চতুর হতে হবে।নিজেরাই যেন নিজেরদের প্রটেক্ট করতে পারে এজন্য কিছু কোর্স যেমন:মার্শালাট জাতীয় কিছু শিখতে পারে যার দ্বারা নিজেদের প্রটেক্ট করতে পারে জরুরী মুহূর্তে। এমনকি নারীর যে নরম মন দিয়ে সবাইকে বিশ্বাস করে সেই মনোভাবের পরিবর্তন আনতে হবে। নিজেকে ভালোবাসতে হবে। যেকোন কাজ করার আগে ভেবে পদক্ষেপ নিতে হবে।

অপরিচিত হউক বা বন্ধু হউক তাকে ১০০%বিশ্বাস করা যাবেনা। অপরিচিত কারো সাথে রাত বিরাতে ঘোরাফেরা থেকে বিরত থাকা ভালো। অনেকেই বলবেন আমি নারী হয়েছি তাই আমি স্বাধীনভাবে চলতে পারবোনা। কিন্তু আমার মনে হয় রাত বিরাতে বন্ধুদের সাথে পার্টিতে যাওয়ার মাঝেই কি শুধু স্বাধীনতা? আবার অনেকে বলবেন এসব করলেই কি ধর্ষন বা পারিবারিক নির্যাতন কমে যাবে?? আমি বলবো হয়ত যেতেই পারে। কারন যে দেশে একজন নারী ধর্ষনের শিকার হয়ে থানায় মামলা করলে তাকে আবারো কয়েক দফায় দফায় জেনেশুনে আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে ধর্ষনের শিকার হতে হয়। সে দেশে আমার কাছে মনে এর চাইতে নিজেদের স্বাধীনতায় কিছুটা বাধ সাধিয়ে পথ চলায় যুক্তিসংগত।

তাই আমি বলবো নারীদের সুকৌশলী,চতুর,কঠোর,আত্নবিশ্বাসী হওয়ার মাধ্যমেই পারিবারিক নির্যাতন বলুন আর ধর্ষন বলুন কিছুটা হলেও প্রতিরোধ সম্ভব।অবশেষে বলবো নারী মানিয়ে নিতে নিতে অভ্যাসে পরিণত করা নয় বরং “মনে নিয়ে মানিয়ে নাও।”ধীরব ধীরে তা দ্বারা প্রতিরোধ গড়ে তোল অবশ্যই তা হেজেমনিক প্রক্রিয়ায়।

লিখেছেনঃ জিন্নাতুন নেছা