অনুরণন

ছেঁড়া বাঁধন

জীবন মানেই সুখের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো। আজ যে মানুষগুলো বেঁচে আছে তাদের বেঁচে থাকা মানেই দুঃখের সাথে বসবাস করা। সুখকে বাঁচিয়ে রাখতে সবচেয়ে অস্বস্তি অনুভব করে এই মানুষগুলো। কারন সেই সুখগুলো পিছনে লুকিয়ে থাকে অনেক না বলা কথা।
আজ তাই আমার কিছু না বলা কথা লিখে যাচ্ছি। জানি না হয়ত একসময় এই লিখা অনেক এর মুখে মুখে থাকবে।

কিন্তু হতছড়া এই চোখ দুটো সামনে কেমন যেন সব আপছা হয়ে যায়। আর আজকাল মনে হয় হাত-পা নাড়াতে পারি না। হয়ত এটা বয়সের কারনেই হচ্ছে।কি যেন বয়সটা হয়ত একটু বেশি হয়ে গেছে। তবে এতটুকু জীবন থেকে অনেক কিছু শিখা হয়ে গেল। জীবনটা খুব বেশি সহজ নয়।এতে অনেক দুঃখ,কষ্ট,ত্যাগ এর বিনিময়ে সামান্য কিছু সুখ খুঁজে পাওয়া যায়।আর সেই সুখগুলো এতটাই ক্ষণস্থায়ী থাকে ধরে রাখা যায় না।

আমার আজও মনে আছে সেই দিনটির কথা। সদূরবাড়ি গ্রামের আজমল হেড মাস্টারের মেয়ে যার গায়ে হলুদ আর লাল রঙের মিশ্রনে একটি শাড়ী,কপালে লাল টিপ আর হাতে তার লাল চুড়ি। কানে তার দুল।দেখতে তাকে বেশ লাগছে। তার পুরো বাড়িটি রঙ্গিন ফুল ও কাগজে সাজানো হচ্ছে। মেয়েটির আজ গায়ে হলুদ। মেয়েটির নাম খুব আদর করে কাজল তারা রেখেছিল তার মা। কিন্তু মায়ের আদর সইল না ওর কপালে। ওর বয়স দুই হতে না হতেই ওর মা মারা যায়। মেয়েটি দশ ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে। বহু খোজাখোজির পর এক সরকারী দপ্তরির সাথে মেয়ের বিয়ে ঠিক করলেন আজমল সাহেব। বাপ মা মরা ছেলেটির শহরে একটি বাড়ি আর চাকরি ছাড়া কিছু নেই।

আজ কাজল তারা আর আকাশ এর বিয়ে।বিয়ের দিন সারা বাড়ী কাজে ব্যস্ত।ওই দিকে রান্নার কাজও শুরু হয়ে গেছে।।সব সখিরা মিলে সাজাতে শুরু করল তাকে।ছেলের বেশি কিছু নেই তাই শুধু শাড়ী আর গলার একটি হার হাতে চুড়ি দিয়েছিল।আর কাজলের মায়ের শেষ চিহ্ন কানের দুল আর মাথার টীকলি
পড়িয়ে দিল সখিরা ।

বধুর সাজে আজ অপরূপ লাগছে কাজলকে। সখিরা ওকে নিয়ে ঠাট্টা করা শুরু করে দিল।লজ্জায় লাল হয়ে বসে রইল কাজল। ওইদিকে ছেলে পক্ষ এসে উপস্থিত হলে খাওয়া দাওয়া শেষে মাশাহ আল্লাহ বলেই কাশি দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল কাজি আর মেয়ের বাবা। মেয়ের পাশে বসল মেয়ের বাবা।কাজি সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করল।

কাজিঃ মা কাজল তারা তুমি এই বিয়ে তে রাজি থাকলে বল কবুল। কাজল তার বাবার দিকে কতক্ষন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল ওর বাবার চোখের পানি যেন থামছেই না।
অবশেষে নিরবতা ভেঙে কবুল বলতেই চারদিকে খুশিতে সবাই নাচা নাচি শুরু করল।

এবার কাজি সাহেব জনাব আকাশ সাহেব এর কাছে গেলেন। কাজি বললেন বাবা আপনি যদি রাজি থাকেন এই বিয়ে তাহলে ৩ কবুল বলেন। আকাশ সাহেব কবুল বলতেই বিয়ের কার্যক্রম সমাপ্ত হল। প্রথাগতভাবে বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসলে কাজী সাহেব বললেন তাহলে এবার যাওয়া যাক।

আজমল সাহেব মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে ঘোড়ার গাড়িতে উঠিয়ে দিলেন। গাড়িটি চলতে শুরু করলে আজমল সাহেব অর পিছু পিছু চলতে থাকলে। ওই দিকে কাজল হু হু করে কেঁদেই যাচ্ছে। গ্রামের সারাটি পথ আজমল সাহেব গাড়িটির পিছন ছুটলেন।গাড়িটি শহরেরে রাস্তায় উঠা মাত্রই আজমল সাহেব এর ভিতরটা কেমন যেন শূন্য হয়ে গেল। চোখে ঝাপসা দেখতে লাগলেন। গাড়িটি শহরের দিকে যেতে লাগল এবং পরক্ষনে মেয়ের চেহারা বিলীন হতে লাগল।আর তার মনে হতে লাগল এইবার বুঝি বাঁধনটা ছিড়ে গেল।

লিখেছেনঃ সাবরিনা আক্তার