মুক্তধারা

“সহমরণ” সেকাল থেকে একাল

স্বামী নামের মানুষটার সাথে তার শখ্যতা হয়নি তখনও শুধু মনে পরে সানাই আর বাদ্যিতে পুরা বাড়ি উৎসব উৎসব আর ঐ অনেক বড় মানুষটার পাশে তাকে বসিয়ে অনেক মন্ত্র পাঠ হয়েছিলো সেই রাতে। ঘুম ঘুম চোখে হয়েছিলো মালা বদল আর শুভ দৃষ্টি।

তারপরছোট্ট মেয়েটা শশুড় বাড়িতে শাঁখা সিঁদুর আর আলতা পায়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াতো মালতী। মাঝে মাঝে পেয়ারা গাছে উঠে পরতো,বড়রা ছি ছি বলে জিভ কাটতো আর জায়েরা আঁচলে মুখ লুকিয়ে হাসতে হাসতে নামিয়ে নিতো। কিন্তু আজ সেই বাড়িতে কান্না আর কষ্টের বন্যা। মালতীর “স্বামী “নামক মানুষটা মারা গেছে।

মালতীকে সবাই আজ খুব সমীহ করছে কারন শব যাত্রার সাথে মালতীকে যেতে হবে। এটাই নিয়ম, মালতীও দু একবার শুনেছে এই প্রথার কথা” স্বামীর সাথে স্বর্গ যাত্রা”। সেই নিয়ম অনুসারে প্রথম আর শেষবারের মতো স্বামী নামক লোকটার পাশে তার বিছানা হবে আজ। পাশাপাশি সাজানো দুই চিতা।চিতায় কাঠের মাঝে চন্দন কাঠও আছে। একসাথে তাদের দুইজনের আজ স্বর্গে যাত্রা। আর তবেই না সে সতীস্বার্ধী নারী।

মালতী চিতায় উঠে স্বর্গে গেছে ঠিকই কিন্তু কেউ তার প্রশ্নভরা চাহুনি পড়তে পরেনি,তার আত্ম চিৎকার সেদিন কেউ শোনেনি। সবাই ব্যস্ত তাকে স্বর্গে পাঠাতে
যাকে সে কখনই কাছে থেকে দেখেনি,যে মেয়েটা বুঝেই উঠেনি বিয়ে,স্বামী সংসার নামের বিষয়গুলো তাকে কিনা তার স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে প্রথা নামক নিয়মের বেড়াজালে বেধে।

বাবার অভাবের ঘরে জন্ম বিলকিসের। পিঠাপিঠি আরও ভাইবোন। ছোট বয়েসেই একটু বারন্ত শরীর,দেখতেও খারাপ না। ১২ না পেরুতেই বিয়ের প্রস্তাব,দিনমজুর বাবা মেয়েকে পার করতে পারলে যেনো একটু হাফ ছেড়ে বাঁচে,কিন্তু ছেলে পক্ষের চাওয়া যৌতুক দেওয়ার সামর্থ্য নাই। তাই বিনা যৌতুকে ৪৫ পেরুনো গফুরের সাথে বিলকিসের বিয়ে। বিয়ের পর বয়সের পার্থক্য,মানসিক অমিল আর স্বামীর শারীরিক সমস্যা বিলকিসকে দিশেহারা করে দেয়,কিন্তু ছোটবেলা থেকেই শুনেছে বিয়ে মেয়েদের একবারই হয়। তাই নিজের চাওয়া পাওয়া ত্যাগ করে গফুরকেই তার জীবন মরনের সাথী ভেবে নিয়েছে বিলকিস।

আর শেফালী? সেতো বিয়ের পরই জেনেছে রহিমের সমস্যার কথা,যার কারনে সে এখনও মা হতে পারেনি পারবেও না। শেফালী তার মাতৃত্বের স্বাদ নিতে পারেনি রহিমের কারনে তবুও স্বামী, সংসার আঁকড়ে আছে।

মালতী, শেফালী আর বিলকিস দুই সময়ের সহমরণ মেনে নেওয়া চরিত্র, কেউ নিজের জীবন বিষর্জন দিয়ে জলন্ত চিতায় উঠেছে স্বামীর সাথে আর কেউ নিজের আত্মাকে বাঁচিয়ে রেখে নিজের চাওয়া পাওয়া আর নিজ স্বত্বা ত্যাগ করেছে। সব কালেই নীরবে সহমরণ মেনে নিচ্ছে আমাদের বিলকিস, শেফালী আর মালতীরা।

( ১৮১৩ সালে আইন করা হয় ১৬ বছরের নিচে কোন বিধবা সহমরণে যেতে পারবে না,তার আগে সব বয়সী বিধবারাই সহমরণে যেতো কেউ স্বেচ্ছায় কেউ বা জোরপূর্বক)

লিখেছেনঃ সাজিয়া আফরিন