অনুরণন

৭১’এর ছবি (শেষ পর্ব)

৭১’ এর ছবি (শেষ পর্ব)

সব কিছু জানার পর নজরুল নামের নাম করা উকিল বলেছিলো,ছবি আমি আপনাকে আমার বাসায় সারাজীবন রাখতে পারবো তবে সেটা আমাদের বাড়ির বউ হিসেবে না।

স্নিগ্ধা: আজ আমি ছবি না আমি শুধুই স্নিগ্ধা, আর আপনার মতো কারো ঘরে আশ্রিতা হওয়ার চেয়ে পথে পরে থাকা ভাল।

নজরুল: আমি আপনাকে আঘাত করতে চাইনি।

স্নিগ্ধা: আপনি সে ক্ষমতা রাখেনও না। সেদিন আপনাদের এতো উদারতা কোথায় ছিলো যেদিন বহু বিরাঙ্গনা এদেশে আশ্রয় না পেয়ে পাকিস্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলো? আমরা বিরাঙ্গনারা নিজেদের সব শেষ হতে দেখেছি তবুও আশা রেখেছি দেশ স্বাধীন হবে। তখন আমাদের মা,বোন, ভাই পরিবার নিরাপদে থাকব। থাকবে আমাদের এই ত্যাগের বিনিময়ে।
আর আপনারা? স্বাধীন দেশে মাথা উচু করে ঘুরছেন নিরাপদে আর নিজেদের উদারতা প্রদর্শন করছেন? এতো উদার আপনারা তাহলে কেনো এতো এতো মুক্তিযোদ্ধা এখনও অসহায় জীবন কাটায়?

আমি বিরাঙ্গনা এটা আমার গর্ব কারন সেটা আমার দেশের জন্য হয়েছি, আপনার মতো কাপুরুষের দয়া নেবার জন্য নয়। নজরুল সম্ভবত অপমানিত বোধ করায় সোজা বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে। আর কত অনেক তো হলো,স্নিগ্ধার জন্য সোবহান আলীর পরিবার তাদের চিরচেনা গ্রাম ছেড়েছে,আত্মীয় পরিজন ত্যাগ করেছে আর কত!! স্নিগ্ধা চায় নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে যেটা রিনি আর সোবহান আলীর পরিবারকে নতুন ভাবে সবাই চিনাবে।

সারদিনের ক্লান্তি আর অতীতের টানাপোড়ন সব মিলিয়ে ভাল লাগছে না স্নিগ্ধার। বাবা মা কে খুব মনে পরছে। কেমন আছে তারা কোথায় আছে খুব জানতে ইচ্ছে করে। এসব ভাবনার মাঝে দরজায় নক করছে কেউ। স্নিগ্ধা দেখে নাহিল দাঁড়িয়ে আছে দরজায়।

স্নিগ্ধাঃ ভাইয়া কি হয়েছে এতো রাতে?
নাহিলঃ ঘুমিয়েছিলি?
স্নিগ্ধাঃ না, নাহিলঃ আয় বসে কথা বলি একটু।
স্নিগ্ধা: বলো?
নাহিল: তুই তোর অতীত থেকে বেরিয়ে আয় ছবি,দেখ তোর সামনের মানুষ গুলোকে। আমরা সবাই চাই তুই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আয়। আমরা তো আছি তোর পাশে।
স্নিগ্ধাঃ আমার অতীতই তো আমার বর্তমান আর ভবিষ্যত,সেটা থেকে কি বেরিয়ে আসা যায়?
নাহিলঃ তাহলে কি তুই সামনে পা বাড়াবি না?
স্নিগ্ধাঃ সামনে পা বাড়িয়েছি বলেই তো আমি আজ তোমাদের ছবি।
নাহিলঃ রিনির দায়িত্ব কি আমাকে দিতে পারিস না?

স্নিগ্ধা কোন কথা বলতে পারেনা। দু-চোখ ভিজে যায় তার। নাহিল ছবির হাত আলতো করে ধরে বলে তুই কি আমাকে নিয়ে তোর ঘুমস্বপ্ন দেখতে পারিস না? স্নিগ্ধা বারান্দায় দাঁড়ায়, ইচ্ছে করছে জোছনার আলোতে নিজেকে ধুয়ে ফেলতে, ঝেড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে মনের সব অন্ধকার। কিন্তু সেটা সম্ভব না কোন ভাবেই। সোবহান আলীর পরিবার তাকে অনেক দিয়েছে, শেফালী ফুপু তাকে ভালোবেসে কাছে রেখেছে কখনও সামান্যতম কষ্ট পেতে দেয়নি, সেই মানুষগুলোর কাছে আর কত নেওয়া যায়! এখন তো তাদের জন্য কিছু করার সময় হয়েছে স্নিগ্ধার। খুব ভোরে উঠেছে স্নিগ্ধা। উঠেছে না সে তো জেগেই ছিলো,শুধু ভোরের অপেক্ষায়। নাস্তা আর চা বানিয়ে ঘরে এসে রিনির কাপড়গুলো গুছিয়ে নেয়। রিনি তখনও ঘুমিয়ে।

ঘুমন্ত মেয়েকে কোলে নিয়ে স্নিগ্ধা বেরিয়ে পরে সেই হারানো স্নিগ্ধার খোঁজে।

৭১’ এর ছবি (শেষ পর্ব)

লিখেছেনঃ সাজিয়া আফরিন