'ও ডাক্তার'

মুকিত’র ছোট নৌকা | মেডিকেল লাইফ

রুমমেট গুলো আজ পেট ভরে ডেমো খাচ্ছে। পেট বললে ভুল হবে,মাথা ভরে। ডেমো সুজন বিডি চৌরাশিয়া উগড়ে বোধ হয় এই মুহুর্তে কিছুটা ক্লান্ত। মনে মনে সেই ছবিটা আঁকছে মুকিত আর টলমলে লেকের পানিতে ঢিল ছুড়ে দিচ্ছে।বিকেল বেলা এই লেকের পারে রোজ আড্ডা জমে।ওরা চার রুমমেট আর সাথে থাকে তপন,নিলয়রা।ব্যাচের মেয়েগুলোর চুল চেড়া বিশ্লেষন থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের পলিটিকস,স্যার ম্যাম দের মিমিক কিছু করা,ক্লাবে কার কতটা পিক হল,দেশের অবস্থা,জিএফ,বিএফ আরো কত কি!

পড়াশুনার বিষয়টা এলেই মুকিতের খুব অস্বস্থি হয়।এই একটা যায়গায় ও কেমন স্থির হতে পারে না।নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে শামুক হয়ে থাকতে হয়।বন্ধুরা বোঝে,এক সময় আলোচনা পাল্টে যায়।ও কিছুটা হালকা হয়। লেকের জলের সাথে একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে ওর, বলা যায় মিল- টলমলে,স্থির না। সবসময়ই একটা ঢেউ আছে ,খুব খেয়াল করলে বোঝা যায়। আপাত দৃষ্টিতে কখনও কখনও মানুষ হয়ত একে শান্ত ভেবে ভুল ও করে বসে। মুকিত নিজের ভেতরের কষ্টকে চেপে রাখতে শিখেছে। বন্ধুদের কাছে চোখে পানি এনে আরো কোনো উপাধি জোটাতে চায়না ও।

এমনিতেই সাপ্লি মুকিত,পেনডিং বয় বহু খেতাব আছে আড়ালে।নিজেকে ভিন্ন একটা স্থিরতার আবরনে ঢেকে রাখলেও কষ্টটা ঠিকই ওকে বিষিয়ে তোলে।শুরুতে চেষ্টা ছিল। এতবার অকৃতকার্য হওয়া চেহারাটা বাবা মাকেও দেখাতে মন চায়না আজকাল। প্রথম প্রথম অটো ভ্যাকেশনে বাড়িতে যেত মুকিত। পরীক্ষার পর পর যেহেতু ছুটিটা মেলে তাই তখন বাড়ি গিয়ে বলা যায় রেজাল্ট হয়নি। বাবা মায়ের মুখের উপর মিথ্যে বলা লাগেনা। রেজাল্ট হলেও আজকাল বলা হয়না। পাশের মুখ একবারে দেখাই তো হয়না!

সাপ্লি কম্লি দিয়ে দিয়ে একবছরে বহু ক্লান্তি ভর করেছে।কেন যে এমন হল ওর মাথায় আসেনা।বইগুলো খুব বেরশিক।কোনো গল্প নেই। সব খাপছাড়া লাগে। অনেকেই তেমন পড়ুয়া না। তবু ডেমো গিলতে পারে। মুকিতের মাথার উপরে ওগুলো কিছুক্ষন ভাসে,এরপর উড়ে যায়! ঘুড়ির মত। ঘুড়ি ওর খুব প্রিয়।ভাল লাগত গ্রামের মাঠে নাটাই হাতে সবচেয়ে বড় ঘুড়িটা ওড়াতে,রাত জেগে শিপলু ,টুলুর সাথে ঝিলের ধারে মাছ ধরতে আর সপ্তাহের একটা রাত গ্রামের জোয়ান ছেলের পালে দলনেতা হয়ে গ্রাম পাহাড়ায় নামতে! এই তো বছর খানেক আগেও এমন ছিল জীবনটা। মশাল হাতে হৌ হৌ করে ডাকাতের দলকে ঠেকাত।

পড়াশুনাটায় বরাবর খুব ভাল ছেলেটার জন্য হঠাত্ স্যাররা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। গ্রামে না এবার শহরে গিয়ে প্রতিযোগীতায় নামতে হবে।মুকিত বাবা মায়ের ইচ্ছেকে মূল্য দিতে চলে আসল। গ্রামের জন্য অন্য অনেক গুলো স্বপ্নকে আপাতত ভুলে যেতে চাইল সরকারি একটা মেডিকেলে চান্স পেয়ে প্রথমবর্ষেই গ্রামের সহজ সরল মানুষের কাছে মুকিত হয়ে গেল মুকু ডাক্তার! একটা নিবিড় ভালোলাগায় টইটুম্বর ছিল মনটা তখন। নতুন জীবনে একটার পর একটা ব্যর্থতা সেই শক্তির সবটুকু ছিনিয়ে নিয়েছে। এখন আর ভালোলাগেনা।

কাল বাদে পরশু থেকে টার্ম। লেকের পারে উদাস দৃষ্টি মেলে স্বন্ধ্যা নামা দেখার অপেক্ষায় থাকে মুকিত। নির্লিপ্ত স্বন্ধ্যা। হঠাত্ করে স্বন্ধ্যা নামের সেই মেয়েটার কথা মনে পড়ে যায় ওর! শিপলুর বোনের নাম স্বন্ধ্যা! এই নামটা অবশ্য মুকিতের দেয়া। কেমন একটা বিচিত্র রং আছে মেয়েটার। কখনও অভিমানী কথনও মায়াবী। ঘুমের ওষুধগুলো সব কিছু ভুলিয়ে দেয় আজকাল। অনেক দিন ধরে মানিব্যাগের ভাজে থাকা স্বন্ধ্যার চিঠিটার কথাও আজকাল মনে পরেনা তেমন। পকেটে হাত দিয়ে অস্থির হয়ে হাতড়ায় ও। পেয়েও যায়। অবহেলার জিনিস অনেক সময়ই এলোপাতারি রাখলেও হারিয়ে যায়না। মুকিত কাগজের ভাজ খোলে।এটা চিঠি।তবে কিছু লেখা নেই। দুটো চোখ আঁকা আছে। একদম ই সুন্দর না। স্বন্ধ্যাকে মুকিত কোন এক সময় বলেছিল” তোমার চোখ দুটো আমায় দেবে? আমায় পাহাড়ায় রাখবে। তোমার স্বপ্নগুলো ও?আমায় বাচিঁয়ে রাখবে ?”

এইসব হাবিজাবি। আর বোকা মেয়েটা এই জোড়া চোখের ছবিটা দিয়ে দিয়েছিল!অনেকদিন হল বাড়ি যাওয়া হয়না।স্বন্ধ্যার গভীর চোখের দিকে তাকানো হয়না।এখানে অনেক চটপটে মেয়ে আছে। যাদের সাথে ফেসবুকে গল্প করতে শিখেছে মুকিত। সন্ধ্যার কথা যেন মনেও পরেনা! লেকের পানিতে ছুড়ে দেয়া চোখ চিঠির নৌকাটা দুলতে থাকে। মুকিত বসে বসে গুনতে থাকে ছোট্ট ঢেউগুলো যেগুলো ওটাকে একটু একটু করে এগিয়ে নেয়।মাঝে মাঝে বাতাস আসে উল্টো পথে।ছোট নৌকাটা দিক পাল্টায়। ও স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে। একসময় দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে ছোট্ট নৌকাটা দূরে চলে যায়। বুকের ভেতরের রক্ত চলাচল টের পাচ্ছে মুকিত!

বেশি একটা দেরি হয়ে যায়নি। “এখনো কি সময় নেই? ছোট নৌকা হয়েই না হয় ভাসব বিশাল একটা জলাশয়ে? একটু একটু করেই না হয় সামনে যাওয়া যাবে? এখনোতে অনেক পথ বাকি।বাতাসের ঝাপটায় উল্টো পথে কেন হাঁটব আমি?” নিজের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে ওঠে দাঁড়ায় মুকিত। চারিদিকে আযানের ধ্বনির সাথে সাথে দিন রাতের স্বন্ধিক্ষন গভীর হচ্ছে। মুকিত পা বাড়াল বয়েস হোস্টের পথে। অনেক কাজ বাকি।নামায শেষ করে সোজা রিডিং রুম। আপাতত এইখান থেকেই নৌকো চলুক না!

লিখেছেনঃ সাবিহা পারভিন আইরিন।