অনুরণন

৭১’এর ছবি (পর্বঃ ৯)

৭১’এর ছবি (পর্ব-৯)

যুদ্ধ চারিদিকে সবাই বাড়িতে বন্দি। গ্রাম থেকে রফিক, সাব্বির যুদ্ধে যাবে কানে আসছে। আশপাশের গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। মা মেয়ে কাউকে ছেড়ে দিচ্ছে না ওরা। স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষন বাবার সামনে মেয়েকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। স্নিগ্ধার বাবা মার চোখেও আতঙ্ক।আতঙ্কে কাটে দিন রাত। স্নিগ্ধা ঠিক করলো সেও ওদের সাথে যুদ্ধে যাবে,ক্যাম্পে নাকি অনেক আহত যোদ্ধারা সেবা পাচ্ছেনা, সে তাদের সেবা করবে।

এক রাতে বাবা মাকে তার কথা জানালো,স্নিগ্ধার বাবা মা রাজি না। স্নিগ্ধাও ছাড়বে না। বাবার কড়া নির্দেশ যদি যেতেই হয় তবে আর কখনই যেনো বাড়ি না ফিরে। সবাই পালিয়ে বাঁচতে চায় সেখানে মেয়ে যুদ্ধে যাবে,কোন বাবা মা সহজে রাজি হতে চায়? সাব্বির বলেছিলো স্নিগ্ধা তুই বাড়িতে নিরাপদে থাক এই তো কটাদিন তার পর তো ফিরছি। স্নিগ্ধা চেয়েছিলো দুইজন পাশাপাশি থেকে দেশের জন্য কিছু করতে। সাব্বির অনেক বুঝিয়েও কোন লাভ হয় নি। এক ভোরে রফিক সাব্বিরের সাথে বেরিয়ে পরে স্নিগ্ধা।

শত শত আহত যোদ্ধা ক্যাম্পে,স্নিগ্ধার মতো অনেকেই আছে তাদের সেবার জন্য। প্রতিদিন বাড়ছে তাদের সংখ্যা। ক্যাম্পের কিছু তরুনরা ট্রেনিং নিচ্ছে,স্নিগ্ধা সময় পেলে দেখতো। আসে পাশেই যুদ্ধ চলছে। পাশে যে মিলিটারি ক্যাম্প সেটা কি করে দেখলে নেওয়া যায় তার পরিকল্পনা চলছে। একেকটা গ্রুপে ভাগ হচ্ছে ওরা। সরাসরি ক্যাম্প ঘেরাও করার গ্রুপে সাব্বির ও আছে। স্নিগ্ধার বিশ্বাস ওরা পারবে। পারতেই হবে। পেরেছিলো ওদের ক্যাম্প নিশ্চিহ্ন করতে আর স্নিগ্ধার জীবন থেকে চীরতরে হারিয়ে গেলো সাব্বির। তার সামনে পুরা পৃথিবী শূন্য হয়ে গেলো নিমিষেই। স্নিগ্ধা ভাবে তবুও তো দেশের জন্য জীবন দিতে পেরেছে সাব্বির।

চারদিকে শুধু ভয় আর উত্তেজনা, চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেনা বৃদ্ধ আর শিশুরা,এর ভিতর জানা গেলো পাশের গ্রামে রহিম শেখের মেয়েটা অসুস্থ,ক্যাম্পের ডাক্তার আপা আর স্নিগ্ধা নিজেদের ইচ্ছায় রওনা হলো মেয়েটার চিকিৎসা দিতে। পথে মিলেটারির গাড়ি তাদের থামালো, কোন কথা বলার সুযোগ দেয়নি তাদের। তাদের গাড়িতে তুলে নিলো নেওয়ার সময় ডাক্তার আপা বার বার অনুনয় বিনুনয় করে বলছিলো, একটা বাচ্চা অসুস্থ তার চিকিৎসা দরকার আমাদের যেতে দেন। কেউ শোনেনি উল্টা বুট দিয়ে একের পর এক লাথি পরেছে তাদের উপর।

এক অন্ধকার নোংরা ঘরে তাদের জায়গা হলো।সেখানে আগে থেকেই আরো ৬ জন ছিলো। যারা সবাই স্নিগ্ধার চেয়ে বয়সে বড়। কেউ কেউ হঠাত করেই কেঁদে উঠে,কেউ বা শূন্য দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে থাকে। অনেকই পালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলো,কিন্তু স্নিগ্ধা সেটা একবারও করেনি, কারন তার তো যাওয়ার কোন জায়গা নাই। তার উপর এই বন্দি দশা থেকে বেরিয়ে গেলে সমাজ ও তাকে মেনে নিবে না। তাই সে ধরেই নিয়েছে এখানে যে কদিন পশুদের অত্যাচার সহ্য করে টিকে থাকা যায়। তাদের পরার কাপড় কেড়ে নেওয়া হলো আর দেওয়া হলো নাম মাত্র কাপড়।

প্রতি রাতে চলে তান্ডব,ঝড় বরে যায় শরীরে। নখ আর দাঁতের চিহ্ন সারা শরীরে। সারা মুখে আঁচড়ের দাগ, এটা স্নিগ্ধারর ধারনা,কারন ঘরে কোন আয়না নাই যে নিজেকে দেখবে। ক্ষুধার্ত পশুগুলোও হয়তো এতো অত্যচার করেনা তাদের কাঙ্খিত শীকারের উপর,কিন্তু মানুষ নামের পশুরা ক্ষুধার্ত হলে পশুকেও হার মানায় তা শুধু হায়নাদের দেখলেই বোঝা যায়। প্রতিদিন রক্ত পিপাসু নেকড়েদের থাবায় রক্তাক্ত শরীর আর মন। এর ভিতর ওর মালিকানা বদল হয়েছে কয়েকবার। শেষবার সে যার অধীনে এলো সেই লোকটা স্নিগ্ধার বাবার বয়সী হবে। সেই বাবার বয়সী লোকটা হয়তবা তাকে মেয়ের মতো ভাববে এমনটা আশা না করলেও অন্তত তাকে ছোঁয়ার আগে একটু ভাববে এটা আশা করেছিলো স্নিগ্ধা। কিন্তু ওরা যে আসলেই পশু সেটাই বুঝেছিলো সে। সেই রাতে স্নিগ্ধা জ্ঞান হারাবার কত সময় পর জ্ঞান ফিরেছিলো সে জানে না। নিজেকে দেখেছিলো এক বিছানায় পরে আছে, উঠতে চেয়েও উঠতে পারেনি,পাশে বসে এক জামাদারর্নী। সে ওর দেখভাল করছে।কয়েক দিনে ওই জামাদারর্নীর সাথে ওর একটা ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়। কারন ওরা দুজনই চায় দেশ স্বাধীন হোক।

ডিসেম্বরের এক ভোরে তেরো-চৌদ্দ বছরের একটা মেয়েকে নিয়ে এলো ওরা। স্নিগ্ধার ভীষন কষ্ট হলো ছোট্ট মেয়েটার কান্না দেখে। মেয়েটার কোন ক্ষতি হবার আগেই এবার এখান থেকে ওকে নিয়ে পালাতে হবে যে করেই হোক।এতোটুকু মেয়েটা যার কিনা পুরো জীবন পরে আছে সামনে। মেয়েটাকে বাঁচাতেই হবে।

সকালের আলো ফুটতেই বাইরে পরিষ্কার করার জন্য পরিচিত জামাদারর্নী এলো,স্নিগ্ধা তাকে নিজের পরিকল্পনারর কথা জানানো।জামাদারর্নীর পরামর্শ মতো স্নিগ্ধা নিজের পরনের কাপড় দিয়ে ওর হাত, মুখ বেধে বাথরুমে ফেলে রাখলো আর নিজে ওর কাপড় পরে নিলো,যেনো কেউ দেখলে তাকে সন্দেহ না করে। এবার মেয়েটিকে নিয়ে বেরিয়ে পরলো। নিজের শরীরটা তখন ভারী হয়ে গেছে,আর সময় যে বাকী নেই তার পৃথিবীতে আসার সেটা স্নিগ্ধা বুঝে গেছে। সেই নিয়েই স্নিগ্ধা সেদিন প্রাচির টপকিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো মেয়েটিকে নিয়ে। সব শক্তি যেনো সেদিন তার শরীরে ভর করেছিলো।মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যাবধান অথচ মেয়টার বাড়িতে কাউকে পাওয়া যায় নি।

সবাই বলছে দেশ স্বাধীন হয়েছে,পথে পথে মানুষের ঢল। যে যার গন্তব্যে ছুটছে কিন্তু,স্নিগ্ধার যাওয়ার কোন জায়গা নাই তাও সাথে এবার আর একজন। যাকে স্নিগ্ধা আপন করে নিয়েছে নিজের অজান্তেই,ওকে নিয়েই নতুন পৃথিবী সাজাবে এবার।

ছবির সামনে ভাসতে থাকে তার অতীত। ছেলে পক্ষ দেখতে আসায় আজ বহু বছর পর এই ধূূসর অতীতকে নতুন করে সামনে আনতে হয়েছে ছবি হয়ে উঠা এক স্নিগ্ধা কে।

(চলবে…………)

৭১’এর ছবি
লিখেছেনঃ সাজিয়া আফরিন