অনুরণন

৭১’এর ছবি (পর্বঃ ৮)

৭১’এর ছবি (পর্ব -৮)

সোবাহান সাহেব বাজারে যাচ্ছে একটু সবার সাথে বসে গল্প করবে। নতুন দেশ চারদিকে একটা স্বস্তির নিশ্বাস। নদীর উপর দিয়েই বাজারে যেতে হয়, রাস্তা ঘাট সবই ভাঙ্গা,যুদ্ধের সময় ব্রিজটাও ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে,দেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র কয়েক দিন,তাই চারিদিকে এখনও আনন্দ আর ভাঙ্গনের সুরে মিলে মিশে একাকার বাইরে বের হলেই শুধু যুদ্ধের আর যুদ্ধের গল্প।কে কে ফিরেছ আর কারা কি অবস্থায় আছে তার খবর। সোবহান আলীর গ্রামের বেশ কিছু ছেলে যুূ্দ্ধে গিয়েছিলো আর সেই খবর পেয়ে মিলেটারিরা গ্রামে তান্ডব করেছে খুব, বহু ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। রাজাকার জবেদ আলী সবার বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছে। সেপ্টেম্বরের এক রাতে হঠাত গোলাগুলির শব্দ,মনে হচ্ছে পুরা গ্রাম তখনই শেষ হয়ে যাবে। ভোরে গোলাগুলি থামলে চারিদিকে কান্নার রোল,এর ভিতরই জানা গেলো রহমান হোসেনের বড় ছেলের গলায় গুলি লেগেছে, বাঁচবে বলে মনে হয় না। মাত্র পনেরো বছরের ছেলে। তাকে ভোরেই গ্রামের কিছু ছেলেরা মিলে হসপিটালে নিয়ে গেলো,সবাই ভেবেছিলো তারা অতোদূর পৌঁছাতে পারবেনা। কিন্তু ওদের মনের জোর ওদের গন্তব্যে নিয়ে গেছে,বেঁচে যায় রহমান হোসেনের ছেলে।

১৫ ই ডিসেম্বর গ্রামের ছেলেরা সেই পাক সেনাদের দালাল জবেদ আলীকে পালিয়ে যাওয়ার সময় ধরে ফেলে। তাকে স্কুল মাঠে নিয়ে যাওয়া হয় সবার সামনে গুলি করে মারা হবে তাই। আশপাশের গ্রামের লোকজনও জমা হয়েছে রাজাকার মারা দেখার জন্য। কেউ কেউ স্যান্ডেল ছুড়ে মেরেছে।জবেদ আলীর বউ কোলে বাচ্চা নিয়ে ছুটে এসেছে তাকে বাঁচাতে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পারে ধরে কান্না কাটি। এলাকার গন্য মান্য লোকজন আর মুক্তিযোদ্ধারা মিলে শেষে সিদ্ধান্ত নিলো তাকে জানে মারা হবে না। তার একটা কান কেটে দেওয়া হবে আর সে গ্রামবাসীর কাছে ক্ষমা চাইবে তার অপকর্মের জন্য।

রাস্তার পাশে কিছু মহিলা পুরুষ জটলা পাকিয়ে আছে,আর একটু এগিয়ে যেতেই চাপা কান্না কানে এলো মহিলারা একেক জন একেক কথা বলা বলি করছে। সোবহান আলী এগিয়ে গেলো, একটা অল্পবয়সী গর্ভবতী মেয়ে প্রসব ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। সারা শরীরে আঘাত,কাটা ছেড়ার দাগ। ছোট্ট মেয়েটাকেও ছাড়েনি হায়েনার দল ভাবতেই চোখ ভিজে যায় তার। শেয়াল কুকুরের মতো খাবলে খেয়েছে শরীরটা আর রেখে গেছে তাদের জীবন্ত স্মৃতি।

সেবহান আলীর একমাত্র মেয়ের কথা মনে পরে গেলো। খুব ঘটা করে বিয়ে দিয়েছিলো। বিয়ের কিছুদিন পরই দেশে যুদ্ধ শুরু হলো। এদিকে মেয়েটা সন্তান সম্ভবা। মেয়েটাকে যে নিয়ে আসবে সে উপায়ও নাই। মেয়ে বার বার খবর পাঠাচ্ছে তাকে যেনো বাবার বাড়ি থেকে নিতে পাঠায়। সময়ও হয়ে এসেছে তাই সোবহান আলী ভাবলো যে করেই হোক মেয়েকে আনবার ব্যবস্থা করতে হবে। তাই ভরা যুদ্ধে নৌকায় একমাত্র নিরাপদ মনে হলো তার। মেয়েটাকে নিতে গিয়ে দেখলো অযত্নে একেবারেই রুগ্ন প্রায় হয়ে গেছে। কোন চিকিৎসাও নিতে পারেনি। বেশ অসুস্থও মনে হলো। সোবহান আলী আর দেরি না করে মেয়েকে নিয়ে নৌকায় উঠে রওনা হলো,বাড়ি ফিরে যে করেই হোক বশির ডাক্তারকে ডেকে আনতে হবে। নদীর দুই ধার ধরে শুধু ধূ ধূ গ্রাম। পথে যাওয়ার উপায় নাই। চারিদিকে মানুষের আহাযারি, ভাঙ্গাচুড়া পথ ঘাট সব। রওনা দেওয়ার পর মাঝ নদীতে মেয়ের ব্যথা শুরু হলো। এখন অনেক পথ বাকী, দিশেহারা এক বাবা তার মেয়েকে নিয়ে। মেয়েটা আরও অসুস্থ হয়ে পরলো। সোবহান আলীর সব চেষ্টা বিফলে গেলো, সন্তান প্রসবের সময় মেয়েটা নৌকাতেই সোবহান আলীর হাতের উপরই মারা গেলো।

মেয়েটার চিৎকারে সোবহান আলীর ঘোর কেটে গেলো, দ্রুত মেয়েটির কাছে গেলো,সবাই বলছে আর একটু সময় আছে তাই সোবহান আলী কয়েক জনের সাহায্য নিয়ে মেয়েটাকে বাড়ি নিয়ে আসে। মেয়েটি যেদিন একটা কন্য শিশুর জন্ম দিলো সেদিন সোবহান আলী আনন্দে কেঁদে ফেললো। আজ এই মেয়েটা আর তার সন্তানকে বাঁচাতে পেরে তার আনন্দ ধরছেনা। সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটির নাম রাখলো রিনি আর রিনির জন্মদাত্রী কে সোবহান আলী বললো আজ থেকে তুমি আমার মেয়ে। তোমার নাম আজ থেকো ছবি,আমার মেয়ে ছবি।

সোবহান আলীর এমন সিদ্ধান্তে গ্রামে বহু কথা শুরু হলো,সবাই সোবহান আলীর পরিবারকে এড়িয়ে যেতে শুরু করলো,আর যারা তার বাসায় আসতো তারা ছবির মুখে রুপকথার কাহিনী শোনার জন্য আসতো।তাই সোবহান আলী তাদেরও আসা বন্ধ করে দিলো। যে দেশের মেয়েরা স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এতো ত্যাগ করার পরেও দেশের মানুষ তাদের মেনে নিতে পারেনা,সে দেশে ছবিদের মতো মেয়েরা রুপকথার গল্পের কোন চরিত্র হোক সেটা সোবহান আলী চায় না।গ্রামের মানুষের অধিক কৌতুহল ছবির মেয়েটার জীবন নষ্ট করুক এটা ওরা কেউ চায় না,তাই সপরিবারে ওরা গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে চলে যায়। যেখানে ছবিকে দেখতে কেউ আসেনা,কেউ বাঁকা চোখে তাকায় না

(চলবে…………)

৭১’এর ছবি
লিখেছেনঃ সাজিয়া আফরিন