অনুরণন

৭১’এর ছবি (পর্বঃ ৬ ও ৭)

৭১’এর ছবি (পর্ব-৬)

বাড়িতে সোবহান আলীর স্ত্রী ব্যস্ত ভোর থেকে।দুপুরেই ছেলে আর তার কে কে আসবে,ছবি কিছুই জানতে চায়নি ছেলের বিষয়ে, জানতে চায়ও না। কাজের ভিতরই তাগাদা দিচ্ছে ছবিকে সোনহান আলীর স্ত্রী নিজেকে একটু তৈরী করার। ছবি কান দিচ্ছে না ওসবে। সে রিনিকে খাওয়ানো আর গল্প শুনানোতে ব্যস্ত।

নাহিলের তাড়াহুড়া দেখে হিরন বিরক্ত,কি হয়েছে এতো পারাপারি তাড়াতাড়ি কেনো সারাদিন পরে আছে। মনে হচ্ছে এখনই জয়েন করবি।

নাহিলঃ এটা ছাড়াও তো আমার অন্য কাজ আছে,এটা নিয়ে পরে থাকলে তো হবে না।চল এবার

হিরনঃ কোথায়?

নাহিলঃ অতো জানতে হবে না শুধু সাথে থাকবি।

হিরনঃ চল,তবে কাল বললে তো আমি আরও আগে বেরুতাম।

নাহিলঃ এখনও সময় আছে,অসুবিধা হবে না।

ছবি সবার জেদে একটা মিষ্টি কালারের শাড়ি পরেছে,তেমন কোন সাজগোজ ছবির পছন্দ না
। কবে সেজেছিলো আর মনে পরে না।

স্নিগ্ধাকে শাড়িতে সাব্বির খুব পছন্দ করতো। শাড়ি পরতে দেখলেই বলতো এভাবে সব সময় পরিস না তো।

স্নিগ্ধা ভেংচি কেটে বলতো,তুমি বললেই আমি শুনবো কেনো?

সাব্বির বলতো স্নিগ্ধা এভাবে নিজেকে জাহির করিস না। এতো বুঝাতে হবে না যে তুই বিয়ের যোগ্য হয়েছিস। একটু সময় দে আমাকে,পড়া শেষ করার।

স্নিগ্ধাঃ তুমি পড়েই যাও, আমার কোন দায় পরেনি তোমার জন্য বসে বসে বুড়ি হবো। কিন্তু মনে মনে চাইতো সাব্বিরের জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করতে।
কারন সে তো জানে তার মনের কোথায় যেনো একটু কিন কিন করে উঠে ওকে দেখলে।নাকের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম এসে জমা হয় সাব্বির ওর দিকে তাকালে। বিকেলে বাড়ির সামনে বসে থাকতো যদি একটু দেখা পায়।

ছেলের ভাবীর ডাকে ছবি একটু চমকিয়ে উঠে।ছেলে আলাদা করে আগে কথা বলতে চায় ছবির সাথে,তাই ছবি ঘরেই ছেলেকে আনা হলো।

ছবিঃ আমার বিষয়ে নিশ্চয় জেনেছেন?

ছেলেঃ হ্যা কিছুটা।তো আপনাদের ছাড়াছাড়ি টা কবে হয়েছে?

ছবিঃ আপনি হয়ত ভুল জেনেছেন অথবা আপনাকে ভুল জানানো হয়েছে। আমাদের কোন ছাড়াছাড়ি হয়নি।

৭১’এর ছবি (পর্ব-৭)

নাহিলের কোলে রিনি বসে আছে আর ছবি জানালা দিয়ে বাইরে আনমনে তাকিয়ে আছে।তার সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে সেই সব দিন যখন সাব্বিরের সাথে লুকোচুরি খেলেছে,সাব্বিরের ছোট বোন সোনালী যখন পুতুল খেলতে ডাকতো সে ছুটে যেতো।কখনও কখনও পুতুল বিয়ে দিতে গিয়ে অঝোরে কাঁদতো। সাব্বির দেখে বলতো এতো কেঁদে চোখের পানি শেষ করলে নিজের বিয়েতে কি কাঁদার লোক ভাড়া করবি?
কান্না ছেড়ে এবার সোনালী আর সে ছুটতো সাব্বিরকে পিটাতে।অঝোর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হঠাত দেখে অপলক দৃষ্টিতে কেউ তাকিয়ে তার দিকে।লজ্জায় মুখ লাল হতো কিনা সে দেখেনি তবে তার হার্ট বিট যে বেড়ে যেতো,সেটা বুঝতো। সাব্বির এখনও কি বৃষ্টিতে আমাকে খোঁজ? আমি তো খুঁজি তোমার সেই চোখ। কতদিন দেখিনি তোমাকে, কেমন আছো তুমি?

কি ভাবছি এসব! ছবির ভাবনা গুলো এলোমেলো হয়ে যায়,পুরানো দিনগুলি সব ভাবনা থেকে হারিয়ে যেতে থাকে সাথে সাথেই।

বাড়ি পৌছাতে রাত হয়ে গেলো। নাহিল কে দেখে শেফালী চিৎকার করে উঠলো, সারাদিন কেথায় ছিলি, কোন খবরও দিস না। নাহিল ভিতরে চলে গেলো,শেফালী দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে রিনি আর ছবি।

শেফালীঃ নাহিল তোকে নিতে গিয়েছিলো নাকি?

ছবিঃ জানিনা কেনো গিয়েছিলো আর আমারও হঠাৎ আজ আসতে হলে।

শেফালীঃ ঠিকই করেছিস, পড়াশুনা আগে শেষ কর তারপর যত খুশি গিয়ে থাকিস।

ছবিঃ রিনিকেও সাথে এনেছি ফুপু।

শেফালীঃ আমার একটা তো কথা বলার লোক হলো,কি যে বোবার মতো থাকি। চল একটু চা বানিয়ে দে পাগলটাকে, কাল থেকে চা না খেয়ে আছে

ছবিঃ হু করছি

ছবি সবার জন্য চা বানিয়ে নিয়ে বসলো। নাহিল চা খেতে খেতে বললো ছবি তুই বলবি না কি আমি বলবো?

ছবিঃ বলার কি আছে ভাইয়া?

নাহিলঃ আছে অনেক কিছু। মা শোন আজ ছবির বিয়ের জন্য লোক এসে ছিলো।

শেফালীঃ এতো তাড়া কেনো ওর বিয়ে নিয়ে পড়াটা শেষ করতে হবে না?

ছবিঃ ভেবো না, আর হবেও না,ওরা রিনির কথা জেনেছে।

নাহিলঃ মামা তো ভীষন রাগারাগি করোছিলো ছবির সাথে,কেনো সে সব জানালো?এমনি তে গ্রামের লোকজন অনেক কথা বলে,মেলা মেশাও করে না, সেখানে রহিম মামা একটা ভাল ছেলে আনলো আর ছবি তাকে সব জানালো? আমি বুঝিয়ে থামিয়েছি মামাকে, আর তাই আজই ছবি আর রিনিকে নিয়ে এলাম।

ছবিঃ থাক ওসব কথা, তুমি কবে জয়েন করছো বলো।

নাহিলঃ কালই করবো,কি বলো মা।

শেফালীঃ হ্যা দেরি করিস না।

রিনি ছবির পায়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরছে, মেয়েটার সারাদিন কোন যত্ন হয়নি। ছবি ওকে ঘরে নিয়ে গেলো।

নাহিল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আনমনে। ছবি কে কি করে একটু ভাল রাখা যায় সেটাই এখন তার একমাত্র ভাবনা। ছবি ভাল থাকবে রিনি সাথে থাকলে তাই রিনিকে জোর করেই এনেছে নাহিল। চাকুরীতে জয়েন করেই মা কে সব জানাতে হবে। তার আগে ছবির অনুমতি নিতে হবে। কারন কোন ভাবেই ছবিকে আঘাত করা যাবে না। তার আগে ওকে পুরানো স্মৃতি থেকে বের করে আনতে হবে।

মৌমিতা জানালায় দাঁড়িয়ে দেখে নাহিল আনমনে দাঁড়িয়ে আছে। মৌমিতার খুব ইচ্ছে করছে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। মন চায় তাকে জড়িয়ে ধরে বলতে কেনো দেখতে পাওনা আমায়?
মৌমিতা কাগজ কলম নিয়ে বসলো নাহিলকে লিখতে- তার মন চাইছে মনে কথা উজাড় করে কাগজে লিখতে।

যেদিন দেশ স্বাধীন হলো, সবাই আনন্দে রাস্তায় নেমে এলো, আমিও সবার সাথে বাইরে এসেছিলাম। তোমাদের আনন্দ মিছিল চলছিলো, মনে আছে তোমার?সবাই খুশিতে আত্মহারা ছিলো। সেদিন আমি তোমার মাঝে অন্য কিছু দেখেছিলাম। আমি কারো দিকে দেখিনি, নির্বাক হয়ে শুধু তোমাকে দেখেছিলাম। কেনো বলতে পারবে? আমিও জানি না কেনো। আজও সেই একই মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছি তোমার দিকে। তুমি কি আমাকে রোজ এভাবে মুগ্ধ হবার সূযোগ দিবে?

কি মনে হলো কাগজ দুমড়ে মুচড়ে ফেলে দিলো মৌমিতা। ছি কি করছে সে এটা! এভাবে কি কাউকে কখনও বলা যায়?

(চলবে…………)

৭১’এর ছবি
লিখেছেনঃ সাজিয়া আফরিন