মুক্তধারা

সংসারী থেকে বাবুর্চির আত্মকাহিনী

সংসারী থেকে বাবুর্চির আত্মকাহিনীঃ

শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্ট করে বাড়িটা মেরামত করা গেল। তোমার ব্যবসাটাও দাড় হল।এবার আমাদের সংসারের কষ্ট দূর হল। দুজন মিলে বাচ্চাদের নিয়ে বেশ ভালভাবেই দিন পার হবে।আর কোন কষ্ট থাকবে না গো। কথাগুলো বলতেই তুমি হেসে আমার গালে টোকা মেরে দিলে।তোমার চোখে মুখে কৃতজ্ঞতায় আর মুগ্ধতায় আমায় জড়িয়ে ধরলে। আমিও তোমার বুকে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলি।

আমাদের দুঃখের সংসারে দুঃখ বিদায় হয়ে সুখের আগমনে সংসার বেশ সুখেই কাটে। এ সুখের যেন কোন শেষ নেই।
তরিঘরি করে খাবার খাইয়ে স্বামীকে বিদায় দেই বাইরের কাজে। তারপর সংসারের কাজে মন দেই। বাচ্চাদের খাবার খাইয়ে বাড়িঘর গুছিয়ে আবার রান্নার তদারকি করি।

আহা সংসারে এত সুখ কেমনে। বেশ সুখে শান্তিতে দিন যায় আমার। কত কষ্ট দুঃখ অভাব অনটন জয় করে আজ সংসারে আমি সুখের মুখ দেখি যে।
অনেক তো কষ্ট করলাম। এবার বেশ সুখেই দিন যায়। কিন্তু এ সুখের সময়ে আমার স্বামী আর একটা বিয়ে করল কেন। আমি দুঃখ কষ্ট সহ্য করে সংসার দাড় করেছি। আর আজ আমার এই সংসারে স্বামী আরেকটা বিয়ে করল কেন।আমার দোষ কি? আমি কি করলাম? আমি কি দোষ করলাম?

সুখের মুখ দেখতেই স্বামী আমাকে ভুলে গেল কেন। আমি তো তাকে ভুলিনি। দুখেও ভুলিনি। সুখেও ভুলিনি।তাহলে আমার জায়গায় আরেক জনকে কেন।
রাগে ক্ষোভে অভিমানে তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে আসি।মানতে পারিনি। মানতে পারিনি।আমার সাথে বেঈমানি আমি মানতে পারিনি।
তাই চিরদিনের জন্য চলে এসেছি। কোনদিন তার কাছে ফিরে যাব না।কোনদিন না। আমার বুকে এত ব্যাথা দিল কেন।
আমি কি দোষ করেছি। সংসার গোছানোর পর সে আমাকে ভুলে গেল।আমার কথা সে কখনই ভাবল না।
চলে আসছি। আমি চলে আসছি।তাকে ত্যাগ করে আমি শান্তি পেয়েছি।
এই শান্তি নিয়েই বাকি পথ পাড়ি দিলাম।কিন্তু শান্তি পাই না কেন? মন সারাদিন খারাপ থাকে।

বাবুর্চির একটা চাকরী জোগাড় করলাম।কাজে মন দিলাম। কিন্তু রান্নাঘর তো মনে খুব কষ্ট দেয়। আমার তো একটা রান্নাঘর ছিল। সেখানে স্বামী সন্তানদের জন্য রান্না করতাম। থাকার একটা ঘর পেলাম রান্নাঘরের পাশে। ঘরটায় আমি একা ঘুমাই।সেখানে আমার স্বামী বা বাচ্চারা কেউ নাই।
বাচ্চাদের মায়ের কাছে রেখে এসেছি। তাদের দেখার জন্য মনটা খুব ছটফট করে।কিন্তু চাকরীর নিয়মে যে চলতে হয়।

স্বামীকে হাজার বার ভুলে যেতে চাই। তারপরও স্বামীর কথা মনে পরে।বিরহের গান গাই। মনকে কি জানি কি বুঝাই। তবে ফিরে যাওয়ার কথা ভুলেও ভাবি না। নাকফুল পরতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পরবো কেন? আমার তো স্বামী নাই।তাই নাকফুল আর পরি না।
ভালোবাসার কৃতজ্ঞতায় সে জড়িয়ে ধরতো আমায়।সেটা কি তবে অভিনয় ছিল মাঝে মাঝে ভাবি।মনে হয় অভিনয় ছিল।

শুনছি যে মহিলাকে বিয়ে করেছে।সে মহিলার বাড়ি নাকি বাড়ি থেকে সোজা সামনের রাস্তার ওপারে ছিল।স্বামী যখন বাড়ি থেকে বের হতো তখন নাকি তাদের চোখাচোখি হতো।মনে হয় বাইরে যাওয়ার আগে পেছন ফিরে আমার কাছে বিদায় নিয়ে সামনে ঐ বাড়ির দিকে তাকিয়ে মহিলার সাথে চোখে চোখে কথা বলতো।জানি না আর কি করতো।

তবে জানি দুঃখের দিনে আমাকে সঙ্গী করে সুখের দিনে আরেক জনকে সঙ্গী করেছে।আমি শুধু এটাই জানি।আর কিছু জানতেও চাই না।
প্রতিদিন এত কাঁদি কেন? এ কান্নার শেষ কবে? সে কি আমার রক্তে শিরা উপশিরায় প্রবেশ করেছে।তাহলে তাকে ভুলতে পারি না কেন? কেন তার কথা মনে করে গান গাই।

বউ মরে যাওয়া বা বউ ছেড়ে যাওয়া এমন লোকের বিয়ের প্রস্তাব আসে।কিন্তু বিয়েতে মন বসে না কেন?
সে যদি আমাকে ছেড়ে বিয়ে করতে পারে আমি পারি না কেন?
ছেলে মেয়েরা বড় হবে।তারা তাদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হবে।তাদের সুখ দুঃখ দেখেই বাকিটা জীবন পার করবো।
কিন্তু মনে মনে এত একা লাগে কেন? সবাই বলে সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।সত্যিই কি সব ঠিক হয়ে যাবে? আমি কি মনের সব কষ্ট ভুলে যেতে পারব?

লিখেছেন: জিলফিকা বেগম জুঁই