মুক্তধারা

অসুখের পর

ঠিক কখন যে অসুখটা শরীরে দানা বাঁধলো তা সঠিক বলতে পারবো না, তবে টানা জ্বরে পরার আগে মাঝে মাঝেই হালকা জ্বর আসতো। কিন্তু পাত্তা দিতাম না। আমার চিরকালই এসিতে সমস্যা হয় আর আমার ওয়ার্কপ্লেসে টেম্পারেচার সবসময় ১৭-১৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস। অতএব হালকা জ্বর হতেই পারে।

দুমাস আগে টানা তিনদিন জ্বরের পর চতুর্থদিন ভোরবেলা থেকেই কেমন যেন অস্থির লাগছিল। বার বার মনে হচ্ছিল কি যেন ঠিক নেই!!!
হঠাৎ করে জ্বর বাড়া শুরু হলো।
মা থার্মোমিটারের রিডিং দেখামাত্র ভাইয়াকে বলল,কিছু একটা কর?
ভাইয়া তার ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করলো, উনি ওষুধের নাম বললেন। তারপর তিনঘন্টা – ইতিমধ্যে ২বার ওরাল এবং ২ বার সাপোজিটারি দেয়া হয়ে গেছে,কিন্তু জ্বর কমার লক্ষণ নেই।

আমি অল্প অল্প করে বোধ হারাতে শুরু করেছি। একটা সময় পর বুঝতে পারলাম এরপর পুরোপুরি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবো। ঠিক তখনই আচমকা কতগুলো চিন্তা মাথায় এসে ভর করলো। ঠিক এরপরই যদি মরে যাই!!! তাহলে কি হবে!!!
হিসাব কসা শুরু হয়ে গেল মনে মনে। কিছু মানুষ কষ্ট পাবে,কিছু মানুষ আমার অভাব অনুভব করবে সবসময়,আর কিছু মানুষ চুপিচুপি আমার জন্য কাঁদবে – হয়তো। এই তো!!! আর কিছু?? নাহ আর কিছুইতো না। তাহলে?? তাহলে কিসের চিন্তা?? কোন জরুরি কিছু কি অসম্পূর্ণ রেখে যাচ্ছি ?? উহু তাও না।

তবুও কেন জানি মনে হচ্ছে অনেককিছু করার বাকি ছিল। কিন্তু সেই অনেককিছুটা কি??? ভাবতে ভাবতে নিয়ন্ত্রণ হারাতে লাগলাম। এরপর আবছা আবছা কিছু স্মৃতি মনে পরে। মা মাথায় পানি ঢালছে, পরে বাথরুমে নিয়ে ফ্রিজের ঠান্ডা পানিও গায়ে ঢাললো।
মা বোধহয় একবার প্রশ্ন করলো, “ঠান্ডা লাগে আম্মু??
“উত্তরের কি “না” বলেছিলাম?? মনে নেই।

জ্বর একটু কমার পর হাসপাতাল, স্যালাইন, টেস্ট এইসব শুরু হয়ে গেল। তাক্তাররা রোগটা প্রথমেই আঁচ করেছিল, কারন একই সময়ে ৪ জন রোগী একই উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ছিল।
হাসপাতালের দ্বিতীয় রাতে ডাঃ মুশতাক তার রোজকার ভিজিটে আসলেন, তবে আজ উনার চেহারা একটু অন্যরকম, কে জানে হয়তো রোগিকে তার অসুখ জানানোর আগে সব ডাক্তাররা এমন বোধ করেন।

উনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আফরিন, তোমার সেপ্টিসেমিয়া হয়েছে। আমরা এখনও জানি না তোমার কোনো ওর্গানে এফেক্ট হয়েছে কি না। You are a brave girl. কাল সকাল থেকে ট্রিটমেন্ট শুরু করে দিবো, বেশ একটু কষ্ট হবে, সহ্য করতে পারবে তো??”
আমি একপলক উনার দিকে তাকালাম আর বললাম, “হুম, ঠিক আছে।” উনি আমার ভাবলেশহীন উত্তরে অবাক হলেন না। এর আগের একবার উনি আমার মানসিক শক্তির প্রমাণ পেয়েছেন।

এরপর ট্রিটমেন্ট শুরু হলো – গাদা গাদা ওষুধ, ইনজেকশন, রোজ রোজ বিভিন্ন টেস্ট, প্রচুর খাবার – চলতেই থাকলো। একদম যে কষ্ট হয়নি তা বলবো না। বিশেষ করে রোজ এমপুলএ চারবার এন্টিবায়োটিক দেয়া হতো যা পুশ করার পর থেকে পুরো শরীর জ্বলতে শুরু করতো, মুখের ভেতরটা তেতো হয়ে যেত।
আমি অবশ্য চুপচাপই থাকতাম, কারন মাকে বুঝতে দেয়া যাবে না যে আমার কষ্ট হচ্ছে।

আমি আমার হাসপাতালের সময়টুকু নষ্ট করিনি। ওই সময় প্রচুর ভেবেছি। নিজেকে নিয়ে, আশেপাশের মানুষকে নিয়ে। ভাবনার ফলাফল স্বরূপ নিজেকে অনেকটুকুই জানতে পরেছি। অসুখ আর হাসপাতাল বেশ কিছু নিজস্ব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে।

প্রথমে, আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন কাজ কি??
উত্তর, আমার প্রিয়মুখগুলোর সামনে ভালো থাকার অভিনয় করা।ভাব দেখানো “আই এম ওকে, ফাইন।” আসলে ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট হচ্ছে আর সর্বোপরি ভয় হচ্ছে যে তারা যদি আমার খারাপ অবস্থা বুঝে ফেলে!!!

দ্বিতীয়, আমার সবচেয়ে বড় ভয় কি??
উত্তর, নিজের নিয়ন্ত্রণ হারানো। আমি ভয় পাই নিজের নিয়ন্ত্রণ আর কাউকে দিতে।

তৃতীয়, আমার কাছে সবচেয়ে কাঙ্খিত বস্তু কি??
আমার দৃষ্টি সীমানায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত প্রতিটি মানুষের হাসিমুখ। সত্যিকারের হাসি মুখ। কোনো হাসিমুখই আমাকে কখনো জ্বালা দেয় না। এমনকি আমার যারা শত্রু তাদের বিষন্ন মুখও আমাকে ভাবায়। তখন আর তাদের সাথে লড়াই করতে ইচ্ছা করে না।

চতুর্থ, মনের চাপা দেয়া কোন ইচ্ছাগুলো পূরন করিনি??
অনেক ভালোবাসি যাদের কখোনো মুখ ফুটে বলিনি। আবার আমাকে যারা অনেক ভালোবাসে তাদেরও কখোনো ধন্যবাদ বলিনি। ভালোবাসার ব্যাপার গুলো চাপা দিয়েই রেখেছি।

শেষ প্রশ্ন, জীবনের কাছে কি চাই?? এর উত্তর আগেও জানতাম। জীবনে থেমে যেতে চাই না। এমনকি মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেও আবার চলতে চাই।
এই গেল প্রশ্নের উত্তর, এছাড়া আরো কিছু জিনিস দিয়েছে খারাপ অসুখটা। তাদের নাম হচ্ছে উপলব্ধি।

যেহেতু সৃষ্টিকর্তা এবারও বাঁচিয়ে তুললেন তারমানে উঁনি আমার জন্য আরো বৃহৎ কোনো চমক নিয়ে অপেক্ষা করছেন। নিরাশ হবার কিছু নেই। Best thing comes in the end.
পরিশেষে এতটুকুই বলতে চাই, বেঁচে থাকার মতো দারুণ কিছু নেই। একটা কথাই মাথায় ঘোরে, “নিঃশ্বাস বন্ধ হলেই সব শেষ, তাই প্রতি নিঃশ্বাসে বেঁচে নিই, বাঁচার মতো বেঁচে নিই।”

“অসুখের পর”
লিখেছেনঃ আফরিন পারভেজ