'ও ডাক্তার'

পুষ্টি ও মুখের সুস্বাস্থ্য | ডাক্তারের পরামর্শ

মুখের সুস্বাস্থ্য বলতে মুখ ও দাঁতের সুস্থতা,ভালো থাকাকে বোঝায়। এটা সবার জানা যে যথাযথ মুখের পরিচ্ছন্নতা (Oral Hygiene) বজায় রাখা,সঠিক নিয়মে ব্রাশ করা ও নির্দিষ্ট সময় অন্তর একজন ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ নেয়ার মাধ্যমে মুখের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করা যায়। কিন্তু এটা কি সবাই জানি যে মুখের সুস্বাস্থ্যের সাথে সঠিক পুষ্টি ও জড়িত?
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা থেকে জানা যায় যে,পর্যাপ্ত পুষ্টি ও সঠিক খাদ্যাভাস নিশ্চিতের মাধ্যমে মুখ ও দাঁতকে ভালো রাখা সম্ভব। একাডেমি অফ নিউট্রেশন ও ডায়েটেটিক্স এর গবেষণায় দেখা গিয়েছে পুষ্টি,মুখের সুস্বাস্থ্যের অন্যতম একটি অংশ।মুখের সুস্থ্যতা বজায় রাখার জন্য ও রোগ প্রতিরোধের জন্য যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।

যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত না হলে কি কি সমস্যা হতে পারে?

১.মাড়ির রোগ:
ভিটামিন সি এর অভাবে মাড়ি ফোলা রোগ,মাড়ি থেকে রক্ত পড়া,মাড়ি দুর্বল হয়ে যাওয়া প্রভৃতি সমস্যা দেখা যেতে পারে।
লালায় অতিরিক্ত গ্লুকোজ এর উপস্থিতিতে মুখের পেরিওডোনশিয়াম ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে মাড়ি দূর্বল হয়ে যায়,দাঁতের সাথে মাড়ির সংযোগ দূর্বল হয়ে যায়,পকেট সৃষ্টি হয়, দাঁত নড়ে যায়। লালায় অতিরিক্ত গ্লুকোজ থাকলে সাধারণ দন্তক্ষয় থেকে মুখে ইনফেকশন হতে পারে।

২.দন্ত ক্ষয়:
যেসব বাচ্চা ফিডার দিয়ে খায়,তাদের ক্ষেত্রে বিশেষত যখন ঘুমের মধ্যে চিনিজাতীয় পানীয়,দুধ ইত্যাদি দেয়া হয়,এগুলো মুখে জমে থেকে বাচ্চাদের অস্থায়ী দাঁতের ক্ষয় করে,যা নার্সিং বোতল ক্যারিজ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে বাচ্চাদের মুখের পরিচ্ছন্নতা(ওরাল হাইজিন)ও নষ্ট হয়।যেসব বাচ্চা চকলেট,টফি,ললিপপ জাতীয় আঠালো ও চিনি জাতীয় খাবার গ্রহণ করে তাদের স্থায়ী/অস্থায়ী দাঁতের উপর এ জাতীয় খাবারের প্রলেপ পড়ে এবং দন্তক্ষয় হয়।
বড়দের ক্ষেত্রেও খাদ্যকণা, বিশেষ করে চিনি জাতীয় আঠালো খাদ্য দাঁতের উপর জমে প্ল্যাক তৈরি করে যা থেকে পরবর্তীতে দন্তক্ষয় (ডেন্টাল ক্যারিজ) হয়।

৩.চোয়াল সুগঠিত না হওয়া:
আমাদের চোয়ালের গঠন আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও কি রকম খাদ্য গ্রহণ করছি তার উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে,যারা নরম ও প্রসেসড (processed)খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত তাদের চোয়াল আকারে ছোটো হয়।
চোয়াল আকারে ছোটো হলে নির্দিষ্ট সংখ্যক দাঁত মুখে আসার জায়গা না পেয়ে আঁকাবাঁকা দাঁত,ইম্পেক্টেড দাঁত ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইদানিং বেশির ভাগ মানুষের আক্কেল দাঁত (Third Molar)উঠে না, ইম্পেক্টেড থাকে চোয়ালে পর্যাপ্ত জায়গা না পাওয়ায়।

৪.ঘা/আলসার:
যাদের খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণের পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার থাকে না,তাদের মুখে আলসার হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

৫.মুখের শুষ্কতা:
পর্যাপ্ত পরিমাণ পানির অভাব ও লালায় অতিরিক্ত গ্লুকোজের উপস্থিতি(ডায়েবেটিস রোগী) মুখকে শুষ্ক করে তোলে যা থেকে আবার মাড়ির রোগ,ঘা,দন্তক্ষয় প্রভৃতি দেখা যেতে পারে।

৬.দাঁতের এনামেল ক্ষয়,সেন্সিটিভিটি ও বিবর্ণতা:
অতিরিক্ত বোতলজাত কোমল পানীয় দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে, দাঁতের বিবর্ণতা করে এবং অনেকক্ষেত্রে দাঁতের শিরশির অনুভূতির সৃষ্টি করে।চা ও কফি জাতীয় খাবার দাঁতের বিবর্ণতা করে।

৭.মুখের জন্মগত ত্রুটি: গর্ভাবস্থায় ভিটামিন বি ও ফলিক এসিডের অভাবে বাচ্চাদের জন্মগত ত্রুটি- ঠোট কাটা ও তালু কাটা হতে পারে।

মুখের সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্যতালিকা যেমন হওয়া উচিত:

১.প্রচুর পরিমাণে পানি ও পানি জাতীয় খাদা গ্রহণ
২.চিনি জাতীয় খাবার ও টফি, চকলেট,ললিপপ জাতীয় আঠালো খাবার পরিহার করতে হবে
৩.খাদ্য তালিকায় সবুজ আঁশযুক্ত শাক-সবজী রাখতে হবে
৪.পর্যাপ্ত পরিমাণ ফল গ্রহণ করতে হবে। যেমন: লেবু, মাল্টা, কাচামরিচ জাতীয় খাবারে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে যা মাড়ির সুস্থ্যতা বজায় রাখে।
৫.প্রয়োজনের অতিরিক্ত নরম খাবার,টিনজাত প্রসেসড খাবার যতটা সম্ভব পরিহার করতে হবে।
৬.বার্গার, সেন্ডউইচ,চিকেনফ্রাই, ফ্রেঞ্চফ্রাই ইত্যাদি জানকফুড(Junk Food) পরিহার করতে হবে কেননা এ জাতীয় খাবার পুষ্টিগূন শূন্য।
৭.বোতলজাত কোমল পানীয় পরিহার করতে হবে
৮.দুধ চা এর পরিবর্তে গ্রিন টি পান এর অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
৯.গর্ভাবস্থার ৫-৬ সপ্তাহে বাচ্চাদের দাঁতের গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়।তাই এই সময় পর্যাপ্ত ভিটামিন এ, সি,ডি,ক্যালসিয়াম, ফসফোরাস গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

মুখের সুস্থ্যতার জন্য আর কি করণীয়:

শুধুমাত্র মুখের পরিচ্ছন্নতা কিংবা শুধুমাত্র পুষ্টি যথেষ্ট নয়।তাই মুখের সুস্থ্যতার জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির পাশাপাশি নিম্নোক্ত অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে:

১.নিয়মত সঠিক নিয়মে ব্রাশ করা
২.ফ্লসিং করা
৩.মুখের পরিচ্ছন্নতা যথাযথভাবে বজায় রাখা
৪.দাঁত বা মুখের যেকোনো সমস্যা দেখা দেওয়া মাত্রই একজন ডেন্টাল সার্জনের শরণাপন্ন হওয়া ৫.৬মাস অন্তর একজন ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ গ্রহণ করা।

পরামর্শ দিয়েছেনঃ  ডা:সাবরিনা ফরিদা চৌধুরী
বিডিএস,ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল। এম,পি,এইচ(এ.আই.ইউবি)