মুক্তধারা

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা কতটুকু সচেতন?

যৌন এবং প্রজনন শব্দ দুটি শুনলেই আমাদের মাথায় যে বিষয়টি চলে আসে তা হল-“এগুলো গোপন জিনিস,এই আস্তে কথা বলো, কেউ শুনে ফেলবে এসব কথা কি জোরে বলতে আছে?”এরকম নানান বিষয়। এই বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকবার গবেষণা কাজ করার সুযোগ হয়েছিলো বেশ কিছু ক্যাটাগরীর নারী এবং পুরুষের সাথে (বিবাহিত ও অবিবাহিত কিশোরী নারী,গার্মেন্টস কর্মী নারী ও পুরুষ) এরপর থেকেই আমার মাথায় একটি বিষয় কেবল ঘোরপাক খায় তা হলো আসলেই আমরা কতটুকু সচেতন বা কতটুকু জ্ঞান রাখি এই যৌন ও প্রজনন বিষয়ে। সেই ভাবনা এবং অভিজ্ঞতা থেকেই কিছু লেখার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য আসলেই কি জিনিস আমরা অনেকেই আছি যে এই বিষয়গুলো খোলসা করে জানিনা। তাই খুব সহজভাবে জেনে নেই এগুলো আসলে কি? যৌন স্বাস্থ্য হলো একজন নারী এবং পুরুষ তাদের উভয়ের মাঝে সহবাস বা সেক্সচুয়াল ইন্টারকোর্সের সময় যে অঙ্গগুলো (ব্রেস্ট,যৌনাঙ্গ) ব্যবহার করে এই অঙ্গগুলোর সুস্থতায় হলো যৌন স্বাস্থ্য। আর নারীরা তাদের সন্তান উৎপাদনে যে অঙ্গগুলো (ব্রেস্ট, যৌনাঙ্গ, পেট) ব্যবহার করে থাকে তার সুস্থতায় হলো প্রজনন স্বাস্থ্য।

আমার গবেষণা অভিজ্ঞতা বলে বেশিরভাগ নারীরাই তাদের এইসকল অঙ্গের সঠিক পরিচর্যা করেননা কিংবা পরিচর্যা করা প্রয়োজন এটি তারা মনে করেননা। গ্রাম্য নারী বলেন আর শহুরে নিম্নবিত্ত নারী বলেন তাদের সকলের মুখেই বলতে শুনেছি,”আপা,এগুলো তো শরমের কথা এগুলো কি কাউরে বলা যায়?” আর পুরুষরা তো এগুলোকে তাদের নিজেদের পৌরষত্বের হানিকর মনে করে চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন মনে করেন না। বরং গোপনে গোপনে কিছু কবিরাজি ঔষধ এবং গাছগাছড়ার ছাল এনে নিজে খান এবং বউকেও খাওয়ান সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন কিন্তু উলটো সমস্যা আরো বাড়ে। কিন্তু যখন সমস্যা প্রকট হয় তখন যান ডাক্তারের কাছে ততদিনে তা গড়ায় জরায়ু টিউমার,ক্যান্সার,ব্রেস্ট টিউমার,ক্যান্সার, ফিস্টুলা র মত নানান জটিল রোগে।

আমার গবেষণা অভিজ্ঞতা বলে কিছু সচেতনতা অবলম্বন করলে এধরনের রোগ হতে সহজেই রক্ষা পাওয়া যায়। কারণ যেকোন রোগের তা প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধ উত্তম বলে চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানে বলা হয়। কারণ প্রত্যেকটি রোগের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব থাকে আর এসকল বিষয়কে প্রতিরোধ করা গেলে রোগের পাদুর্ভাব অনেকাংশেই কমিয়ে আনা যায়। আমার গবেষণা অভিজ্ঞতা থেকে কিছু প্রতিরোধমূলক পরামর্শ হলোঃ

•বাল্যবিবাহের কারণে কমবয়সী মেয়ের সাথে অধিক বয়সী পুরুষের সহবাসের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, যৌনাঙ্গ ফুলে যাওয়া,ব্যথা হওয়া এসব হয়ে থাকে তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে হবে।

•আর যদি বাল্যবিবাহ হয়েই থাকে তাহলে লজ্জা না করে মা,শ্বাশুড়ি বা বয়জ্যেষ্ট কেউ বা এই বিষয়ে অভিজ্ঞ কাউকে মেয়েটিকে বুঝাতে হবে কিভাবে স্বামীর সাথে সহবাস করতে হয় বা সহবাসের নিয়মকানুন।এক্ষেত্রে স্বামীকে স্ত্রীর সাথে ঘন ঘন সহবাস থেকে বিরত থাকতে হবে।

•মাসিকের সময় নিরাপদ স্যানিটারী ন্যাপকিন ব্যবহার করা উত্তম। আর যদি মনে করেন বিশ্বায়নের পুঁজিবাদী স্রোতে গা ভাসাবেন না তাহলে ন্যাকড়া ব্যবহার করাই উত্তম। তবে এক্ষেত্রে সাবান এবং ডেটল দিয়ে পরিষ্কার করে কড়া রোদে শুকাতে হবে এবং শুষ্ক জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে। এমনকি তিন মাস পর পর তা পরিবর্তন করতে হবে। বলা বাহুল্য সঠিক নিয়ম ব্যবহার করে ন্যাকড়া ব্যবহার করা স্যানিটারী ন্যাপকিন এর চাইতে উত্তম।

•মা,খালা,মাসির কথা শুনে মাসিক চলাকালীন সময়ে মাছ,মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকবেননা। কথাটি বলছি কারণ আমার এক উত্তরদাতা বলেছিলো ,”মাসিকের সময় মাছ খেতে নাই তাহলে নাকি আঁশটে গন্ধ হয়।“ তাই বলা সমীচীন বলে মনে করছি।

•মাসিক চলাকালীন সময় তথা প্রত্যেকটি নারী এবং পুরুষের উচিৎ তাদের যৌনাঙ্গ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা। অনেকে এই জায়গাগুলো দেখা যায়না ভেবে এগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়না তাতেই নানান রোগ বাসা বাধে। যেমনঃ চুলকানি,ফুলে যাওয়া,ব্যাথা হওয়া প্রভৃতি।

•মাসিক চলাকালীন সময়ে স্বামীর সাথে সহবাস না করা। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেশিরভাগ নারীরাই এইসময় তার স্বামীর দ্বারা ধর্ষনের শিকার হোন। গবেষনাকালীন সময়ে বেশিরভাগ উত্তরদাতাকেই বলতে শোনা গেছে-“আপা,কি করমু,জোর করে,না দিলে কয় অন্য মাইয়ার কাছে যাইবো? পুরুষ মানুষ তাদের কি এত ধৈর্য আছে?” একই কথা গর্ভকালীন নারীদের জন্য ও প্রযোজ্য।

কিশোরী অবিবাহিত মেয়েদের অভিভাবকদের বলবো আপনারা আপনাদের মেয়েদের সাথে এসকল বিষয়ে খোলামেলা কথা বলুন। তাদেরকে জানান মাসিক কি, মাসিকের সময় কি করতে হয়,কিভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হয়। একইভাবে ছেলেদের তাদের বয়ঃসন্ধি কালের পরিবর্তনগুলো নিয়ে কথা বলুন। তাদের সাথে Sex নিয়ে কথা বলুন। Sex আসলে কি তাদেরকে জানান। তাতে করে আমার মনে হয় আপনার ছেলে সন্তানেরা এটিকে একটি দূর্লভ,লোভনীয় বিষয় মনে করে এটিকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে মেয়েদের পেছনে ছুটবেনা। এমনকি নারীদের প্রতি তাদের সম্মান বোধ বাড়বে তার পাশাপাশি নানান ধরণের অপরাধমূলক কর্মকান্ড যৌন নিপীড়ন,ধর্ষন এগুলো থেকে দূরে থাকবে। সমাজে এগুলোর দৌরাত্ব কিছুটা হলে ও কমে যাবে।

লিখেছেনঃ জিন্নাতুন নেছা
নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক