'ও ডাক্তার'

বিষন্নতা নিয়ে কথা বলি | ডাক্তারের পরামর্শ

আমি কি বিষন্ন?
বিষন্নতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রথম ই এই বিষয়টি মাথায় এলো!
খুব ছোটবেলাতে অসুস্থ হলে আব্বু তার ব্যাংক নির্ধারিত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেন। সেই আট বছর বয়সে প্রথম শেখা,”বিষন্নতা একটি রোগ”।বহু বছর লেগেছে বিষন্নতা নিয়ে লিখতে!

বিষন্নতাকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে আগ্রহহীনতা,প্রসন্নতার অভাব।বিষন্নতা যে ষ্টেজেই থাকুক না কেন এটা একটা মানসিক অসুস্থতা যা কিনা চিকিৎসাযোগ্য। কিন্তু বিষন্নতা থেকে যখন রোগী গভীর বিষন্নতা বা আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়,তখন তার জীবন ই হুমকির সম্মুখীন হয়।

বিষন্নতায় ভুগছে এমন রোগীদের জন্য সর্ব প্রথম জরুরী বোধ হয় রোগ নির্ধারন। রোগ নির্ধারনে সবথেকে জরুরী ভূমিকা পালন করতে পারে পরিবার।একজন মা,একজন বোন,একজন ভাই,সবথেকে গুরুত্বপূর্ন একজন স্বামী বা একজন স্ত্রী একটু যত্নশ,সহানুভূতিশীল হলে এবং একটু দায়িত্বশীল হলে খুব সহজেই তার সন্তান,ভাই,বোন বা জীবন সঙ্গীর বিষন্নতা ডিটেক্ট করতে পারবেন। এছাড়াও হোষ্টেলে রুম মেট,মেস মেট,কাছের বন্ধু,প্রেমিক-প্রেমিকা একটু আন্তরিক হলেই কাছের মানুষের বিষন্নতা আবিষ্কার করতে পারবেন।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বিষন্নতার কারন নির্ধারন। সেটা মুছে ফেলা এবং একি সাথে চিকিৎসক এবং সাইকোথেরাপিষ্টের সরনাপন্ন হওয়া। পারিবারিক অশান্তি,ঝগড়া,ঝামেলা,পরকীয়া!ব্রোকেন ফেমিলির বাচ্চারা বেশী এফেক্টেড।পক্ষান্তরে আন্তরিক এবং সৌহার্দপূর্ন পরিবারের বাচ্চারা প্রসন্ন হয়। ঘুষ,দুর্নীতি,মাদক,পরকীয়া,ডিভোর্স,অনিয়ন্ত্রিত তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার,নিয়ন্ত্রনহীন ব্যবসায়িক মুনাফা-এ সবকিছু সমাজে ভারসাম্যহীনতা তৈরী করে। তা থেকে হতাশা এবং বিষন্নতা!

আমার বেশ মনে আছে। ডাক্তারী পাস করার বছর তিনেক পর আমার এক বান্ধবীর বাবা খুব বিষন্ন হলেন তার এক পরিচিতের বাড়ীতে গিয়ে।কারন আমার বান্ধবীর স্কুলে একেবারেই শেষের দিকের ছাত্র ছিল ঐ ভদ্রলোকের ছেলে।আমার বান্ধবী যখন একটা হাসপাতালে ডিউটি ডক্টর,নেগলিজেবল আর্ন,তখন ঐ পরিচিতের ছেলে পুলিশের এস আই। এস আই এর বাবা আমার বান্ধবীর বাবাকে বলেছিলেন।আমার ছেলে তো মুঠি ভরে টাকা দেয় আমাকে।গুনে দেয় না।
মেধা,শিক্ষা এবং পরিশ্রমের সাথে আয়ের সামঞ্জস্যহীনতা এই সমাজে বিষন্নতার প্রধান কারন।
আর এটা দূরীকরনে ঘুষ,দুর্নীতি,অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসার বিপক্ষে এবং পেশাজীবীদের পক্ষে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।সরকারকে সমস্যা সমাধানে বাধ্য হতে হবে।

পারিবারিক সুখ শান্তি রক্ষার্থে প্রতিটি স্বামী স্ত্রীকে সচেতন হতে হবে। আজকাল বেশ কিছু স্বার্থান্বেষী মা বাবা পরিবারে থাকেন,যারা পরিবারের মেধাবী বা অর্থনৈতিক স্বচ্ছল ছেলে বা মেয়েটিকে সন্তান কম আর যন্ত্র বেশী ভাবেন। তারা তাদের নিজের,পরিবারের এবং অন্য সন্তানদের ভোগ বিলাসের জন্য সন্তানের মাতৃভক্তিকে কাজে লাগান। এবং একটা সময়ে দেখা যায় পরিবারের সব সদস্যদের হয়ত মা ঠিক ই খুশি করলেন ততদিনে নানা প্রকার ছল চাতুরী করে তিনি তার বড় চাকুরে আর স্বচ্ছল ছেলে বা মেয়েটির সংসার ই ভেঙ্গে দিলেন।
আপনি মা।আপনার ছেলে মেয়েদের ভালো করতে গিয়ে আপনার সবথেকে সরল আর আপনার অনুগত সন্তানটির সন্তানদের করে দিলেন ব্রোকেন ফেমিলি বেবী।
আবার বিপরীত ভাবে সুদীর্ঘ জীবন পরিশ্রমের পর বৃদ্ধ পিতা মাতা যখন ছেলে মেয়ে নাতি নাতনীদের কাছ থেকে একটু আদর,যত্ন,ভালোবাসা,স্বচ্ছলতা পেতে অক্ষম হয়,প্রাচীন মনে বিষন্নতা দানা বাঁধে!

পরিবার এবং সমাজের পাশাপাশি এই তথ্য প্রযুক্তির দুর্বার রথে চড়া পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে।তোমার মন,তোমার শরীর তোমার সম্পদ। এর পরিচর্যা করে নিজেকে মূল্যবান করে তোল।নিজেকে শ্রদ্ধা করতে শিখো।অপাত্রে ভালোবাসা দান করো না।আর যদি করেও ফেলো,নিজের স্বত্তা,আত্মসম্মানকে জলাঞ্জলি দিয়ে নয়।
যে পুরুষ তোমাকে নয়,তোমার বাবার টাকাকে ভালোবাসে!যে ছেলে তোমাকে নয় তোমার শরীরকে ভোগ করে!যে ছেলে তোমাকে নয় তোমার আনুগত্যকে উপভোগ করে!আর তুমি মানুষের মর্যাদা চাইলে তোমাকে অসম্মান করে,তুচ্ছ করে তার জন্য কেন বিষন্ন হবে???

যে নারী তোমাকে না তোমার বাবার সম্পত্তিকে ভালোবাসে!যে মেয়ে তোমাকে না তোমার খ্যাতিকে উপভোগ করে!যে মেয়ে তোমাকে ভালোবাসে না,ব্যবহার করে!নিজের বাপের ভাইয়ের ক্ষমতা বলে তোমাকে গোলাম ভাবে,তার জন্য কেন বিষন্ন হবে???

সময় এসেছে বিষন্নতা নিয়ে ভাববার।কথা বলবার।সময় এসেছে একটি ভালোবাসাময়,স্নেহময়,প্রসন্ন সমাজ গড়ার,যেখানে সব শিশু,সব তরুন তরুনী,সব বৃদ্ধ বৃদ্ধা খুশিতে হাসবে।বিষন্নতা নামক শব্দটিকে আমরা ঠাঁই দিব আস্তাকূঁড়ে।

লিখেছেনঃ ডা.শিরীন সাবিহ তন্বী