রঙ বাক্স

ফারাও দেবতাদের সাজসজ্জা | মিশরীয় মেকাপ ইতিহাস

মিশরীয়রা বা ফারাও ‘রা ছিলেন আধুনিক মেকাপ সামগ্রীর আবিষ্কারক। মিশরীয় নারী পুরুষ উভয়ই তাদের মুখে মেকাপ ব্যবহার করতেন। “ফারাও” রা নিজেদেরকে ক্ষমতাধর দেব-দেবী বলে মনে করতেন তাই তারা তাদের মুখে নানা রকম নকশা আঁকাতেন যেগুলো তারা পবিত্র আত্মার প্রতীক অথবা বিশেষ ক্ষমতার প্রতীক বলে মনে করতেন। এছাড়াও সাধারণ জনগণ এবং পুরোহিতরাও মুখে নানা রকম মেকাপ ব্যবহার করতেন।

ফারাও”রা নিজেদের দেবতা মনে করার কারণে তাদের মেকাপের উপকরণগুলো ছিল একেবারেই অন্যরকম এবং অন্যদের থেকে আলাদা।সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হল ১০০০ হাজার বছর আগে মিশরীয়রা মেকাপ শুধু ব্যবহার না, তারা আধুনিক মেকাপ নিয়ে রীতিমত গবেষণা করে গিয়েছেন এবং এখন অব্দি তাদের আবিষ্কৃত ফর্মুলা থেকেই মেকাপ সামগ্রী বানানো হচ্ছে।

প্রাচীন মিশরীয়দের মেকাপের মধ্যে প্রচলিত ছিল Malachite একধরনের সবুজ খনিজ পদার্থ যা দিয়ে তারা চোখের উপরে এবং নিচে রেখা টানতেন, কয়লা দিয়ে কালো রঙের সৃষ্টি করা হত এবং Red ocher এক ধরনের লাল মাটি যা ঠোঁটে ব্যবহার করতেন এবং পরিশেষে হেনা বা মেহেন্দি যা দিয়ে হাতে এবং পায়ের আঙ্গুল রাঙ্গাতেন। এই সামগ্রীগুলো সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ফারাও’রাও ব্যবহার করতেন।

ফারাওগণ শুধু মেকাপ না সেগুলো ব্যবহারের জন্য মেকাপ ব্রাশ পর্যন্ত আবিষ্কার করেন, salvadorapersica নামের একটি গাছ থেকে তারা মেকাপের জন্য চিকন এবং মোটা তুলি ব্যবহার করেন তারা এবং কি টুথব্রাশের আবিষ্কারকও তারা। টুথব্রাশ দিয়ে ভ্রু আঁকাতেন ফারাওরা। এছাড়াও চোখের পাতা এবং চোখের উপরে রঙ ব্যবহার করার জন্যেও তারা ভিন্ন ব্রাশ বা তুলি ব্যবহার করতেন উলেখ্যযোগ্য যে এই তুলি বা ব্রাশ ব্যবহার করে যাতে ত্বকে এবং মুখের চামড়ায় কোন রোগ না হয় সেই জন্য ব্যবহারের পরই তা বিশুদ্ধিকরণ করা হত। তারা চুলের জন্য আলাদা রঙ ব্যবহার করতেন এবং সেই রঙগুলো এমন ভাবে তৈরি করা হত যাতে মরুভূমির ভারি দানার বালি চুলে লাগলেও তা আপনা থেকেই ঝরে যেত এবং রঙগুলো মাথায় কোন প্রকারের ব্যক্টেরিয়া ও ইনফেকশন সৃষ্টি যাতে না করে সেইভাবে তৈরি করা হত।

চন্দন এবং চক ব্যবহার করা হত শরীরে নানারকম নকশার জন্য। নানারকম খনিজ/ ভেষজ তেল ব্যবহার করতেন ফারাওরা শরীরে, এছাড়াও বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে লোশন বানাতেন তারা ছেলেরা যেসব লোশন ব্যবহার করতেন তা দিয়ে রোদে পুরা যাওয়া চামড়া ঠিক হত এবং ত্বক মোলায়েম থাকত আর মেয়েরা যেসব লোশন ব্যবহার করতেন তা দিয়ে হাত এবং পায়ের লোম উঠা বন্ধ করা হত এবং গায়ের ফাটা দাগ কমানো হত। চুল পরা বন্ধের জন্য তারা অনেক রকমের তেল ব্যবহার করতেন। মিশরীয়রা অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিলেন তারা গোসলের জন্য কাঁদা এবং ছাই দিয়ে তৈরি সাবান ব্যবহার করতেন যা ত্বক শুধু পরিষ্কার না ফর্সাও করত। চোখের উপরে এবং গালে নকশা করার জন্য তারা যে সকল পাওডার রঙ ব্যবহার করত তা প্রাণীর চর্বির সাথে মিশ্রিত করে এরপরে গালে এবং চোখের উপরের অংশে লাগাত যার ফলে কোন প্রকারের ব্যক্টেরিয়া জনিত রোগ হত না।

সবথেকে বিলাসবহুল ছিল সুগন্ধি ব্যবহার ফারাওরা প্রাণী দেহের ফ্যাট ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বয়েল করতেন এবং এর মধ্যে সুগন্ধির জন্য ফল , ফুল , পাতা , চন্দন ইত্যাদি ব্যবহার করতেন এরপর এইটাকে বিভিন্ন ছাঁচে ফেলে গোল, তিনকোনা অন্যান্য আকার দেয়া হত ব্যবহারের জন্য। আরেকটা পদ্ধতি ছিল ফুল এবং ফল প্রাণীর চর্বির মধ্যে ভিজিয়ে রাখা হত এরপর তা পমেডের মত করে ব্যবহার করা হত। সুগন্ধি যাতে বাতাসের সংস্পর্শে এসে চলে না যায় সেই জন্য জলপাইয়ের তেল বাদামের তেল এসব ব্যবহার করা হত। পরচুলার ব্যবহারও প্রথম আবিষ্কার করেন এই মিশরীয়রা , ফারাও নারীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই পরচুলা ব্যবহার করতেন। ফারাওরা তাদের এই মেকাপ উপকরণ সংরক্ষণ করতেন পাথর বসানো সুন্দর খোদাইকৃত বাক্সে এবং মৃত্যুর পর তাদের দাফনের সাথে এই মেকাপ সামগ্রীগুলো দিয়ে দেওয়া হত।

ফারাওরা মেকাপ ব্যবহারকে তাদের ধর্মের সাথে এক করে ফেলেছিলেন যার কারণে মেকাপ এবং মেকাপের ব্যবহার নিয়ে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত কিছু আবিষ্কার হয়েছে তার সবটুকু মিশরীয়দের কাছ থেকেই পাওয়া।

সুত্রঃ “Egyptian Make Up”
লিখেছেনঃ আনিকা সাবা