ইচ্ছেঘুড়ি

“কালকা থেকে সিমলা”

আমাদের দেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি সুন্দর দেশটির নাম ভারত।
একই সময়ে ভারতের এক একটা প্রদেশে এক এক রকম আবহাওয়া বিরাজ করে। সেপ্টেম্বরের শেষে আমি এবং আমার বন্ধু পরিবার ছয় সদস্য নিয়ে ভারত ভ্রমনে যাই। সেই সময়টায় কোথাও ৪৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা তো কোথাও ০৫ ডিগ্রি। কোথাও গরমে অস্থির তো কোথাও শীতের কাপন। আমরা শুরুতেই হিমাচল প্রদেশে যাত্রা শুরু করি।
ঢাকা থেকে মৈত্রি ট্রেনে করে কলকাতা, কলকাতা থেকে রাজধানি এক্সপ্রেস করে দিল্লী, দিল্লী থেকে কালকা শতাব্দী করে কালকা, তারপর শুরু হয় কালকা টু সিমলা টয় ট্রেন যাত্রা।
টয় ট্রেন তার নামের মতই একটা ছোট্ট ট্রেন। ১৬ কামরার এই ট্রেনে এক একটা কামরায় ৪০ জন করে যাত্রি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে শিশুপার্কের রঙিন কোনো ট্রেনে চড়েছি। সকাল ১১.২০ “কলকা” স্টেশন থেকে সীমলার উদ্দেশ্যে ট্রেনটি যাত্রা শুরু করে। পাঁচ ঘন্টার রাস্তা।
কামরার সকলের সাথেই আমাদের হায় হ্যালো হলো। সকলের মধ্যেই সকলের প্রতি বেশ আন্তরিকতা এবং সৌজন্যতাবোধ দেখতে পেলাম। কামরার যাত্রীদের মধ্যে শুধুমাত্র আমরা ছয়জন বাঙালি । আমাদের ছয়জনের চারজন ডাক্তার, একজন অভিনেত্রী আর আমি ভবঘুরে। তবে এ ভ্রমনে আমার থেকে আমার সাথের পাঁচজনের মধ্যে ভবঘুরের উদ্দীপনা বেশি দেখতে পাচ্ছি।

দরামপুর এসেই প্রথম ধাক্কাটা খেলাম। সমতল ভুমি থেকে প্রায় ৪০০০ ফুট উপরে হঠাৎ টানেলের অন্ধকারে কিছু বুঝে উঠার আগেই ট্রেনসহ আমরা তলিয়ে গেলাম। এক পলকে চোখের সামনের দৃশ্যগুলি সব বদলে গেল। আমরা চিৎকার করতে থাকি ভয় মিশ্রিত আনন্দে। প্রতিটি টানেলেই আমরা সবাই সমস্বরে চিৎকার করে আনন্দ প্রকাশ করছিলাম। জানালায় দাড়িয়ে মুখ বের করে বাইরে দেখছিলাম। যেন প্রত্যেকেই আমরা এক একটা দুষ্ট শিশু। কখনও হাত দিয়ে টানেল এ ঝর্নার পানি স্পর্শ করছিলাম। এসব মজার ফাঁকে একটা সাপ আমাদের পাশের জানলায় আচড়ে পড়ে। ট্রেনের গতি আর বাতাসের ধাক্কায় সাপটি উড়ে গিয়ে আরেক জানলায় পড়ে। টানেল এর আলো আধারিতে এই দৃশ্য শুধু ভিতি সঞ্চার করেনি রীতিমত স্তব্দ করে দিয়েছেল কিছুটা সময়। এর পর থেকে ভয়ে ভয়ে অস্থির অবস্থায় টানেল আসলেই আমরা জানালা বন্ধ করে লাইট অন করি।
এর আগের সব কটা ট্রেন জার্নিতে ট্রেনেই আমাদের খাবার ব্যবস্থা ছিল। এই ট্রেনে খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই। এ খবর শোনার সাথেই পেটের মধ্যে খাপটি মারা ক্ষুধা চো চো করতে লাগল।

প্রায় দুপুর দুটার দিকে ট্রেনটি সোহাগী স্টেশনে এসে থামল। আমাদের মধ্য থেকে ডাঃ আদিত্য এবং ডাঃ রয় দুজন খাবার কিনে আনতে ট্রেন থেকে নামলেন। দুই মিনিটের মধ্যেই ট্রেনটি ছেড়ে দিল। পাহাড়ি রাস্তায় ট্রেন ছুঁটে চলছে দ্রুত গতিতে সাথে বাড়ছে আমার ভয় আর উৎকন্ঠা। কারন তাদের দুজনকে দেখতে পাচ্ছি না। নেটওয়ার্ক না থাকায় আদিত্যকে ফোন দিতে পারছি না। তারা কি ট্রেনে উঠতে পেরেছে ? টেনশন করতে করতে আমাদের সে কি এক অস্বস্তিকর অবস্থা।
পরের স্টেশনের নাম টারাদেবি। ট্রেনটি স্টেশনে থামতেই আমি দৌড়ে দরজা খুলে দাড়াই, দেখি সামনের বগি থেকে আদিত্য নেমে আসছে। ওউফফ্। মনে হল দম বন্ধ করা নিঃশ্বাসটা বেরিয়ে এল।

পাহাড়ি উঁচুনিচু ঢালু বেয়ে বেয়ে আমাদের ট্রেনটি বিকাল ৫টায় সিমলা স্টেশনে এসে পৌছায়। আমরা ট্রেন থেকে নামতেই একপাল বানর আমাদের ওয়েলকাম জানাতে এগিয়ে আসে। এ ট্রেনস্টেশন থেকে প্রায় বিশ মিনিটের রাস্তা পায়ে হেটে পাহাড়ের উপর উঠতে হয়। সেখান থেকে জিপে করে হোটেলে যেতে হয়। আমরা স্টেশন থেকে পাহাড়ের উপর হেটে উঠছি, আমাদের আগে পিছে বানরগুলোও উঠছে। যেন বানরগুলো আমাদের পোষমানা। যদি বানরগুলো আঁচড়ে কামড়ে দেয়, সে ভয়ে ডাঃ মিসেস আদিত্য আমার হাত ধরে ভয়ে ভয়ে এগুচ্ছেন।
মলরোডে যাওয়ার জন্য একটা জীপ ডাকা হল। জিপ পাশে আসতেই আমরা তড়িঘড়ি করে জিপের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বানরগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটছে। ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলাম বানরগুলো ক্ষতিকর নয়।
মল রোডে নেমেই ডাঃ আদিত্য এবং ডাঃ রয় দুজন ছুটলেন হোটেলের খোঁজে। আমরা চারজন রাস্তার পাশে লাগেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশটা চোখ ঘুরিয়ে দেখি আমাদের মতই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল আকারের উচু উচু পাহাড়। কোথাও ঘন বন, বড় বড় গাছ, কোথাও বিশাল বিশাল ক্যাকটাস পাহাড়কে আগলে রাখছে। পাহাড়ের খাড়া ঢালু বেয়ে ঝুলছে মোটা মোটা লতা আর বড় বড় পাতার ঝাঁকড়া। সবুজের মায়া চোখে শীতল অনুভুতির ছোয়া দিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে দশ বারটা বানর আমাদের ঘিরে ধরেছে আমি বুঝতে পারলাম ঘটনাটা কি। তাই তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে কলা রুটিগুলি আমাদের উল্টোপাশের রাস্তায় ছুড়ে দেই। ক্ষুধার্ত বানরগুলি সেই ছুড়ে মারা খাবার গুলো নিয়ে কাড়াকাড়ি মারামারি বাঁধিয়ে দিল। আমরা ভয়ে ওদের দিকে না তাকিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমাদের অপেক্ষা যেনো কিছুতেই শেষ হচ্ছে না।
প্রায় সন্ধ্যা ৭টার সময় আমরা হোটেলে উঠলাম । হোটেলের নাম ‘হোয়াইট হল’। হোটেলে ঢোকার সময় একটা এডভ্যাঞ্চার হল। হোটেলের প্রবেশপথ গুহার ভেতর দিয়ে। গুহার ভিতর যে এত সুন্দর দৃশ্যপট আর আলোর খেলা থাকতে পারে সেটা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করানো যাবেনা। হোটেলের পরিবেশ দেখে সারাদিনের ক্লান্তি নিমিষে দূর হয়ে গেল। রুমের জানালা দিয়ে মেঘ এসে রুমে ঢুকছে। সোডিয়াম আলোয় মেঘগুলো ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা দেখাচ্ছে। শীতের কাঁপন অনুভব করি। তাই বাধ্য হয়েই জানালাটা বন্ধ করে দিতে হয়।

ভোরে ঘুমভাঙ্গতেই প্রথমে জানালা খুললাম। জানালা খুলেই স্বপ্নের মতন বাস্তবতা দেখতে পেলাম। ভোরের লাল শিশু সূর্যটা আদুরে আভা বুলিয়ে পাহাড়ের ঘুম ভাঙ্গাচ্ছে। এক পাশে হালকা সোনালী আভা আরেক পাশে তার ছায়া। এত সুন্দর, এত মনোরম দৃশ্য! যত দেখছি বিধাতার প্রতি শ্রদ্ধায় চোখ নত হয়ে আসছে। দেরি না করে আমরা দ্রুত হোটেল থেকে বেরিয়ে মল রোডে এসে দাড়াই। সেই সকাল আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সকাল। মল রোডে দাড়িয়ে মনে হচ্চে মেঘের উপরের সূর্যটা পাহাড়ের বুক চিরে উঠে আসছে। আমি সন্তান জন্মদানের কষ্ট দেখেছি। পাহাড়ের বুক চিরে সুর্যের বেরিয়ে আসাটা তেমনই সুখকর কষ্ট। পাহাড়ের এক পাশে ঝকঝকে আলোর ঝিমিল আরেক পাশ গাড় ছায়াময় অন্ধকার হয়ে গেলো।
বিড়ালা মন্দির দেখা শেষে কুফরি যেতে চোখে পড়ল মানুষের একটি নিষ্ঠুর কৌশল। ঘোড়ায় চড়ে বিড়ালা মন্দির থেকে কুফরি যেতে ৩০ মিনিটের রাস্তা। ঘোড়াকে দ্রুত হাটাবার কৌশল হিসেবে ঘোড়ার পায়ের নিচে খুর চেছে সেখানে তারকাঁটা ডুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাতে কেউ ঘোড়ার পিঠে চড়লে সেই ভার এ ব্যথা পেয়ে দ্রুত হাটতে পারে। কৌশলটি আমার কাছে এতটা পীড়াদায়ক লাগল যে ঘোড়ায় চড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম। বাহন হিসেবে জীপকেই বেছে নিলাম।
সবচেয়ে বেশী মজা পেয়েছি গ্রেনভেলি যাবার পথে। কিছুটা পথ এগুতেই মেঘ এসে আমাদের পথ ঢেকে দেয়। আমরা গাড়ির গ্লাস খুলে হাতে মেঘ ধরার খেলায় মেতে উঠি। গাড়ির ভিতরে মেঘ ডুকছে। কি যে মজার সেই দৃশ্য!

আমরা গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার উপর ভাসতে থাকা মেঘ দু’হাতে সরিয়ে হেটে চলি। ২০ মিনিট হাটাতেই গ্রীনবেলিতে পৌছাই। সে যে কি মোহমায়া নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিনা, ঠিক দেখছি তো? প্রকৃতির এত রূপ এত ঐশর্য্য! মনে হচ্ছে আমি যদি সামার হীলের ঐ পাহাড়টা হতাম! কিংবা ঝর্ণা হতাম কি মজাই না হতো। এই সৌন্দর্যের একটা অংশ হতে পারতাম। ভাবুক আমি ভাবতে ভাবতে কখন যে দল ছেড়ে অন্য জগৎ এ হারিয়ে গেলাম বুঝতে পারিনি।
পথ খুজতে খুজতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল। আবছা রঙিন আলোর মধ্য দিয়ে দুচোখে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিস্ময় নিয়ে কখন যে গ্রীনবেলির কিনারায় চলে এলাম বুঝতে পারিনি ।
আর এক পা পিছালেই কয়েক হাজার ফুট নিচে পড়ে যেতাম। তার আগেই পাহারারত এক পুলিশ এসে আমার হাত ধরে টেনে সরিয়ে নেয়। আমার ভেতরে তখন বেঁচে যাওয়ার প্রবল আনন্দ। তবে লজ্জাও লাগচ্ছিলো। পুলিশের কথা শুনে স্বস্তি পেলাম। এখানের রুপে বিমোহিত হয়ে আমার মত অনেকেই এমন কান্ড করেছেন। অনেকে পড়েও গিয়েছে। মরেও গিয়েছেন। অনাকাঙ্ক্ষিত এমন দুর্ঘটনা রোধে এখানে পুলিশে পাহারা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশটি আমার গাড়ি খুজতে সাহায্য করে। দলছুট আমিকে খুঁজতে খুঁজতে ততক্ষণে বহু কান্ড ঘটে গেছে। অবশেষে পথ হারানো আমি পথ পেলাম। পেলাম সঙ্গী সাথী। অতঃপর ধাবায় বসে আমরা সবাই খেতে বসলাম। খেতে খেতে আমার পথ ভুলে যাওয়া আর নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বেঁচে যাওয়ার ঘটনা বললাম। শোনে সবাইর চোখ ছানাবড়া। সবারই এক কথা ।একা একা কোথাও যাওয়া যাবে না। আমার একা চলাটা নিষিদ্ধ করা হল।

প্রকৃতিকে বাধ দিয়ে বেঁধে হয়ত রাখা যায়, থামিয়ে দেয়া যায় না। ভোরের আলো ফোঁটার আগেই হোটেল থেকে একা বেরিয়ে পড়ি। মল রোডের মেয়রের বাড়ি এবং এর আসে পাশে পাহাড়ে পাহাড়ে উচ্ছল পাহাড়িকন্যা হয়ে ঘুরলাম। প্রকৃতির সৌন্দর্যের লীলাখেলায় একাকি দুই ঘন্টা কাটিয়ে রুমে ফিরলাম।
এখন শহুরে ব্যস্ত জীবনের ফাঁকফোকরে “কালকা থেকে সিমলা” ভ্রমনটা ঘুরেফিরে আসে। এখন ক্লান্তি চোখে ভেসে উঠে লাল শিশু সুর্য্যের আভামাখা মেঘমালা আর তার ভেতরে আমি এক পাহাড়িকন্যা। মুঠোমুঠো মেঘ উড়িয়ে পাহাড় বেয়ে উঠছি, পাহাড় গড়িয়ে নামছি। সবুজ লতাপাতায় আমাকেও পাহাড়ের মত পরম মমতায় আঁকড়ে আছে প্রকৃতি।
সিমলার দর্শনীয় স্থানগুলিঃ
(1)Indian Institute of Advance Study. (2)Tara Devi Temple. (3)Shimla Christ Church. (4)Shimla Glen. (5)Naldehra Golf Course. (6)Summer Hill. (7)Green Valley. (8)Baragaon. (9)Grave of Barog. (10)Birala Mandir. (11)Kufri.

লিখেছেনঃ রূপকথা রুবি

( হুতুমপেঁচা শুধুমাত্র মেয়েদের ম্যাগাজিন, আমাদের কাছে লেখা পাঠাতে হলে আপনার লেখা এবং ছবি আমাদের ফেইসবুক পেইজ হুতুমপেঁচা ম্যাগাজিন ইনবক্স করুন, এছাড়াও লেখা সংক্রান্ত আপনার মূল্যবান মতামত এবং পরামর্শ আমাদেরকে কমেন্ট করে জানান। হুতুমপেঁচা-র সাথেই থাকুন।)