অনুরণন

নিলেশের অপেক্ষার পরিশেষ

নিলেশের (ছদ্মনাম) ডাকনাম নীল। জন্মের পর থেকেই একাসাথে বড় হয়ে উঠা আমাদের। সিল্কি চুলের ছেলেটা আজ পাঁচ বছর পর বড় অচেনা ঠেকছে। গত কয়টা বছর হয়তো অনেক কান্নাভেজা বিনিদ্র রাত কাটিয়েছি, কিন্তু চুলগুলোর বাতাসের ছটায় খেলে বেড়ানো ভুলতে পারি নি। বড় ম্লান হয়ে গেছে সেদিনের সেই মুখ, সেই চোখ, সেই চুল। শত পাঁকা চুলের বাহারে যেন বয়সটা পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশে গিয়ে ঠেকেছে।

তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে পড়াশোনায় আগ্রহ নিম্ম পর্যায়ে থাকার কারনে স্কুলের গন্ডি পাড় হতে পারি নি। পারিবারিক কারনে ক্লাস সিক্সে শিখে ফেলা সেলাইটা পেশা হিসেবে নিতে তখন বড় প্রয়োজন হয়ে গিয়েছিল নিলেশের জন্য। চোখের সামনে রাখার জন্য সেলাই মেশিনের স্থান হয়েছিল নিলেশের পড়ার টেবিলের সামনেই। কিন্তু সেলাই মেশিনের শব্দে পড়াশুনায় সমস্যা হওয়ায় মেশিনের স্থান অন্যদিকে নিতে হলো। তাকে বার বার দেখার সাধ সংবরণ করে গরমকে উপেক্ষা করেই সেলাইয়ে মনযোগী হতাম দরজাটা ব্ন্ধ করে দিয়ে। যার জন্য এতো কিছু তার পড়াটাই যদি না হল তাহলে এই কষ্টের মানেটা কি? মাথায় থাকতো তার হাত খরচের চিন্তা। আবার কখনও এমন হতো অর্ডারটা যদি শেষ করে কালকের মধ্যে টাকাটা হাতে না আসে ফরম ফিলাপের টাকাটা তবে জমা দেয়া হবে না নিলেশের। হয়তো অনেক অনুরোধ করে নীল পরীক্ষা দিতে পারতো। কিন্তু তার পিছের সময়টা যা সে পড়াতে দিত তা হয়তো হতো না।

নিলেশের পরীক্ষার ফল বরাবরই ভাল ছিল। তার মেধা তাকে সুদূর দক্ষিণ কোরিয়া যাবার সুযোগ এনে দিল। প্রথমবারের মত নিলেশকে হারাবার ভয় কাতর করে তুলেছিল। নিলেশের বিদেশ যাওয়াটা যেন বন্ধ হয়ে যায় দোয়া করতে থাকলাম। প্রথমবারে সৃষ্টিকর্তা আমার মনের ইচ্ছা পুরণ করলেন। সেদিন রাতে নিলেশের মন খারাপ থাকলেও আমি ছিলাম খুশি। তা প্রকাশ করা যেত না। তাই দুজন মিলে আবার সমস্ত কাগজগুলো গুছিয়ে দিলাম। বার বার মন চাইছিল নিলেশকে আটকাই। কিন্তু মনের কথা ঠোঁটে আনার সাহস জোগাতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। যাবার আগে শুধু নিজের সঞ্চিত পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলে দিলাম।

নিলেশহীন সময়গুলো তখন একেবারে রঙহীন হয়ে পড়েছিল। একেকটি দিন যেন একেকটি বছর। রাত ঘুমহীন, চোখের নীচে কালি আর মন ভরা উৎকন্ঠা। প্রায় ছয়মাস অতিবাহিত হলেও নীলের সাথে কথা হয়নি।
মা বাবা বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলার সময়টাতে পাশে নিশ্চুপ হয়ে বসে শুনতাম কি বলছে। সবাই ব্যপারটা বুঝলেও কিছু বলতো না। একসময় ছোট ভাইটি বলা শুরু করলো, “আপু কার জন্য তুই বসে আছিস? দেখলি তো নিলেশ ভাই একবারের জন্যও তোর সাথে কথা বলতে চায়নি।” ভাইকে মিথ্যা বুঝিয়ে নিজেকেও ভুল বুঝিয়ে কেটে গেল আরো তিন মাস।
নয় মাস পর ফোনের ওপাশের ভরাট গলার মানুষটা স্বল্প বাক্যে বুঝিয়ে দিল সে কতটা কৃতজ্ঞ আমার কাছে। মাস শেষেই নাকি সেই পঞ্চাশ হাজার টাকা হাতে পেয়ে যাব। এখন থেকে আমার সমস্ত খরচ সে বহন করবে। আর আমি যেন সেলাইয়ের কাজটা ছেড়ে দিয়ে নিজের প্রতি যত্নশীল হই।

দীর্ঘ সাত বছর পর হঠাৎ নিলেশের আগমন আমার মত সবার জন্যই ঈদের আনন্দ। নতুন বাড়িটা আমাদের ভাড়া বাসার পাশেই তৈরি করছিল। তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে দুইদিন পরই নিলেশ সাথে নিয়ে এসেছে তার নতুন বউকে! যা আমার ও তার পরিবারকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এক মুহূর্তে আনন্দ যেন বিষাদে পরিনিত হলো। আমার ফ্যাকাশে মুখে তার দিকে তাকিয়ে থাকা নিলেশের চোখে পড়তেই রক্তিম হয়ে গেল মুখ। এতোদিনে তবে সে সমস্ত দেনা শোধ করেছিল! আমি তো ওই টাকা ফেরত নেব বলে আশা করিনি। আমি তো নিলেশকেই চাইতাম। এসব তো তার অজানা ছিল না। এতো বছরের অপেক্ষার তবে কি এই প্রতিদান হলো? আসলে পাগল আমি ভুলেই গিয়েছিলাম স্বল্প শিক্ষিত মেয়ে কি করে উচ্চশিক্ষিত নিলেশের যোগ্য হতে পারে!

এটা সত্যি যে নিলেশ কখনও আমাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখায় নি। তবে আমার চোখে যে শুধু নীল আর নীল তা ভাল করেই পড়তে পারতো সে। এই ত্রিশ বছরের অসহায় আমার মনে কি ঝড় বয়ে যাচ্ছিল তা আর সবার মতই নিলেশও বুঝতে পারছিল। আমার স্থির চোখের দিকে বেশি সময় তাকানোর সাহস ছিল না নিলেশের। সবার আড়ালে সুযোগ পেয়ে আমাকে বলেছিল, ” ক্ষমা করে দিও। তোমাকে আমি আমার সব বিপদে পাশে পেয়েছি। খালাতো ভাই-বোনের চেয়ে আমরা বন্ধুই বেশি।”

কথাগুলো যেন আমার কাছে বিষফোটার মত ঠেকছিল। কি হল জানি না প্রথমবারের মত আমার মুখ ফুটেছিল সেদিন। সবার সামনে, নতুন বউয়ের সামনে এতোদিনের লাগামটানা মুখে মনের সব গুলো কথা উচ্চারিত হবার শেষ প্রান্তে আব্বা বলে উঠলেন, “এতোদিন যখন বলিস নি মা তবে আজ কেন বললি! কেন নিজেকে এই অকৃতজ্ঞের সামনে ছোট করলি?”

সেদিনের সেই উত্তরের জবাব আজও জানি না আমি। আজ পাঁচ বছর পর যখন দেখলাম, তার কোলের বাচ্চাটিকে নিয়ে আদর করতে ব্যস্ত হয়েছি। সেদিন রাতে নতুন বউয়ের পড়নের নতুন শাড়িটা চুরি করতে ইচ্ছা হয়েছিল। ফ্যানের সাথে ঝুলে মারা যাওয়াটা সহজ মনে হতো তখন। কিন্তু তা তো আর সম্ভব ছিল না। বিষ বা ঘুমের ওষুধ খাবারও জো ছিল না। এতগুলো মানুষের সংসারে ঘরে একা একটি খাটে একরাত ঘুমানোর সুযোগ যে মেয়ের হয়নি, তার কি আর ঐ জঙ্গলে মৃত্যু সুখ পাবার কথা?

অথচ সেদিন যদি এটা পারতাম তবে অবসান হতো একটি ভুলে ভরা মূল্যহীন জীবনের। শেষ হতো অপেক্ষার নির্মম পরিনতি বয়ে বেড়ানোর দুঃসহ পালার। মেয়েটি অল্প সময়েই তার জীবনকে ভরিয়ে তুলেছে ভালবাসার রঙে। যা আমি তাকে দিতে পারিনি দীর্ঘ সাধনার পরও। জীবন বড়ই বিচিত্র। অনেক সাধনা ও ত্যাগ স্বীকার করেও যা পাওয়া হয় না, অন্য কেউ কোন এক জাদুকরী শক্তির বলে পেয়ে যায়। সাজানো সংসারে অন্যে শোভা পায়। একেই বলে নিয়তি!

লিখেছেনঃ আনিকা ইসলাম
লেখিকার আরো অন্যান্য লেখা পড়ুনঃ হুতুমপেঁচা -তে।