মুক্তধারা

মিথ্যাবাদী “মা”

আমি তোকে পৃথিবীতে আনতে চেয়েছিলাম,বুকে জড়িয়ে আদর করতে চেয়েছিলাম, আমি এত্তো এত্তো গল্প করতাম তোকে নিয়ে। ছোট ছোট হাত পা গুলো আমার গালে আলতো ছুঁয়ে যেতো। তোর গোলাপী ঠোটটা ছুঁয়ে যাবে আলতো হাসিতে ছোট ছোট নিশ্বাস সেটাও যেনো আমাকে স্পর্শ করতে ভুলবেনা। আমি আনন্দে দিশেহারা হয়ে যাবো। এমনই ভাবতাম তোকে নিয়ে সবসময়। কিন্তু তুই তো এলি অসময়ে,না তোকে কেনো বলছি তোকে তো এনেছি অসময়ে আমরাই। আমাদের দায়িত্ব ঞ্জানহীন ভালোবাসার কারনে। তবুও আমি চেয়েছি, মন থেকে চেয়েছি তোকে ধরে রাখতে,কত করে বুঝিয়েছি তাকে কিন্তু আমি ব্যর্থ হয়েছি, তার ভালোবাসা শেষ হয়ে গেছে এক দিনেই। তবুও আমি ভেবেছি তোকে পৃথিবী দেখাবো,আমাকে দেখে তুই তোর পৃথিবী চিনবি। একটু একটু করে তুই বাড়ছিস আমার ভিতর,আমি অনুভব করছি তোর বেড়ে উঠা। কিন্তু সে তো তোকে দেখতেই চায় না। সে বাবা হতে চায়না, সমাজে আমাকে স্বিকৃতি দিতে চায়না। আমি বলেছি আমাকে আমার মতো মা হতে দাও। সে তো সেটাও চায়না,হয়তো ভাবছে তুই- আমি কখনও যদি তার পরিবার আর তার অনাগত সন্তানদের বিপদের কারন হয়ে যাই। তাই তোকে দূরে পাঠানোর চেষ্টা করেই চলেছে। তিন মাস ধরে আমি যুদ্ধ করছি তোকে টিকিয়ে রাখার,বাইরে থেকে বোঝার সময় এখনও হয়নি তাই সমাজের সাথে লড়ায় এখনও শুরু হয়নি,সমাজও তোকে চাইবেনা জানি। আমি নিজেকে তৈরি করছি একটু একটু করে সবার সাথে লড়ার। ভাবিস না তুই একটুও। তোর মা শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবে তোর জন্য। আজ তোর প্রথম নড়া অনুভব করলাম,খুব হালকা একটা অনুভূতি।আর একটু বেড়েছিস তাই না? আর কটা দিন পর তোকে আর তোর মা লুকিয়ে রাখতে পারবেনা। তখন হয়ত মানসিক চাপ বেড়ে যাবে, তোর সাথে কথা বলতে পারবো না এমন করে। কিন্তু দেখিস তুই যখন আসবি তোকে দেখে তোর বাবা ঠিক আমার মতোই খুশি হবে। এইতো আর কয়টা মাস মাত্র।

শরীরটা অনেক হালকা আজ,কোন অনুভূতি হচ্ছে না আগের মতো,কোমর থেকে পা সব অবস হয়ে আছে। মাথার কাছে সেই মানুষটা বসে আছে,যে শুধু আমার শরীর টাকে চেয়েছে তোর আমার ভবিষ্যত ভাবেনি। আজও সে নিজেকে নিরাপদ রাখার সব ব্যবস্থা করতে এসেছে। ওকে দেখেই ঘেন্নায় বমি আসছে, কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে না। তুই কি শুনতে পাচ্ছিস? আমার কাছে থেকে তোকে আলাদা করা হয়েছে, আমি চেষ্টা করেও তোকে দেওয়া কথা রাখতে পারিনি। আমি তোর নরম হাত দুটি আমার হাতে নিতে পারি নি। আমি তোর মা হতে পারিনি। আমি জানি তুই আমাকে ডেকেছিস,চিৎকার করে বলেছিস মা তুমি মিথ্যাবাদী। তুমিও আমাকে চাওনি,তুমিও তোমার সুখ চেয়েছো। আমি শুনতে পাইনি তা তো নয়,আমি সব শুনেছি,আমার শরীরের এক একটা অংশ তোকে আগলে রাখতে চেয়েছিলো কিন্তু আমি আমার শরীর থেকে তোকে আলাদা হতে দিতে বাধ্য হয়েছি। সত্যিই আমি দোষী,আমাদের লোভ,আর ক্ষনিকের ভালোলাগার এতো বড় ত্যাগ তোকে তোর জীবন দিয়ে করতে হলো।যে তোর বাবা হতে চায়নি সে আজ মুক্ত আমার থেকে,কাল হয়তো অন্য কোন মেয়ে তার লালশার শীকার হবে,আবারও তোর মতো কোন প্রান মায়ের গর্ভে তার অবয়ব পাওয়ার আগেই পৃথিবী ছেড়ে যাবে। যার জায়গা হবে ডাষ্টবিন নর্দমা অথবা শেয়াল কুকুরের পেটে আর মায়ের ক্ষত বিক্ষত হৃদয় সারাজীবন সে ঘা বয়ে বেড়াবে।

এসব শুধু আমাদের সচেতনতার অভাব।সন্তান জন্মের পর ডাষ্টবিনে ফেলে দিচ্ছি অবলিলায়,কি করে পারছি আমরা?হয়তবা পরিবেশ পরিস্থিতি আমাদের বাধ্য করছে,কিন্তু আমাদের মমত্ববোধ,ভালোবাসা কি ফেলে দিতে পারছি?তাহলে কেনো এমন নিজেকে কষ্ট দেওয়া,কেনো এই জীবনগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া।আমরা কি একটু সচেতন হতে পারি না?বিবাহ বর্হিরভূত সম্পর্কগুলো এড়িয়ে গেলেই হয়তবা কিছুটা কমবে এসব। আর মাতৃত্বকে লজ্জার আর বোঝা মনে না করে,ওই সময়টাকে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় মনে করে উপভোগ করতে পারি।ডাষ্টবিন, নর্দমা,আর শেয়াল কুকুরের পেট কারো আদরের সন্তানের জায়গা হতে পারে না।

লিখেছেন : সাজিয়া আফরিন 

লেখিকার আরো অন্যান্য লেখা পরুনঃ হুতুমপেঁচা ম্যাগাজিন -এ।