'ও ডাক্তার'

ডাঃ তারিন’স চেম্বারঃ এক্সপেরিয়েন্স (পর্ব-১)

বাচ্চাকাচ্চা পালতে না জানলে প্লিজ জন্ম দিয়ে দেশ ও জাতির যন্ত্রনা আর বাড়াবেন না!! একটা বাচ্চা ছেলে/ বাচ্চা মেয়ে- খুব বেশি হলে – ১০/১২/১৪ বছর বয়স হবে!!! এদের কেন এমন লেভেল এর পাংকু হতে হবে যে এদের চুলের কাট/ চুলের রঙ/ মুখের ভাষা/ পরনের পোষাক দেখলে রীতিমত বমি পাবে!! হোয়াই!! একটা মা-বাবা হিসেবে এটুক কি আপনাদের দায়িত্বে পরেনা, বাচ্চাটা কেমন জামা পরে বাইরে যাবে কি যাবেনা/ কি কাটিং অর ড্রেসিং করবে চুলের/ কেমন ভাষায় কথা বলবে এগুলো তদারকি করার!! মূল ঘটনা-

১ম রোগীঃ বয়স ১১, ছেলে বাচ্চা, টনসিল ফুলে গলা ব্যাথা নিয়ে আসছে, তো চিকিৎসার পর পাশাপাশি যা করনীয় বলতে গেলাম-
আমি: বাবা, গরম পানি দিয়ে গারগেল করা লাগবে, একদম কোল্ড ড্রিংক্স বন্ধ!!
রোগী: ওহ নো, আই এম সোওও সর‍্যি, আমি টাইগার না খেয়ে এই গরমে থাকতেই পারবোনা, আপনি এমন অসুধ দ্যান যেন এগুলো খেলেও আমি ভালো হই!! আমি: এটাতো সম্ভব না বাবা, ব্লা ব্লা…
রোগী আমাকে থামিয়ে দিয়ে: নো ফা… ওয়ে, আমি এসব না খেয়ে থাকতে পারবোনা!!
রোগীর মায়ের অবস্থান শুনবেন?? : বাবা, রাগ করেনা সোনা, একটু কষ্ট করতে হবে সুস্থ হতে হবেনা? তোমার আব্বু কিন্তু নাহয় মোবাইল কিনে দিবেনা এবছরেও!!
বলুন, পুরো ঘটনায় বাচ্চাকে থাপড়াতে ইচ্ছা করে, নাকি মহিলাটাকে (সর‍্যি টু সে লাইক দিস)!! যে বাচ্চা তার মায়ের সামনে “ফা…. ” শব্দ উচ্চারণ করতে পারে আর মা একটা কান-চোবাড়ি না দিয়ে এটাকেই স্বাভাবিক ধরে নিচ্ছে, বরং এই নাক টিপলে দুধ বের হবে বয়সেই মোবাইলের লোভ দেখিয়ে এই সামান্য কথাটুকু মানাতে চাচ্ছে- তাকেইতো আসলে থেরাপি দেয়া উচিত নাকি!!

দ্বিতীয় রোগী: বাচ্চার বয়স ৯ বছর, মেয়ে বাচ্চা!! বাচ্চাটা অনেক বেশি হেলদি, একচুয়েলী নট হেলদি, এটা হচ্ছে অতিরিক্ত ওজন এবং লিমিটলেস জাংকফুড খেয়ে খেয়ে জাস্ট মোটা হয়ে যাওয়া!! এসব ফুলে যাওয়া বাচ্চারা খুব অল্পতেই অসুস্থ হয়ে যায় এখন!! তো যাই হোক, মেয়েটার চুলে রীতিমত আগুন লাল রঙ করা!! সাথে চ্যাংচুং প্যাংপুং টাইপ মুখের ভাষা!! এতোই ফ্যাশন করে কথা বলছে যে আমি তার অর্ধেক কথাই বুঝলাম না!! ট্রীটমেন্ট দিলাম সংশ্লিষ্ট রোগের, কিন্তু যেটা আমাকে ভাবালো, তা হচ্ছে- বাচ্চা একটা মেয়ে, বয়সের তুলনায় এতোটাই বেশি গ্রোথ যে অন্য যারা জানবেনা মেয়েটা একজন নারী নয়, বরং মাত্র ৯বছরের মেয়েবাচ্চা- তাদেরই চোখ খুব খারাপভাবে যেতে পারে বাচ্চাটার উপর!! আই রিপিট, খুব খারাপ ভাবে!! কেন??

এখন আসি মূল কথায়!! বাচ্চাটার ড্রেস আপটা ওর ফিজিক এর সাথে যায়না, সোজা কথা যায়না!! এটা আমাদেরকে মানতেই হবে, যতই নারীবাদী হইনা কেন, আমাদের সমাজ এখন অনেক নোংরা হয়ে গেছে!! তাছাড়া,একেকটা বাচ্চার গ্রোথ একেক রকম হয়, কারো ২০ বছরেও ততোটা গ্রোথ হয়না, যেটা অনেক ক্ষেত্রে ১০/১২ বছরের বাচ্চারও হয়ে যায়!! তো মায়েদেরইতো সচেতন হতে হবে, মেয়েটার বয়স যাই হোক, ওর গ্রোথের অনুসারে কেমন ড্রেস আপ করানো উচিত!! এমনকি আমরা ছোট থাকতেই আমাদের মায়েরা আমাদেরকে যে একটা স্বাভাবিক লজ্জাবোধ অথবা নিজের স্পর্শকাতর স্থান সম্পর্কিত ধারণা দিয়েছিলো, সেটাকি আজকাল একেবারেই উঠে গেছে মায়েদের ভেতর থেকে??

আমি বাধ্য হয়েছিলাম, এই দুই রোগীর মা-কেই এসব নিয়ে কাউন্সেলিং করতে এবং খানিকটা কড়া কথা বলতেও!! আমাদেরকে ভাবতে হবে, আজকে সমাজের এত্ত অবক্ষয় এতো নৈতিক অধঃপতন এমনি এমনি একদিনেই হয়ে যায়নি!! ইভ টিজিং এর দায়ে যে বাচ্চা ছেলেটা আজ গালি খাচ্ছে- অনেক ক্ষেত্রে এই দায় বাবা- মায়েরই!! আবার নষ্ট মেয়েছেলে- যাদের ড্রেস সেন্স দেখে অন্যরা এটা কমেন্ট করছে- সেসব বাচ্চাদের বাবা-মায়ের দায়টাও কিন্তু একেবারেই এড়াবার নয়!! আজকে আপনার ছেলে অতি আহ্লাদে ইভ টিজিং এর দায়ে জেলের ভাত খেলে খুব কি সম্মান থাকবে আপনার?? নাকি মেয়ের একটা খারাপ কিছু ঘটে গেলে হায় আফসোস করে লাভ হবে আপনার?? ভাবতে হবে, সেই যুগেও কিন্তু খারাপ মানুষ ছিলো!! কিন্তু আমরা বড় হয়েছি নূন্যতম কিছু নৈতিক শিক্ষা, কিছহ ভয়, কিছু বোধশক্তি নিয়ে, যা আজকাল মা-বাবারা অতি আদরের চক্করে পরে ভুলে যাচ্ছেন!! এই প্রজন্মকে ঠিক লাইনে আনার পদক্ষেপ শুরু হোক নিজের ঘর থেকেই- প্রতিটি নতুন বাবা-মায়ের নিকট একমাত্র এটিইই হাতজোড় রিকোয়েস্ট!! আমাদের সবার সহযোগীতা, সচেতনতাই পারবে সমাজের এই অসহনীয় পরিবেশকে সুস্থ করতে!

লিখেছেনঃ  ডাঃ তামান্না মাহফুজা তারিন

চেম্বার এক্সপেরিয়েন্সের কথা  আরো জানতে চোখ রাখুনঃ  হুতুমপেঁচা ম্যাগাজিন– এ।