মুক্তধারা

“কোন পুরুষই কালো মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে চায়না”

আমদের সমাজে বউ হিসেবে সুন্দর মেয়ে খোঁজা হয় যাতে অনাগত সন্তান সুন্দর হয়। সুন্দর মানেই আমরা ধরে নেই ফর্সা। অর্থাৎ সুন্দরের প্রথম শর্তই ফর্সা। চোখ ছোট,নাক ভোতা ,দাত বাঁকা যাই হোক না কেনো সব চলবে মেয়ে যদি হয় সাদা। তাই গর্ভের সন্তান মেয়ে জানার পর মা-বাবা আরও বেশী চিন্তায় পরে যায় এটা ভেবে যে রং কেমন হবে? বাড়িতে সুন্দর সুন্দর ছবি লাগানো হয়,মা কে বলা হয় সুন্দর কিছু দেখতে যেনো সন্তানের উপর সেগুলোর প্রভাব পরে। কি কি খেলে সন্তানের রং সাদা হতে পারে সেসব নিয়ে চলে ব্যস্ততা। আর এর প্রস্তুতি তো আরো আগে থেকে শুরু হয়ে যায়। বিয়ের জন্য ছেলে বা ছেলের পরিবার খোজে ফর্সা মেয়ে,তাহলে ভবিষ্যতে সে,যেসব সন্তান জন্মদিবে তারাও ফর্সা হবে,হোক না সেই বিবাহ যোগ্য ছেলের রং রাতের মতো অন্ধকার। তাহলে কি একটা সন্তানের রুপ,রং শুধু মায়ের রং এর উপর নির্ভর করে?

এমন ও চোখে পরে মায়ের রং সাদা কিন্তু তার সন্তান শ্যমলা, কারন বাবা শ্যমলা তাই। তাহলে আমরা কেনো সন্তানের গায়ের রং এর জন্য মায়ের উপর নির্ভর করি আর সাদা কালো রং বিচার-বিশ্লেষনে নেমে যাই? ভৌগলিক দিক বিচারে আমাদের আবহাওয়া যেমন তাতে বাদামী,শ্যামলা রং এর আর্ধিক্য বেশী। আর জাতিগত দিক থেকে বিভিন্ন জাতির সংমিশ্রণে আমরা।অর্থাৎ আমরা সংকর জাতি। তাই রং বিচারে আমরা শ্যাম বর্ন বা উজ্জল শ্যাম বর্ন,বাদামী আর কখনও সাদা।তবে সাদার চেয়ে শ্যাম বর্ন বা উজ্জল শ্যাম বর্নই বেশী। সংমিশ্রণের কারনে আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও আলাদা আলাদা। তবে এক জায়গায় মনে হয় সবার চরিত্রে বড়ই মিল আর সেটা হলো গায়ের রং বিচারে। আমরা সবাই সাদাটাকেই বেশী প্রাধান্য দেই।

পুত্র সন্তান কালো হলে আমরা বলি কালো হোক আর ফর্সা ছেলে ছেলেই আর কন্যা সন্তান কালো হলে বাবা মা কি করে গায়ের রং সাদা করবে এ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে। চিন্তিত হয়ে পরে কি করে মেয়েকে ভাল প্রাত্রস্থ করবে। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ভাবে মেয়ের রং সাদা করার জন্য ব্যস্ত হয়ে যায়। কারন আমাদের সমাজে শ্যামবর্ণ মেয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা,চেহারা,আচার ব্যবহার কোনটারই মূল্য নেই,নেই কোন ভাল জায়গায় সুযোগ।

সবখানেই বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সাদারা প্রাধান্য পায়য়। আর তার বোধ,বুদ্ধি,ঞ্জান যতই কম হোক না কেনো। এতে করে বোঝা যায় মেয়েরা এখনও পন্যই রয়ে গেছে। তাই তো টিভি,মিডিয়া,অফিস,সেল্সে সব খানেই সাদা গাত্রের মেয়েদের নেওয়া হয়,দৃষ্টি আকর্ষন করানোর জন্য। শ্যাম বর্ন মেয়ের বিয়ে দিতে গেলেও কত রকমের যে মানসিক চাপ সহ্য করতে হয় বাবা-মা আর মেয়েকে।কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশাল পরিমান যৌতুকের বিনিময়ে মেয়েকে বিয়ে দিতে হয়। কালো মেয়েকে বিয়ে করা যায় না, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা যায় না কিন্তু বড় ধরনের (যৌতুক)উপহারের বিনিময়ে কালো মেয়েটি হঠাৎই রুপসী হয়ে যায়,তাকে নিয়ে ঘর বাধতে আর স্বপ্ন দেখতে মন চায়। এই তো আমাদের সমাজের চিত্র। তবে এরকম মেকি সম্পর্ক যেটা যৌতুকের বিনিময়ে কেনা সেটা কি টিকে থাকে? নাকি সেখানে কোন সুখ বলে কিছু থাকে?

কারন আমাদের সমাজে কোন পুরুষই তার সয্যা সঙ্গী হিসেবে কালো মেয়ে চায়না, চায়না কালো মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে। তারা চায় এমন কাউকে যাকে রাতের আঁধারেও আলোর মতো দেখাবে। তাই এমন অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সংসারে কালো মেয়েরা কখনই ভালো থাকে না। তারা সারাজীবন হীনো মনোষ্কতায় ভোগে। আর এর জন্য দায়ী পুরা সমাজ ব্যবস্থা,সমাজের মানুষের মানসিকতা আর রুচি বোধ। আমরা সৌন্দর্য ব্যপারটাই বুঝিনা,শ্যাম গাত্রের কন্যাও যে রুপসী হতে পারে সেটা ভাবতেই পারিনা। এখানে শুধু মেয়েদের মূল্যায়ন করা হয় সাদা কালো রং বিচারে,অথচ এটাতে মানুষের নিজের কোন হাত নেই।
আমরা এখনও সুন্দরের অর্থ বুঝে উঠতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। আমাদের সাদা কালো গাত্র বর্ন বিভেদ ঝেড়ে ফেলতে হবে, নারীকে তার রুপে নয়, তার কর্ম,শিক্ষা দ্বারা মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে। কবি সাহিত্যিকরা এই বিষয়ে সবার দৃষ্টি পরিবর্তন করেতে পারেন তাদের লিখার মাধ্যমে, যেটা বহু বছর আগে রবীন্দ্রনাথ, আর নজরুল চেষ্টা করেছিলেন তাঁদের লিখনী দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- “কালো? তা সে যতই কালো হোক দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ। কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, আর যা বলে বলুক অন্য লোকে।”

লিখেছেন : সাজিয়া আফরিন 

লেখিকার আরো অন্যান্য লেখা পরুনঃ হুতুমপেঁচা ম্যাগাজিন -এ।