অনুরণন

ভৌতিক গল্পের সিরিজঃ “অ-মানবী”

পুরা আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে আছে,চারদিক অন্ধকার নেমে এসেছে,ঝড়ো বাতাস শুরু হয়ে গেছে। রুমা বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে দেখছে, বাতাসে শাড়ির আঁচল উড়ছে। কি যে ভাল লাগছে রুমার।

বাতাসে একটু একটু করে মেঘগুলো সরে যেতে শুরু করেছে। সে এক অন্যরকম সৌন্দর্য। এরকম এক অজানা ঝড়ো হাওয়া এসে সবার মনের মেঘগুলো যদি সরিয়ে দিতো, সবকিছু নতুনের মতো চক চক করতো, নতুনত্বের ছোঁয়ায় সবকিছু আন্দলিত হতো, মনে মনে ভাবে রুমা। পল্লবের ডাকে ঘোর কাটে রুমার।

পল্লবঃ তুমি যে, কেনো ঝড়ের সময় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকো বুঝিনা, বাতাসে সব ধূলা ভিতরে এসে গেলো।
রুমাঃঝড় দেখতে আমার ভাল লাগে
পল্লবঃ দেখো।- একটু রেগেই বললো কথাটা। কারো কারো ভাল লাগাটা একটু আলাদা সবার থেকে, রুমারও তাই।আর কিছু ভাল লাগেনা তেমন। প্রকৃতি তাকে টানে খুব বেশী।ছোট বেলায় খুব ছোটাছুটি করতো না। সবার সাথে থেকেও হারিয়ে যেতো প্রকৃতির সাথে।

পল্লবঃ কি দেখা হলো তোমার? ঝড়তো অনেক আগেই শেষ হয়েছে।
রুমাঃ কিছু বলবে?
পল্লবঃ বেরুচ্ছি, ফিরতে রাত হবে।

রুমা দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে এলো, সিড়ি অনেকটা পুরোনো দিনের মতো, আলোটাও কম ঢোকে। বিরাট বাড়িতে ওরা শুধু দুজন।একদিকে থাকলে অন্যদিকটা নীরবতায় ডুবে যায়। রুমা বার বার বলেছিলো এমন বাড়িতে উঠবেনা, একা একা পুরানো দিনের বাড়িতে ভাল লাগবে না। কিন্তু পল্লব সেটা গা করেনি। ওর ভাল লেগেছে তাহলেই হবে।

সন্ধ্যায় বাড়ির নীরবতা যেনো আরও বেড়ে যায়, দূর থেকে শিয়ালের ডাক ভেসে আসে, অদ্ভূত সব পাখিরা ডেকে যায় বারবার। পাশেই নাকি শ্মশান আর নদী। নতুন এসেছে বলে এখনও দেখা হয়নি শহরটা। জানালার পাশেই বড় পুরোনো দুই গাছ ছিলো, আসবার পর রুমা দেখেছিলো। এবার শশুড় বাড়ি থেকে ঘুরে এসে সেই গাছটা আর চোখে পরেনি, কেটে ফেলে সেখানে বাড়ির কাজ শুরু হয়েছে। দুজন মানুষের অল্পকিছু কাজ, সেটা সেরেই রুমা জানালা দিয়ে এদিক ওদিক দেখতে বসে।

বেলকুনি থেকে রাস্তা আর আকাশ ছাড়া তেমন কিছু চোখে পরেনা তাই জানালা দিয়েই বেশী দেখে রুমা। বেল বেজেই যাচ্ছে, রুমা পরি মরি করে নিচে ছুটছে,নিচে আবার আলো নেই। নিচতলায় যারা থাকে তাদের সাথে দেখা হয়নি এখনও, তবে তারা বাড়িতে নেইও। তাই বলতেও পারছেনা আলো দেবার কথা। দোতলা থেকে যে আলো আঁধারের খেলা তাতেই চলতে হয়। এতে আরও গুমোট ভাবটা বেড়ে গেছে।

পল্লবঃ কতবার বেল দিচ্ছি, সবাই দেখছে আমি দাঁড়িয়ে আছি এতোক্ষন?
রুমাঃ আসছিলাম তো।
পল্লবঃ খেয়েছো? আমি খেয়ে এসেছি।
রুমাঃ তুমি তো জানাও নি, তাই এখনও খাইনি। সিড়িতে উঠতে উঠতে বলে রুমা।

পল্লব ঘরে চলে যায়, রুমা খাবার গুলো সব ফ্রিজে তুলে রাখে, খেতে ইচ্ছে করছেনা। কেমন যেনো অচেনা সম্পর্ক তাদের, শান্ত, গম্ভীর, আর দূরত্ব যে কত শত মাইল! ডাইনিং এর লাইট নিভিয়ে ঘরে যাবে তখনই বন্ধ জানালায় চোখ পরে যায়, কাঁচে বড় একটা ছায়া, বাইরে আবছা আলোয় কালো ছায়াটা পরিষ্কার, একটু তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে রুমা, কারন জানালার নিচেই আর একটা বাড়ির টিনের চালা, চোর কিনা সেটা দেখার চেষ্টা। না মনে হয় বড় গাছটার ছায়া।

ঘরে চলে আসে রুমা। বিছানায় শুতে শুতে মনে পরে গাছটা তো কদিন হয় কেটেছে তাহলে কি চোর? সারারাত আজ সজাক থাকতে হবে। ঘুম ভাঙ্গে বুয়ার বেলে। দরজা খুলে উপরে এসে জানালা গুলো খুলতে থাকে। ঠিক ঐ জানালায় এসে চোখ আটকিয়ে যায়, কিসের ছায়া ওটা ছিলো। পল্লবের আজ অফিস নেই, বাড়িতে থাকবে হয়ত সে, তাই নাস্তার টেবিলে রুমা বলে-

রুমাঃ পাখিগুলোর খারার শেষের দিকে, আজ কি আনবে? মাছের ভিটামিন আজ শেষ হবে, ওটাও আনতে হবে।
পল্লবঃ আজ পারবো না, বাইরে কাজ আছে। আর ওগুলো যে কেনো রাখো, শুধু শুধু ঝামেলা
রুমাঃ ওদের সাথেই তো আমার দিন কাটে, কি আর এমন ঝামেলা করে ওরা বলো? পল্লব উঠে বেরিয়ে যায়।

রুমা ঘর গোছাতে গোছাতে কার যেনো কথা শুনতে পাচ্ছে, মনে হচ্ছে দরজার পাশেই কারা যেনো ফিস ফিস করে কথা বলছে। রুমা দরজার কাছে এগিয়ে যেতে থাকে ফিস ফিস কথা ততোটায় দূরে সরে যেতে থাকে, এক সময় তা হারিয়ে যায়। রুমা খুবই বিরক্তবোধ করে, মনে মনে ভাবে কি হচ্ছে এসব।

রাতে টেবিলে খাবার রেডি করছিলো রুমা, ঠিক ওর পায়ের কাছে এসে পরলো পাতিল রাখার স্ট্যান্ড। চমকে উঠে রুমা, এতো ভারী কোন কিছু এভাবে ছিটকে পরার কথা না, তাও আবার এতো দূর থেকে। রান্না ঘরের জানালাও বন্ধ, কারন পাশের ছাদ দিয়ে বিড়াল ঢোকে বলে। এসব ভাবছিলো ঠিক তখনই রান্না ঘরের সেল্ফে রাখা কয়েকটা বক্স পরে যায়। এবার একটু গা ছম ছম করে উঠে ওর। আজ রাতে পল্লবকে বলতে হবে।

রাতে পল্লব আগেই ঘুমিয়ে পরে, তাই আর বলা হয়না কিছু। মাঝ রাতে রুমের দরজায় ভীষন জোরে ধাক্কা দেওয়ার শব্দে দুজনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। এতো রাতে রুমের দরজায় ধাক্কা কি করে সম্ভব, সব দরজা বন্ধ, বাড়িতে আর কেউ নেই তাহলে? পল্লব কে, কে দরজায় বলে দুইবার চিৎকার করে কোন উত্তর পেলো না, এবার কোন শব্দ নেই দেখে ধীরে ধীরে দরজার কাছে যায়। দরজা খুলে বেরিয়ে চার দিকটা দেখে ফিরে এলো, কেউ নেই।

পল্লবঃ এমন কি করে হলো? স্পষ্ট শুনলাম শব্দটা।
রুমাঃ হ্যা আমিও তো শুনেছি পরিষ্কার

কথা শেষ হবার আগেই নাকী সুরে কান্না শুনতে পায় দুজনই। গা ছম ছম করে উঠে। কোথা থেকে কান্নার শব্দ আসছে বোঝা যাচ্ছে না, কখনও মনে হচ্ছে বাইরে থেকে কখনও মনে হচ্ছে পাশের ঘর থেকে। সারাটা রাত জেগে জেগে কেটে যায় দুজনের। সকাল হতেই পল্লবের মনের সব বাজে চিন্তা দূর হয়ে যায়। সব ভুলে অফিসের জন্য বেরিয়ে যায়। রুমা বুয়ার সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করে।

রুমাঃ শেফালী বুয়া, তুমি এই এলাকায় কতদিন ধরে থাকো?
শেফালীঃ ১০ বছর পার ভাবী
রুমাঃ আগে এ বাসায় কখনও কাজ করেছো?
শেফালীঃ এ বাসায় বহু দিন কোন লোক ছিলো না, কার কাজ করবো।
রুমাঃ হু তা তো ঠিক। কেনো ছিলো না , এতোদিন কোন লোক?
শেফালীঃ তা বলতে পারিনা,তবে বাড়ির মালিক খুব ভাল মানুষ ।

রুমা মনে মনে ঠিক করে নেয় নিচতলায় লোক এলেই শুনবে ওদের কাছে। বুয়াকে বিদায় দিয়ে নিজের ঘর গোছাতে লাগলো রুমা, আচমকা কিছু পড়ে ভেঙ্গে যাওয়ার শব্দ, কোন ঘরে বোঝা গেলো না। রুমা বসবার ঘরে গিয়ে দেখে পল্লবের সবচেয়ে পছন্দের সিনারি নিচে পরে আছে, কাঁচ ভেঙ্গে সারা ঘর। কি করে এমন হলো। পেছনের বাধন একেবারে ঠিক আছে, তাহলে তো কোন ভাবেই পরার কথা না।কি সব হচ্ছে এগুলা!পল্লব এসে সব দেখে বলে,

পল্লবঃবাতাস ছিলো তাই হয়তো পরে গেছে
রুমাঃ পাখিরা বাসা বেধেছে,বাচ্চা ফুটিয়েছে এদিকটায়, সে জন্য জালালা খোলাই হয়না, ওদের বাসা ভেঙ্গে যাবে বলে। বাতাস আসবে কোনদিক দিয়ে?
পল্লবঃ লাগানোটা মনে হয় ঠিক ছিলো না থাক যেটা ভেঙ্গেছে সেটা নিয়ে এতো কথা বলে কি লাভ।
রুমাঃ হু। চলো খেতে। আজ পল্লব সব দরজা, জানালা নিজে বন্ধ করে শুতে এলো।
পল্লবঃ রুমা,পাশের ঘরের জানালার সাথে ওটা কি গাছ?
রুমাঃওখানে তো কোন গাছ নেই, পেছনের দিকে যাওয়ার রাস্তা, ওটা।
পল্লবঃ আমি জানালার সাথেই খেজুর গাছ দেখেছি।
রুমাঃ ভুল দেখেছো। কোন গাছই নেই ওদিকটায়।
পল্লবঃ হতে পারে, কিন্তু আমি দেখেছি।

দুজনই বিছানায় দুই দিকে পাশ ফিরে শুয়ে আছে এ বাড়িতে আসার পর থেকেই দূরত্ব যেনো বেরেই যাচ্ছে, প্রয়োজন ছাড়া কথা হয়ই না বলা যায়, রুমা দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবছে নিজেদের কথা,পল্লব এতোক্ষনে ঘুমিয়ে পরেছে। পারফিউমের গন্ধ আসছে, নাকি কোন ফুলের! এতো রাতে ফুলের গন্ধে মাথা ধরে যায়।

কি একটা অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে! রুমা দরজার দিকে স্থির ভাবে তাকিয়ে, হ্যা ওই তো খুব আলতো পায়ে, লম্বা সাদা কিছু,পুরোটা সাদা, আলাদা করে কিছু বোঝা যাচ্ছে না,ভালো করে দেখার চেষ্টা করছে রুমা,ধোয়া কি এসব?

না এগিয়ে আসছে খুব ধীর পায়ে, ঠিক যেনো ভেসে ভেসে ওর কাছেই আসছে। রুমা পল্লব বলে ডাকলো কিন্তু গলা থেকে কোন আওয়াজ বেরুলো না,পাশ ফিরে ধাক্কা দিবার মতো কোন শক্তি নেই। পুরো শরীর শক্ত হয়ে আছে। ওটা এগিয়ে আসছে। সমস্ত শক্তি দিয়ে প……ল্লব, পল্লব বলে চিৎকার করে উঠলো, এবার গলা থেকে শব্দ বের হলো,পল্লব উঠে বসে রুমার গায়ে হাত দিয়ে বলে কি হলো চিৎকার করছো কেনো?

রুমার মুখ থেকে কোন কথা বেরুলো না, শুধু আঙ্গুল উঠিয়ে দেখালো কিছু একটা। ততোক্ষনে ধীর পায়ে ওটা জানালার দিকে এগিয়ে গেছে,পল্লব চিৎকার করে উঠে কে? কে তুমি? কোন পরিবর্তন নেই ভেসে যাওয়া সাদা জিনিসটার,সে তার গতিতে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঠিক তখনই দৌড়াদৌড়ি শুরু হয় পুরো বাড়িতে, যেনো দৌড় প্রতিযোগিতা।

পল্লব উঠে পরে বিছানা থেকে।দরজা খুলে ডাইনিং এ চলে আসে, সাথে রুমাও। চারদিক বন্ধ,এখন শব্দটা হচ্ছে বসবার ঘরে, দুজন সেখানে আলো জালালো,না শব্দ নেই কোন। এখন ওদের বেডরুম থেকে আসছে ছোটাছুটির শব্দ,আর সাথে কোন বালিকার হালকা মিষ্টি হাসি। যেনো কেউ কারো সাথে খুনসুটি করছে।

ওরা ওদিকে যাবে, ঠিক তখনই বলটা ছুটে এসে রুমার পায়ে লাগলো, রুমা ভয় পেয়ে পল্লবের পেছনে লুকালো। এটা পল্লবের বল, ও খেলতো। বলটা তোলা ছিলো যে প্যাকেটে সেটা এখনও খোলা হয়নি, সেটা বাইরে এলো কি করে? পল্লব রুমার হাতটা ধরে আছে শক্ত করে,এবার হঠাৎ সব নিস্তব্ধ ,কেউ নেই চারপাশে যেনো। কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে রুমার। কি করবে রুমে যাবে কি না ভাবছে, ঠিক তখনই কান্নার শব্দ । একটু একটু করে বারছে সেটা, খুব কষ্টের কান্না ওটা। একটা মেয়ে কাঁদছে খুব কষ্ট পেয়ে কাঁদছে সে।

রুমা আর পল্লব বাকি রাত পাশাপাশি বসে কান্না শুনে কাটালো। ঝলমলে রোদ এসে ঢুকছে জানালা দিয়ে, রাতের সব অশুভ শক্তি যেনো কোথায় হারিয়ে গেছে। দরজার বাইরে এসে রুমা বার বার পিছনে ফিরে দেখছে, গা ছম ছম করছে সিড়ির দিকে তাকিয়ে,মনে হচ্ছে কেউ তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। কেউ কি আসছে ওদের সাথে? এমন সময় কানের পাশে কেউ ফিস ফিস করে কিছু বলতে চাইলো যেনো……. চুড়ির রিন রিন শব্দ যেনো রুমার মাথায় ভিতরে ঢুকে আঘাত করছে। না আর দেরি করলে রুমার মাথা পুরোটায় এলোমেলো হয়ে যাবে। রুমা দ্রুত পল্লবের পাশে উঠে আসে । চুড়ির রিন রিন শব্দ আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে…..

লিখেছেন: সাজিয়া আফরিন