ইচ্ছেঘুড়ি

থাইল্যান্ডে সাত দিন (পর্ব-১)

মাসখানেক সময় ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছি থাইল্যান্ড যাওয়ার। বিয়ের পর আমাদের দুইজনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণ – কত যে আনন্দ আর উত্তেজনা কাজ করছিল মনে। সারাদিন শুধু কোথায় কোথায় ঘুরব, কোন হোটেলে থাকব, কি কিনব, কি খাব এই নিয়ে ব্লগ, ভ্লগ আর ফেসবুক পোস্ট ঘাঁটাঘাঁটি করতাম। থাইল্যান্ড ভ্রমনের উপর অনেক পড়াশোনা শেষ করে সিদ্ধান্ত নিলাম ট্রাভেল এজেন্সির বাঁধাধরা নিয়মমাফিক ট্যুরে না গিয়ে নিজের মতো করে প্রতিটাদিন সাজিয়ে নিব। যদিও কিছুটা ভয় কাজ করছিল মনে অজানা দেশ অচেনা মানুষ পরে না আবার কোন বিপদে পরি।তারপরেও সাহস করে সিদ্ধান্তে অটল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করা শুরু করলাম।
থাইল্যান্ডে যাওয়ার জন্য প্রথমে ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে রয়্যাল থাই এমব্যাসিতে । সাধারণত তারা ৩ মাসের জন্য সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা দেয় । ভিসা আবেদনের জন্য যা যা লাগবেঃ-
১। কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদ আছে এরকম পাসপোর্ট
২। সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড এর ৩.৫ X ৪.৫ সে মি এর ২ কপি ছবি
৩। ব্যাংক সল্ভেন্সী সার্টিফিকে্মেন্ট
৪। ৬ মাস এর ব্যাংক স্টেটমেন্ট এর কপি ব্যাংকের সীল ও অফিসারের স্বাক্ষর করা)
৫। চাকুরীজীবীর ক্ষেত্রে এন ও সি সার্টিফিকেট ও অফিসিয়াল ভিজিটিং কার্ড
৬। ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে নোটারী করা ট্রেড লাইসেন্স এর ফটোকপি।

ভিসাটা অবশ্য ট্রাভেল এজেন্সিকে দিয়ে করিয়েছিলাম কারন চাকরি করে এতবার এমব্যাসি যাওয়া আসা করাটা আমাদের জন্য সম্ভব ছিলনা।ভিসা করানোর জন্য ট্রাভেল এজেন্সিকে দিয়েছিলাম প্রত্যেকের জন্য ৪০০০ টাকা মানে দুইজনের মোট ৮০০০ টাকা। ৫ কার্যদিবস লাগে ভিসা পেতে। টেনশনে ছিলাম সময়মতো ভিসা পাব কিনা কারন শুধু ঈদের সময়টায় কিছুটা ছুটি পাওয়া যায় অফিস থেকে। যার কারণে রোজার ঈদের পরের সময়টাই বেছে নিয়েছিলাম ট্যুরের জন্য। আর ঈদের সময় প্রচুর মানুষ বিভিন্ন দেশে যাওয়া আসা করে যার ফলে টিকেট পাওয়া যায়না। আল্লাহর রহমতে সময়মতোই ভিসা হয়ে গেল। সাথে সাথেই টিকেট কেটে ফেললাম ইউএস বাংলার। আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ব্যাংকক পৌছে ওইদিনই ফুকেট চলে যাব। তাই এয়ার এশিয়ার ব্যাংকক টু ফুকেটের টিকেটও কেটে নিলাম। তারপরদিন মানি এক্সচেঞ্জ থেকে প্রয়োজনীয় ডলার কিনে নিলাম। থাইল্যান্ডের মুদ্রার নাম থাই বাথ। ডলার ছাড়াও সাথে ২০০০ বাথও কিনেছিলাম কারন এয়ারপোর্টে ডলার ভাঙালে রেট কম পাওয়া যায়।
৩০ জুন,২০১৭ সকাল ৯.৪০ এ আমাদের ফ্লাইট। একটু আগে আগে এয়ারপোর্টে যেয়ে বোর্ডিং পাসের জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। বিশাল লাইন সেদিন। বোর্ডিং পাসের জন্য এত লম্বা লাইন এর আগে কখনো দেখিনি। ভাগ্যিস একটু আগে এসেছিলাম। বোর্ডিং পাস নিয়ে এরপর ইমিগ্রেশনের জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। ইমিগ্রেশন পার হয়ে এসে তারপর অপেক্ষা কখন প্লেন ছাড়বে। কোন ডিলে ছাড়া সময়মতোই ইউএস বাংলার প্লেন ছাড়ল। যাওয়া এবং আসা দুই সময়েই ইউএস বাংলার সার্ভিস আমার কাছে ভাল লেগেছে।
২ ঘন্টা ৩০ মিনিট পর ব্যাংকক এশে ল্যান্ড করলাম। এখানে বলে রাখি থাইল্যান্ড আরা আমাদের সময়ের পার্থক্য ১ ঘন্টা মানে ওদের টাইম আমাদের থেকে ১ ঘন্টা বেশী। সুন্দর সাজানো গোছানো থাইল্যান্ডের সুবর্ণভুমি এয়ারপোর্ট। ল্যান্ডিং পয়েন্ট থেকে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত হেঁটে যেতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। সেজন্য এয়ারপোর্টের মাঝ বরাবর ফ্লোর এক্সেলেটর দেয়া আছে। যার ইচ্ছা হেঁটে যেতে পারে আবার কেউ চাইলে ফ্লোর এক্সেলেটরে দাঁড়ালে ফ্লোর নিজেই চলতে শুরু করে। যারা ব্যাংককে নেমেই ডোমেস্টিক ফ্লাইটে যেতে চান তাদের জন্য আরেকটা তথ্য দিয়ে রাখি, ডোমেস্টিক ফ্লাইটগুলোর জন্য ব্যাংককে আরেকটি এয়ারপোর্ট আছে যার নাম ডন মুয়াং এয়ারপোর্ট। ডোমেস্টিক ফ্লাইটের জন্য সুবর্ণভুমি থেকে যেতে হবে ডন মুয়াং এয়ারপোর্টে,সময় লাগে প্রায় ২ ঘন্টার মতো। আর তার জন্য এয়ারপোর্টের একদম ফ্রি সাঁটল বাস সার্ভিস আছে। ইমিগ্রেশন এর কাজ শেষ করে আমরা চড়ে বসলাম সেই সাঁটল বাসে। পথে যেতে যেতে দেখলাম ব্যাংকক শহরের ফ্লাইওভার আর নানা রঙের ট্যাক্সি।ডন মুয়াং এয়ারপোর্ট ও বেশ সাজানো গুছানো। ওখানে পৌঁছে কিছু খাওয়া দাওয়া করে নিলাম। এখানে ট্র্যাডিশনাল থাই খাবারের রেস্টোরেণ্ট ছাড়াও আছে ম্যাকডোনাল্ডসের মতো ফাস্ট ফুড রেস্টোরেন্টগুলোও। খাওয়া শেষ করে খুঁজে বের করলাম এয়ার এশিয়ার কাউন্টার। ওখানে বসে অপেক্ষা করতে করতে কিছু সেলফি নিয়ে নিলাম। আরেকটা কথা বলে রাখি, পর্যটকদের জন্য এয়ারপোর্টেই ওই দেশের সিম পাওয়া যায় কম দামে। আমি অবশ্য দেশে থাকতেই আমার এক এক কলিগের কাছ থেকে থাইল্যান্ডের সিম জোগাড় করে নিয়েছিলাম।
এয়ার এশিয়ার প্লেনে করে পৌঁছে গেলাম ফুকেট ১ ঘন্টায়। লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে দেখলাম অনেক ট্যাক্সি আর মাইক্রোবাস দাঁড়ানো। মাইক্রোবাসগুলোতে শেয়ার করে অনেকজন ওঠা যায়। আমরা একটা মাইক্রো ঠিক করে নিলাম পাতং যাবার জন্য। এয়ারপোর্ট থেকে পাতং এর হোটেল প্রায় ৪০ মিনিটের ড্রাইভ। থাইল্যান্ডে হোটেল খোঁজার জন্য আগোডা, বুকিং ডট কমের মতো কিছু ওয়েবসাইট আর মোবাইল এপ্স আছে। ডুয়াল কারেন্সির ক্রেডিট কার্ড থাকলে আগে থেকেই এসব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে হোটেল বুকিং দিয়ে যাওয়া উচিৎ। আগে থেকে হোটেল বুকিং দেয়া থাকলে কম রেটে ভাল হোটেল পাওয়া যায়।
আমরা আমাদের হোটেলে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে আবার বের হলাম। এবার উদ্দেশ্য রাতের খাবার খাওয়া। হোটেল থেকে বের হয়ে দেখি বড় ছোট সব রাস্তার দুপাশ দিয়ে বিভিন্ন প্রকার দোকানপাট, রেস্টোরেন্ট আর বার। এছাড়াও আছে অনেক ম্যাসেজিং এন্ড স্পা সেন্টার। থাই ফুট ম্যাসেজ বিশ্ব বিখ্যাত। মেয়েরা রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডাকতে থাকে। ফুকেট হল সিটি অফ নাইট লাইফ। দিনের বেলা বেশীর ভাগ দোকান বন্ধ থাকে। বিকালের পর আস্তে আস্তে সব খোলা শুরু হয়। দিনের ফুকেট নির্জন নগরী। রাতের বেলা জীবন শুরু। সারা সাত মানুষ গিজগিজ করে। দিন যত এগিয়ে আসে মানুষ তত কমতে থাকে। খাওয়াদাওয়া করে এসে হোটেলে ঘুমিয়ে গেলাম কারন পরদিন খুব সকালে আমাদের বের হতে হবে।
এরপর দুইদিন আমরা ফুকেটে ছিলাম। দুইদিনই আমরা অনেকগুলো আইল্যান্ডে ট্যুর করি। এই ট্যুরের প্যাকেজগুলো পাতং এর বিচের পাশের রাস্তাগুলোতে কিছু ছোট ছোট দোকান আছে সেখানে কিনতে পাওয়া যায়। এই দোকানগুলোতে অনেক কম দামে অনেক রকম ট্যুর প্যাকেজ থেকে নিজের পছন্দমতো কেনা যায়। প্রতিটা আইল্যান্ডেরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। এসব আইল্যান্ডে স্নোরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং প্যারাসেইলিংসহ নানারকম এডভেঞ্চার করা যায়। আমার জীবনের প্রথম স্নোরকেলিং করার অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। স্বচ্ছ পানির মধ্য দিয়ে আমার চারপাশে প্রজাপতির মতো নানা রঙের মাছের আনাগোনা-সে এক অন্যরকম অনুভূতি। সাঁতার জানা না থাকলেও স্নোরকেলিং করা যায় তবে সাঁতার জানা থাকলে ভাল হয়। প্যাকেজের সাথেই আইল্যান্ডগুলোতে দুপুরের খাবারেরও ব্যবস্থা থাকে। বুকিং দেয়ার সময় বলে দিলে হালাল খাবারেরও ব্যবস্থা থাকে।
আইল্যান্ড ট্যুর শেষ করে হোটেলে ফিরতে ফিরতে বিকাল ৫-৬ টা বেজে যেত। তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যার পর বের হতাম অলিতেগলিতে হেঁটে বেড়ানোর জন্য। হোটেল থেকে কিছুদূর সামনে হেঁটে আসলে এক রাস্তার শুরুতে বড় করে একটা সাইন বোর্ড ঝুলতে দেখলাম। লেখা “ওয়েল কাম টু পাতং বিচ”, ঢুকে পড়লাম সেই এলাকার ভিতর। ঢোকার মুখেই পুলিশের ক্যাম্প বসানো, লেখা বিচ পুলিশ। এটাই আসলে সেই বিখ্যাত “বাংলা রোড”.“বাংলা রোড” মুলত একটা রাস্তা, যেখান দিয়ে শুধুমাত্র হেঁটে চলাফেরা করা যায়। কোন বাহন চলতে পারবেনা। রাস্তাটা দীর্ঘ প্রায় ১ কিঃমিঃ হবে। পর্যটকদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে আছে পুরা এলাকা। রাস্তার দুই পাশ দিয়ে বিভিন্ন ফাস্ট ফুডের দোকানপাট ও বার সেন্টার। ওপেন বার গুলো থেকে লাইভ গানের সুর ভেসে আসছে এবং ছেলে মেয়েদের নাচানাচি চলছে। দোকানের সামনে দিয়ে রাস্তায় হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে। তাঁরা কাস্টমারদেরকে নিজেদের দোকানে নেবার চেষ্টা করছে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে যায় একজন ম্যাজিক দেখাচ্ছে আর উৎসুক মানুষেরা তাকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাজিক দেখছে। সারারাত এভাবেই মুখরিত হয়ে থাকে এই রাস্তা।
দুইদিন থেকে ৩ তারিখ সকালের ফ্লাইটে রওনা দিলাম ব্যাংককের উদ্দেশ্যে। ব্যাংককে ছিলাম আরও চারদিন। সেইকাহিণী আবার আরেকদিন লিখব।

(চলবে…………)

লিখেছেনঃ এষনা আহমেদ