অনুরণন

ভৌতিক গল্পের সিরিজঃ “অপরাধী”

দীপ্তর নতুন কেনা বাগান বাড়িটার দিকে তাকিয়ে মনটা আনন্দে ভরে গেলো। যদিও রুপমা প্রথম থেকেই নিষেধ করেছে, ওর এরকম নির্জন জায়গা পছন্দ না। দীপ্ত নিজেও বুঝেছে যে জায়গাটা একটু বেশিই নির্জন! কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই তাঁর একটা বাগান বাড়ি থাকবে, এইটা ভাবতে ভালো লাগতো। দীপ্ত বাগান বাড়িটার নাম রেখেছে অন্যভুবন। এর আগে এই বাগান বাড়ির নাম ছিল আয়নাভুবন। মোখলেস নামে এক দাঁড়োয়ান পাওয়া গিয়েছে অনেক কষ্টে। এইটা হিন্দু এলাকা। দেখার মতো বাগান করে দিয়েছে দিলিপবাবু। মানুষটার বয়স বেশি হওয়ায় দীপ্ত ওনাকে দিলিপবাবু বলেই ডাকে। দীপ্ত আর রুপমাকে দেখে এগিয়ে এলেন দিলিপবাবু।

দিলিপবাবু- বাবু কেমন আছেন?
দীপ্ত- জি ভাল।বাগানতো অনেক সুন্দর করে বানিয়েছেন দেখছি!
দিলিপবাবু- চেষ্টা করেছি!
দীপ্ত – আচ্ছা ওই দখিনপাশে ফাঁকা রেখেছেন কেনো? দীপ্ত অবাক হয়ে দেখল দিলিপ বাবুর মুখটা কেন জানি কালো হয়ে গেলো।
শুধু বললো ওদিকটায় যাবেন না বাবু, আর কিছু না বলেই হাঁটা ধরলেন !
রুপমা অবাক হয়ে একবার দীপ্তর দিকে তাকালো।

রান্নার জন্য রাখা হয়েছে আজিজকে। আজিজের রান্নার হাত অসম্ভব রকমের ভাল। দীপ্ত আর রুপমা ভেবে রেখেছে যে তিনদিন থাকবে এখানে, শুধু ইলিশ মাছ খাবে। আজিজকে বলে রাখবে ইলিশের যতো পদ আছে রান্না করতে! রুপমা ঘর গুলো দেখতে চলে গেলো। আজিজ দেখাচ্ছে। মোটে ৩ টা ঘর, তাও একটাতে তালা। রুপমা আজিজ কে খুলতে বললে আজিজ বলে ওটার চাবি আগের মালিক দেইনি। তারাও খুলতো না কোন এক ঘটনার কারনে। রুপমা আর কথা বাড়ায় নি। সে নিজের ঘরে চলে এসেছে। দীপ্ত বাড়ান্দায় একটা চেয়ারে বসলো। একবার ঘড়ি দেখে নিলো, বিকাল পাঁচটা আর তখনি ঘটলো বেপারটা! খুব চেনা একটা গন্ধ নাকের খুব কাছে এসে লাগলো! এটা তো হাস্না র চুলের গন্ধ! গন্ধটা বাড়ছে একটু একটু করে। একই সাথে ভয় আর অপরাধবোধে এদিক ওদিক দেখতে লাগল। সে জীবনে একটা খুব খারাপ কাজ করেছিল। হাস্নার সাথে ৪ বছরের সম্পর্ক নষ্ট করে বিয়ে করেছিলো রুপমাকে! অথচ হাস্নাকে কখনই বুঝতে দেয়নি তার ভালোবাসাটা অভিনয় মাত্র। হাস্নাকে ছেড়ে রুপমাকে বিয়ে করেছে একটাই কারণ ছিলো রুপমার সুন্দর চেহারা। আর এর পর সে হাস্নার খোঁজ বহুদিন নেয়নি। পরে জানতে পারে হাস্না আত্মহত্যা করেছিলো তার খালার সাথে বেড়াতে গিয়ে যখন দীপ্তর বিয়ের খবর পায়। এবার দীপ্ত ভয়ে ডাকতে লাগল রুপমা! রুপমা!!

রুপমা দৌড়ে এলো, কি হয়েছে!
– দীপ্তর পুরো শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে ততক্ষণে!না কিছু না।

বিয়ের পর থেকেই কেনো জানি বনিবনা একদমই হয় না দীপ্ত আর রুপমার। দীপ্ত কখনই ফিল করেনা হাস্নাকে তবুও রুপমার সাথেও ভালোবাসা তৈরি হয়নি। কোথায় যেনো বাধনটা মজবুত হয়নি আলগায় রয়ে গেছে। আর তাই এবার দীপ্ত এক ভয়ানক পরিকল্পনা করে রুপমাকে এই নির্জনে এনেছে। সব গুছিয়ে নিয়েছে কি ভাবে কাজটা করবে। আর সহ্য করা যায় না এমন দম বন্ধ হওয়া জীবন। এবার খোলা হাওয়ায় নিশ্বাস নিতে চায় সে। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গলো একটু দেরিতেই। খাবার টেবিলে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছের ভাজা। দীপ্ত আর রুপমা খেতে বসেছে-
রুপমা- আচ্ছা তুমি কাল থেকে চুপ করে আছো কেন? রুপমা দীপ্তর দিকে তাকিয়ে বলে।
দীপ্ত- শরীরটা ভাল লাগছেনা
রুপমা- তুমি তো বাগানবাড়িতে আমাকে নিয়ে এলে মজা করবে বলে।
দীপ্ত-চুপ করে থাকে।
রুপমা বলে, দাও তোমার কাপড় আইরন করে দেই। এনেছো আইরন?
দীপ্ত একবার রুপমার দিকে তাকিয়ে বলে, হ্যা!
রুপমা আইরন নিয়ে পাশের ঘরে গেলো তখনই দীপ্ত সেই গন্ধটা পেলো,ওর বুকটা ধ্বক ধ্বক করতে লাগলো! ঘরের দিকে তাকিয়েই হঠাৎ আতকে উঠলো দীপ্ত। ঘরে রুপমার পেছনে একটা মেয়েকে ঢুকতে দেখা যাচ্ছে! পেছন থেকে স্পষ্ট চিনতে পারলো সে হাস্নাকে! কিন্তু এইটা কি করে সম্ভব! হাস্না ঘরের গেইট টা লাগিয়ে দিতে শুরু করলো! দীপ্ত দেখতে পেল হাস্না তার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দীপ্তর হাত-পা কাঁপতে লাগলো সারা শরীর অবশাদে ভরে গেলো। কতটা সময় পার হয়ছে বুঝতে পারেনি সে।
রুপমার আত্মচীৎকারে দীপ্তর ঞ্জান ফিরলো। ছুটে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিলো,সাথে সাথে দরজা খুলে গেলো,মেঝেতে পরে আছে অচেতন হাস্না। মুখ থেকে রক্ত পরছে। গোঙ্গানির শব্দ হচ্ছে হালকা। দৌড়িয়ে গিয়ে হাস্নার মাথাটা ওর কোলে তুলে নিলো।
হাস্না কোথায় ছিলে তুমি? আমি অন্যায় করছি আমি তোমাকে ঠকিয়েছি, আমাকে ক্ষমা করে দাও প্লিজ। তোমার মতো রুপমাকেও ভালোবাসতে পারিনি কখনও। তুমিই ছিলে আমার পাশে সবসময়। হাস্না ওঠো, দেখো আমাকে….
এমন সময় আজিজ এসে চিৎকার করে উঠলো,তাতে দীপ্তর ঘোর কেটে গেলো, দেখে তার কোলে রুপমার মাথা। না তা কি করে হয় হাস্নাই ছিলো ওটা, এমন ভূল হতেই পারে না। কেনজানি মাথা ঘুরতে লাগলো দীপ্তর সে খুব আস্তে আস্তে ডাকতে লাগল রুপমা! রুপমা!

লিখেছেন : সাজিয়া আফরিন 

লেখিকার আরো অন্যান্য লেখা পরুনঃ হুতুমপেঁচা ম্যাগাজিন -এ।