মুক্তধারা

আত্মহত্যা প্রতিবাদের কোন ভাষা না

এক বিকেলে খবর পেলাম আমাদের এক প্রতিবেশী মারা গেছে। কি করে এতো অন্প বয়সী মেয়েটা মারা গেলো সেটা সবার আলোচনার বিষয়। বাচ্চা তিনটা ছোট ছোট। দুটা মেয়ের পর ছেলে হয়েছে তাই আনন্দের সীমা ছিলো না। তখনই আলোচনাকে সমালোচনায় ঘুরিয়ে দিলো একটা খবর-মেয়েটা আত্মহত্যা করেছে। স্বামীর বন্ধুর সাথে দীর্ঘদিন তার একটা ভালো সম্পর্ক চলছিলো, হঠাৎ তার উপর অভিমান করে এই আত্মহত্যা। এই অভিমানের ফলে যে আত্মহত্যা তাতে মেয়েটার কোন লাভ হয় নি, বরং অপুরনীয় ক্ষতির মুখোমুখি তার সন্তানেরা। আর বন্ধু দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভূলে সংসার শুরু করেছে, স্বামী বিয়ে করেছে মাস না ঘুরতেই, পরিবার নতুন সদস্য পেয়েছে কিন্তু সন্তানেরা মা পায়নি।
নিজেকে হত্যা বা নিজের জীবন বিসর্জন করাই আত্মহত্যা। আত্মহত্যা করার প্রবনতা সব বয়সীদের ভিতরই রয়েছে তবে তরুন, তরুনী, আর মাঝ বয়সীদের মাঝে এটা বেশী।সব সমাজেই আত্মহত্যার প্রবনতা আছে যার পেছনে অনেক কারন রয়েছে। বিভিন্ন রকম হতাশা, প্রতারনা,মানসিক দুশ্চিন্তা, অভিমান,শারীরিক অসুস্থতা, দারিদ্রতা এসব থেকে আত্মহত্যা করার মানসিকতা তৈরি হয়। এসব সাময়িক একটা অবস্থা যেটা থেকে বেরিয়ে আসা যায় কিন্তু ততোটুকু সময় হয়তবা আমরা নিজেদের দিতে পারিনা বা দ্রুত সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে চাই বলে এতো বেশী আত্মহত্যা। এসব ক্ষেত্রে হতাশা এমন ভাবে পেয়ে বসে তখন তাদের সামনে কোন পথ দেখতে পায়না আর মানসিক ভাবেও তখন ভেঙ্গে পরে।
অল্প বয়সী ছেলে মেয়েরা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যায়, আর যখন সে সম্পর্ক কোন কারনে নষ্ট হয়ে যায় বা কোন ভাবে একে অপরের দ্বারা প্রতারিত হয় তখন ছেলে মেয়েদের মাঝে হতাশা, অভিমান বেড়ে যায়, যেটা তাদের আত্মহত্যার প্রবনতা বাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সমস্যা,স্বামী- স্ত্রী র দাম্পত্য সমস্যাগুলোর কারনেও আত্মহত্যা করছে। এর পিছনের কারন যেটাই হোক এর ফল কখনই ভালো নয়।
জীবন থেমে থাকেনা কারো জন্য, থাকবেও না। কারো সাথে রাগ বা অভিমান করে নিজের জীবন নষ্ট করাটা বোকামি ছাড়া আর কিছু না।যে যার মতো করে জীবনটাকে গুছিয়ে নেয় আর যে নিজের জীবন শেষ করলো সে তার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ অর্থাৎ ধর্মীয় দিক থেকেও নিজের ক্ষতি করে ফেললো। আমার এক আত্মীয়া অল্প বয়সে একটা ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। কিছু দিন পর মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করে এবং ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। যার কারন ছেলেটি গোপনে অন্য আর একটি মেয়ের সাথে সম্পর্ক রেখেছে, আর এই অভিমানে তার আত্মহত্যার চেষ্টা। এতে কি কিছু থেমে থাকতো? ঐ ছেলেটা কি ভালো হয়ে যেত,আর মেয়েটার মৃত্যুর পর ছেলেটা ভালো হয়ে গেলেই বা কি লাভ পেতো মেয়েটা? সে তো মরে গিয়ে ওর পথ ফাঁকাই করে দিতো। কিছুই বদলাতো না, শুধু পরিবারের সদস্যরা কষ্ট পেতো,সমাজে নানারকম কথা ছড়াতো মেয়েটাকে নিয়ে তাতে বাবা-মা র মাথা নিচু হতো।
কোন কিছুর প্রতিবাদ করতে হলে মনোবল বাড়াতে হবে। আত্মহত্যা প্রতিবাদের কোন ভাষা নয় বা কোন সমস্যার সমাধান নয়। বরং আত্মহত্যা ভীরূতার লক্ষন। অনেক সময় দেখা যায় বিয়ের অনেক বছর পর যৌতুকের জন্য শশুড় বাড়ির লোকজন বা স্বামী মানসিক, শারিরীক নির্যাতন করছে,কোন পথ না দেখে মেয়েরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কিন্তু এটা না করে তার সমস্যা গুলো নিয়ে কাছের কোন বন্ধু বা আত্মীয়ের সাথে কথা বলতে পারে। যে কোন রকম মানসিক হতাশার সময় কাছের মানুষ,পরিবারের কেউ বা বন্ধুর সাথে খোলাখুলি কথা বলে মানসিক চাপ কমানো সম্ভব আর হতে পারে সমস্যার সমাধানও। পরিবারের ও উচিত এরকম সময় পুরোপুরি মানসিক সাপোর্ট দেওয়া, স্নেহ,মমতা দিয়ে কথা বলে হালকা করা। যেনো হতাশাগ্রস্ত ছেলে মেয়েরা নতুন করে নিজেদের নিয়ে ভাবতে পারে।

কারো প্রতি রাগ অভিমান থেকে আমি আত্মহত্যা করলাম, আর ভাবলাম সে হয়তবা এতে নিজেকে শুধরে নিবে অথবা আমার মৃত্যুতে খারাপ সব দিকগুলো পরিবতর্ন হয়ে যাবে, কিন্তু এটা ভূল। প্রথমে ভাবতে হবে জীবনটা আমার, আমি আমার মতো বাচঁবো, আমার জন্য কারো জীবন থেমে থাকবেনা, তেমনি কারো জন্য আমি নিজেকে শেষ করে করে দিবো না।বরং কাউকে পরিবর্তন করতে নিজেকে তৈরি করবো। আমি যদি কাউকে পরিবর্তন করতে চাই,কাউকে বুঝাতে চাই, তার জন্য আগে নিজেকে প্রুভ করতে হবে।কারন আত্মহত্যা কোন সমাধান না।বরং হেরে যাওয়ার নাম আত্মহত্যা। তাই কোন কারনেই আত্মহত্যা নয়, মাথা উচু করে বাঁচতে শিখতে হবে।বেঁচে থেকে পরির্তনের পথ দেখাতে হবে,তবেই সব কিছু পরিবর্তন হতে বাধ্য।তুমি দেখিয়ে দাও – “আমি পারি তোমাকে, সমাজকে,পরিবার কে বদলে দিতে।আর তুমি যদি বদলাতে না পারো তবে ভেবো না, আমি তোমাকে ছাড়া পথ চলা শিখে নিবো,শিখে যাবো।”

লিখেছেন : সাজিয়া আফরিন 

লেখিকার আরো অন্যান্য লেখা পরুনঃ হুতুমপেঁচা ম্যাগাজিন -এ।