মুক্তধারা

প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে বিষণ্ণতার রূপটি ভিন্ন

বিষণ্ণতার ওপরে ইদানিং গবেষণা করা হচ্ছে আগের চাইতে অনেক বেশি। পৃথিবীতে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন মানুষ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত। ঠিক কি কারণে মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগে? বিষণ্ণতার ব্যাপারে কথা বলাটা সহজ কিছু নয়। কারণ বিষণ্ণতার প্রভাব বোঝাটা যেমন কঠিন, তা বুঝিয়ে বলাটাও তেমনি কঠিন।

বিষণ্ণতার কবলে পড়লে মনে হয় পুরো মনটাই বিদ্রোহ করছে মানুষের ইচ্ছের বিরুদ্ধে। মনের ওপরে জোর খাটানো তো যায়ই না, অনেক সময়ে শারীরিক কষ্টও সহ্য করতে হয়। এর কারণে কর্মক্ষেত্র, স্কুল এবং সামাজিক পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে অনেক সময়ে। যাদের বিষণ্ণতা থাকে, অনেক ক্ষেত্রে তাদের মাঝে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা করারও প্রবণতা দেখা যায়। এটা তো কেবল শুরু। এমন কিছু ব্যাপার আছে যা কেবল বুঝবেন ভুক্তভোগীরাই।

১) বিষণ্ণতা থেকে চট করে বের হয়ে আসা যায় না
যারা বিষণ্ণতায় ভুগে থাকেন, তারা ইচ্ছে করলেই সুইচ অন-অফ করার মতো এই অনুভূতি থেকে বের হয়ে আসতে পারেন না। কাছের মানুষেরা অনেক সময়েই ব্যাপারটা কতো গুরুতর, তা বুঝে উঠতে পারেন না। তারা বলেন, “আর কতদিন মন খারাপ করে থাকবে?” অথবা, “এমন তো সবারই হয়”। এর ফলে তো বিষণ্ণতা কমেই না, বরং বিষণ্ণতায় ভোগা ব্যক্তিটি নিজেকে আরও নিঃসঙ্গ মনে করতে থাকেন।

২) বিষণ্ণতা আর মন খারাপ এক নয়
খুব প্রচলিত একটি ধারণা হলো, খুব বেশি মন খারাপ হলে তাকেই বিষণ্ণতা বলে। কিন্তু ধারনাটি একেবারেই ভুল। অনেকেই “বিষণ্ণতা” কথাটাকে যত্রতত্র ব্যবহার করে থাকেন। ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা একটি ক্লিনিক্যাল টার্ম। অনেক সময়ে মানুষ মন খারাপ হলেই বলে থাকে যে তারা ডিপ্রেসড। কিন্তু তা বললে আসলেই যারা বিষণ্ণতায় ভুগছেন, তাদের কষ্টটাকে ছোট করে দেখা হয়।

৩) বিষণ্ণতায় স্বাভাবিক কোনো কাজ করাই কঠিন হয়ে পড়ে
অন্য সবার জন্য দৈনন্দিন জীবনযাপন অনেক সহজ মনে হলেও, বিষণ্ণতায় ভগা একজন মানুষের জন্য সেটাই অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিষণ্ণ একজন মানুষ অনেক বেশি সময় শুয়ে থাকেন। বিছানার আরাম পাবার জন্য তারা শুয়ে থেকে সময় নষ্ট করেন না। বরং বিছানা থেকে উঠে দিন শুরু করার ব্যাপারটাই ভীষণ কঠিন তাদের জন্য। এমনকি শাওয়ার করা বা পোশাক পরিবর্তন করার ব্যাপারটাতেও প্রয়োজন হয় অনেকটা মনোবল।

৪) ক্লান্তি অনেক বেশি গুরুতর হয়ে দাঁড়ায়
একটা ব্যস্ত দিনের শেষে আপনি বা আমি যতটা ক্লান্ত হয়ে পড়ি, বিষণ্ণ একজন মানুষ তারচাইতে অনেক বেশি ক্লান্তির শিকার হয়। তাদের কর্মপ্রেরণা না থাকায় যে কোনো কাজ করার সময়ে মনে হয় তাদের পেশি কাজ করছে না। এতে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে, মনোযোগ থাকে না এমনকি হাসতেও কষ্ট হয়।

৫) বিষন্নতার শারীরিক উপসর্গও রয়েছে
অনেকের ধারণা, বিষণ্ণতা শুধুই একটা মানসিক অবস্থা। এটা একেবারেই ভুল। আগে থেকেই যদি কোনো শারীরিক সমস্যা থেকে থাকে তবে বিষণ্ণতার কারণে তা আরও খারাপ হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়াও হতে পারে বদহজম, বমি বমি ভাব, মাথাব্যাথা, পেশি এবং গিঁটে গিঁটে ব্যাথা।

৬) কোনো কিছু করতেই আর আগের মতো ভালো লাগে না
বিষণ্ণতা কেড়ে নিতে পারে জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোকেও। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, খেলাধুলা এমনকি প্রেমের ব্যাপারগুলোকেও বিরক্ত লাগা শুরু করে।

৭) অনুভূতি প্রকাশ করাটা হয়ে পড়ে কঠিন
যখন আপনি বিষণ্ণতার মাঝে দিয়ে যাবেন, নিজের অনুভূতিগুলোকে কথায় রূপ দেওয়াটা হয়ে পড়ে একটা চ্যালেঞ্জের মতো। এর পেছনে একটা বড় কারণ হলো বিষণ্ণতার প্রতি সমাজের উদাসীনতা এবং বিষণ্ণ মানুষদের প্রতি একটা নেতিবাচক মনোভাব। এ কারণেই তারা অন্যদের সামনে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে চান না এবং পারেনও না।

প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে বিষণ্ণতার রূপটি ভিন্ন। এ কারণে বিষণ্ণতায় যিনি ভুগছেন, তার প্রতি সহনশীল এবং সহমর্মী আচরণ করাটা খুবই জরুরী। কারো ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োজন হয়, কারো ক্ষেত্রে লম্বা সময়ের সাইকোথেরাপি দরকার হয়। কিন্তু একটা সময়ে বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠা খুবই সম্ভব। আর বিষণ্ণ মানুষটির আশেপাশে যারা আছেন তাদের বোঝা উচিত যে বিষণ্ণতা কোনো দুর্বলতা নয়, চরিত্রগত কোনো সমস্যাও নয়। কেউ নিজে থেকে বিষণ্ণ থাকতে চায় না। কাছের মানুষটির বিষণ্ণতার ব্যাপারে এতটুকু বোঝাটাই তার জন্য অনেক জরুরী।