অনুরণন

অর্পিতার একদিন (প্রথমাংশ)

ভোর সাড়ে চারটা। মোবাইল এলার্মের উচ্চ ককর্ষ শব্দে ঘুম ভাঙলো অর্পিতার। গ্রীষ্মকালের তীব্র তাপদাহে রাতেও বেশ কষ্ট পেতে হয় যাদের বাসায় এসি না থাকে। কিন্তু প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গার পর ঘামে ভেজা শরীর আজ অনুভব করলো না! বরং ফুল স্পীডে ঘূর্ণায়মান ফ্যানের নিচে শীত করছে। জ্বর হল কিনা ভেবে গলায় মুখে হাত দিয়ে অর্পিতা বুঝলো নাহ্ এটা জ্বরের জন্য না। তার মানে আজ তাপমাত্রা কিছুটা কম।

নামাজ সেরে কিছুক্ষণ কোরআন শরীফ পড়ে বাইরের দিকে নজর পড়লো। এখনও সূর্যের লাল আভা দেখা না গেলেও আলো অন্ধকার মিশেল স্নিগ্ধ পরিবেশ। কিন্তু আজকের ভোর অন্যদিনের মত নয়। হালকা হাওয়া বইছে বৃষ্টি হবার লক্ষণ ভেবেছিল প্রথম। কিন্তু বৃষ্টি না। কিছু একটা অমিল আছে বাইরে। পাশের চারতলা মসজিদ  পেড়িয়ে পরের পাঁচতলা বাড়িটাকে আরো দূরে মনে হচ্ছে। আর বাড়ির ছাদে গতকালও এতো ফুল গাছ ছিল না। আর সেখানে একটা বনসাই গাছ দেখা যাচ্ছে যা গতকাল অবধি ঐখানটায় ছিল না। চার-পাঁচ ঘন্টার মধ্যে এগুলো কোথা থেকে এলো!

চেয়ার থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে অর্পিতা অবাক হয়ে গেল। মসজিদের ছাদে নানা সবজি গাছ আর ফুলের বাগান। শুধু তাই না। অন্য বাড়িগুলো প্রত্যেকটা বাড়ির ছাদ যেন একেকটা বাগান। সবচাইতে আশ্চর্যজনক হল প্রতিটা বাড়ির মাঝে নির্দিষ্ট পরিমান খালি জায়গা আর বাড়ির সামনে ছোট উঠোন। সেখানে বড় বড় নারকেল, আম, সুপারি, ফুল নানা ধরনের গাছ। মনে হচ্ছে কোন উন্নত দেশ যার রাজধানী সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। আবার এমনও হতে পারে অলৌকিকভাবে ভূত্বকের নিচ থেকে নতুন প্লেট গাছপালাসহ উঠে এসে জায়গা বাড়িয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর ভূমির পরিমাণ কি তবে বেড়ে গেছে!

একমুহূর্তের জন্য মনে হল স্বপ্ন দেখছে। শরীরে চিমটি কেটে বুঝলো আরে নাহ্ এটা স্বপ্ন না সত্যি দেখছে সে। মনের মাঝে একটা প্রশান্তি অনুভব করলো। মনে হচ্ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা কমে গেছে। হঠাৎ মনে হলো সোলারের লাইট জ্বালিয়ে দেই ঘরের। সাথে সাথেই মনে পড়লো, আরে সোলার! সোলার কোথা থেকে আসলো? তবে মনে হলো বিদ্যুৎ পরিমিত পরিমানে ব্যবহারের জন্য যেসব ইলেকট্রনিক সামগ্রী সোলার বিদ্যুতের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায় সেগুলো এখন সোলার বিদ্যুতেই চলছে। কিন্তু কবে কিভাবে এতো সব হল তা অর্পিতার মনে পড়ছে না। ভাবতে ভাবতেই গোসল সেরে নাস্তা বানালো নিজের জন্য। দ্রুত গ্যাস বন্ধ করে দিল কারন গ্যাস অপচয় করা যাবে না কারন প্রতিমাসের সিলিন্ডার কিনতে হয়। কিন্তু এটাও কবে হলো? অর্পিতা ভাবলো নিশ্চিত ওর মাথায় কোন সমস্যা হয়েছে। সব ভুলে গেছে। অফিস থেকে ফেরার পথে একজন ডাক্তার দেখাতে হবে।

তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে সকাল সাতটায় বেড়িয়ে পড়লো। কারণ এখান থেকে মিরপুর ১ যেতে কমসে কম দুই ঘন্টা। সাড়ে নয়টার মধ্যে অফিসে রিপোর্ট করতে হবে।

বাসার গেট থেকে বেড়িয়ে অবাক হয়ে দেখলো সুপারি গাছের দুই সারির মাঝ দিয়ে চিকন রাস্তাটা বড় গেট পর্যন্ত মিশেছে। বাড়িয়ালা এই কাজ কবে করলো সে মনেই করতে পারছে না। গেটের কাছে আসতেই প্রতিদিন দেখা হয় ছেচড়া দারোয়ানটার সাথে। তবে আজ সে অর্পিতার দিকে কুনজরে তাকাচ্ছে না। নইলে চোখ দিয়ে হারামীটা তাকে দু’বেলা গিলে যায়। কাছে যেতেই জোরে সালাম দিয়ে হাসিমাখা মুখে তাকিয়ে বলল,

— আপা ভাল আছেন?

— হা ভাল।

ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য মনে হলো। আজ এটার কি হলো? তবে কি অর্পিতা বুড়ি হয়ে গেল! কিন্তু কবে এমন হল? নিজের হাত দেখে বুঝলো নাহ গতকাল যেমন ছিল তেমনই। কিন্তু রাস্তাটা এমন কেন? চিকন গলিটা বেশ প্রশস্ত। সবগুলো বিল্ডিংই আছে। তবে মনে হল দু’মিনিটের গলি তিন মিনিট লাগলো। গাছপালার মাঝে বাড়িগুলোর ডিজাইন আগের মতই শুধু জমির পরিমান বেড়েছে। এতো সুশৃঙ্খল ঢাকা কি করে সম্ভব হলো?

মেইন রোডে এসে আঁতকে উঠলো। এই ঢাকা আর সেই ঢাকা নেই। মনে হচ্ছে ইউরোপরে কোন মূল সড়ক। যেন আগের রাস্তার সমান প্রশস্ত আরেকটি রাস্তা পাশাপাশি বসিয়েছে। ওবাইদুল কাদের চৌধুরী এক রাতে কি জাদু করলেন! আলাদীনের চেরাগ হাতে পেয়েছিলেন?

মনুষজন দেখে মনে হল সবাই আলাদীনের চেরাগের সেই জ্বীন সবকিছুর সাথে মানুষদের জীবন পাল্টে দিয়ে গেছে। চার রাস্তার মোড়ে প্রতিদিনের মত সেই মোটকা পটকা ট্রাফিক পুলিশটি আজ আর নেই। অদ্ভুত ব্যাপার! গেল কই সে? আজ সবার কি হয়েছে? ট্রাফিক সিগন্যাল পড়ছে আর আপনা আপনি বাস গাড়ি সব দাড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষ নিয়মমাফিক রাস্তা পার হচ্ছে। অর্পিতা দ্রুত ক্রসিং দিয়ে ওপাশে চলে গেল। সিগনাল শেষ হতেই গাড়িগুলো চলা শুরু হলো।

পাব্লিক বাসগুলোর চেহারাও নতুন হয়ে গেল। আনফিট গাড়ি সব ফিট। বাসে উঠার সময় হেল্পারটাও নেমে সুন্দর করে জায়গা ছেড়ে দিল। অন্যদিনের মত বাসে উঠার সময় কোন নষ্ট হাত আজ তার পিঠ ছুঁয়ে গেল না। রাস্তায় কোন জ্যাম নেই। পরিচ্ছন্ন শহর। অফিসে যাবার পথে সেই বিশাল খোলা ডাস্টবিন আর নেই। রাস্তায় কোন ভাঙগা অংশের চিহ্নটি পর্যন্ত নেই।

আজ অফিসে ৮টার মধ্যেই চলে এলো সে। বাকি সময় কি করবে ভাবতে ভাবতে অফিসের সামনে বসার জায়গায় বসে পড়লো। এই সিটগুলো কি গত রাতেই করা হয়েছে? অফিসের সিকিউরিটি ন’টায় এসে অর্পিতাকে বসে থাকতে দেখে বলল,

— ম্যাডাম আজ এতো তাড়াতাড়ি?

— আজ রাস্তায় জ্যাম ছিল না একদমই।

— জ্যাম! ঢাকায় আবার কবে থেকে জ্যাম শুরু হলো? কি বলেন ম্যাডাম।

একগাল হাসি দিয়ে সিকিউরিটি গার্ড গেট খুলে দিল অর্পিতাকে। সে নিজেও আর কিছু জিজ্ঞাসা করলো না। জ্যাম নাকি ঢাকায় নেই! বলে কি লোকটা! দেশের নেতাদের মত কথা বলা শুরু করেছে সে। সকাল থেকে কি কি হয়েছে শুনলে হয়তো ওকে অপমান করে বসবে। তাছাড়া এতো পরিবর্তন নিয়ে রাস্তায় কোন মানুষ এমনকি এই গার্ডটাও অবাক নয়। কেউ কিছুই বলছে না। মনে হচ্ছে বছরের পর বছর এমনি হয়ে আসছে! নাহ্। আসলেই মাথা খারাপ হবার কথা। গতকাল যখন অফিস আসতে দশটা বেজে গিয়েছিল বসের খুব ঝারি খেতে হয়েছে। আজ অন্তত সে খুব তাড়াতাড়ি এসেছে।

সব কলিগরাই সময় মত চলে এলো। আসা যাবার পথে কুশল বিনিময় আর কাজ সমান তালে চলছে। বাট্টু একরামটা আজ একবছর পর কথা বলে গেল। রাগ পড়ে গেছে অর্পিতার প্রতি তার। এগারটার দিকে পিয়ন এসে বলে গেল স্যার সালাম দিয়েছে। তার মানে আবার সেই গুন্ডা পান্ডার মত মোটকা লোকটার ঝারি খেতে হবে। অকারনে ঝারি দেয়া লোকটার অভ্যাস। অথচ সকাল দশটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত গাধার মত খেটে তাদের পকেট ভরিয়ে দেয় কর্মচারীরা। অথচ লাভের ভাগ যা দেয় তা না দিলেও পারে।

রুমে ঢুকেই অবাক হল। রুমে ইনডোর প্লান্টের সমারোহ। আগে ছিল না। আর আসল কথা হল গম্ভীর পটকা বস হাসি মুখে তাকিয়ে অর্পিতার দিকে।

— আসেন আসেন অর্পিতা। কেমন আছেন?

অর্পিতার মনে হল আজ মনে হয় সূর্য দক্ষিণ দিকে উদয় হয়েছিল। যে মানুষের হাসি কোন দিন দেখেনি কেউ তিনি আজ দিব্বি হাসছেন। আবার জিজ্ঞাসা করছে কেমন আছে!

— আলহামদুলিল্লাহ স্যার ভাল। আপনি ভাল?

— হ্যাঁ হ্যাঁ ভাল। আপনার কাজে কোম্পানি খুব খুশি। বলতে গেলে সবার প্রতিই খুশি। এমন চলতে থাকলে আমরা সামনে আরো উন্নতি করবো।

— ইনশাআল্লাহ স্যার।

— হ্যাঁ হ্যাঁ ইনশাআল্লাহ ইনশাআল্লাহ। আমরা ঠিক করেছি এখন থেকে এমপ্লয়ীদের লাভের অংশ আরো বাড়িয়ে দিব। আর একটা সমিতি হচ্ছে। ওখান থেকে ফ্ল্যাট কেনার ব্যবস্থা করা হবে। ছুটি বাড়ানো হবে আর উৎসব ভাতাও। সেই সাথে দুটা কমন রুম বানানো হচ্ছে। কাজ করতে করতে কারো দুপুরে ঘুৃম আসলে হাল্কা ঘুমিয়ে নিবে। আর তোমাকে এসব বলছি কারন তোমাকে গত চারবছরে প্রোমশন দেয়া হয়নি। এবার বেশ ভাল উচ্চপদ তুমি পেতে যাচ্ছ। তুমি একা নও। ভাল এমপ্লয়ীদের সবাইকেই প্রোমশন দেয়া হবে।

— স্যার আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।

— অবিশ্বাসের কিছু নেই। সবাই ছয়টার মধ্যে ছুটি পেয়ে যাবে। আর যারা ওভারটাইম করবে তাদের হিসেব আলাদা। আর হা, এই ফাইলের কিছু ভুল আছে, ঠিক করে নিও। ওকে বেস্ট অব লাক।

আজ একদমই বকলেন না! সব কিছুই অন্যরকম লাগছে। কি করে এতো কিছু সম্ভব!

(চলবে)

লিখেছেনঃ আনিকা ইসলাম
লেখিকার আরো অন্যান্য লেখা পড়ুনঃ হুতুমপেঁচা -তে।