মুক্তধারা

পরকীয়া হলো যেখানে কোন আশা নেই, ভবিষ্যৎ নেই জেনেও ভালোবাসা

নব্বই এর দশকের ঘটনা বড় বোন মিলার বাসায় থেকে ছোটবোন ইরা পড়াশুনা করে, বড় বোনের ছেলে মেয়েরাও বড় বড় তাই তেমন সমস্যা হয়না। হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে ইরা ফিরলো না, সাথে মিলার বরও লাপাত্তা। কদিন পরে জানা গেলো ইরা পালিয়ে তার বোন জামাইকে বিয়ে করেছে । সেই সময় এধরনের ঘটনা ঘটতো তবে অনেক কম,আর সেটা নিয়ে তখনকার দিনে কথা বলাটাও ছিলো লজ্জার।কেউ এসব নিয়ে খুব বেশী বলতে চাইতো না। কারন বিষয়টা হলো পরকীয়া, Extramarital affair বা Extramarital sex.

পৃথিবী যতই আধুনিক হোক না কেনো সব যুগেই পরকীয়ার উপস্থিতি ছিলো, আছে। পরকীয়া বর্তমান সমাজে এমন রুপ নিয়েছে যেনো জীবনের অন্যতম অংশ। আমরা অনেকটা স্বাভাবিক ভাবে নিয়ে নিয়েছি, কেউ কেউ আবার টাইম পাস হিসাবে এটাকে বেছে নিয়েছে। যারা এটা করছে তারা আমাদের মতোই তো সাধারন মানুষ। তাহলে কেনো পরকিয়া?কেনো এটা বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন? আমরা কি সেটা ভাবছি? নাকি চোখে রোদ চশমা দিয়ে, রোদ না দেখার ভাব করছি? কিন্তু তাতে কি রোদ অনুভব করছিনা? তাহলে কেনো এই ব্যপারটাকে এড়িয়ে যাচ্ছি? অনেকেই আছে বিয়ের আগে এরকম রিলেশানকে খারাপ চোখে দেখতো,কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর বিভিন্ন পরিস্থিতির কারনে পরকীয়ায় জরিয়ে যায়। পরকীয়া হলো যেখানে কোন আশা নেই, ভবিষ্যৎ নেই জেনেও ভালোবাসা।

তামান্না বিয়ে হয়েছে এক যুগের ও বেশী হবে। বাবা মা পছন্দ করে বিয়ে দিয়েছে,সুন্দর সংসার জীবন কাটছিলো তাদের। তামান্না সংসারে ডুবে ছিলো, নিজের দিকে দেখার কোন সময় ছিলোনা। নিজের শরীরের প্রতি অযত্নের ছাপ পরে গিয়েছে। হঠাৎ তামান্না খেয়াল করলো তার প্রতি তুহিনের আগ্রহ অনেক কম। আগের মতো করে কথা বলেনা। বাসায় ফিরে তাকে সময় দেয়না, মোবাইল, নেট এসব নিয়ে ব্যাস্ত। তামান্না কিছুদিন লক্ষ করার পর বুঝলো সে কোন এক মেয়ের সাথে জরিয়ে গেছে। এটা নিয়ে কথা বলতে গেলে সেটা সংসার ভাঙ্গার পর্যায়ে চলে যাবে, তাই নীরবে সহ্য করতে থাকে মেয়েটা। বাবা মার সন্মানের কথা আর বাচ্চাদের কথা ভেবে মেনে নেওয়া। এভাবে কাটছিলো জীবন, নিজের মাঝে কষ্ট গুলোকে জমিয়ে রেখে। হঠাৎ তামান্নার দেখা হয় ছোটবেলার বন্ধু রনির সাথে। ফোন নাম্বার টা নিয়ে রেখেছিলো। এর পর থেকে মাঝে মাঝে কথা হতো। ধীরে ধীরে নিজেদের কষ্টের কথা শেয়ার করতে লাগলো দুজন। একটা সময় দুজনই সেই ভালোলাগা অনুভব করতে শুরু করলো যাকে পরকীয়া ছাড়া কোন নাম দেওয়া যায় না। তাহলে পরকীয়া টা কেনো হচ্ছে? একে অপরের প্রতি কেয়ারিং, শেয়ারিং, ভালোবাসা, সময় না দেওয়া, মানসিক দূরত্ব আর একটু যত্নের অভাবেই পরকীয়ার জন্ম।

অনেক ক্ষেত্রে স্বামী- স্ত্রী র শারিরীক দূরত্বও পরকীয়ার কারন হয়ে যায়। মোট কথা একাকীত্ব বোধ থেকেই পরকীয়া শুরু। এই কারনেই কাজের ফাঁকে কথা বলতে ভালো লাগছে। অবসরে নিজের কষ্টের কথা গুলো শেয়ার করছে, যেখান থেকে হয় পরকীয়ার মতো ভালোবাসা । কখনও কখনও দেখাও করছে ভালো লাগার মানুষের সাথে, যেটা একটা পরিবার নষ্ট করছে খুব সহজেই। ভালো লাগার মানুষের কাছে তখন আর নিজের মানুষটাকে ভালো লাগছেনা, ছোট ছোট বিষয় গুলোতে রাগারাগি হচ্ছে, মনে মনে তুলনা করা হচ্ছে দুজনের মধ্যে, যে কারনে সংসার জীবন তাদের কাছে অসহনীয় মনে হতে থাকে। সাময়িক ভাবে হয়ত ভাল লাগছে, কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদী ফল কখনই ভালো নয়। সাময়িক প্রশান্তি সারাজীবনের অশান্তির কারন হয়ে যাচ্ছে। অন্যের বউকে সুন্দর লাগছে, নিজের বউকে কেনো লাগছেনা? নিজের পছন্দটা তাকে বুঝিয়ে বলেই তো হয়। দু-জন দুজনকে আলদা করে একটু সময় দিলেই তো হয়? অফিসের সহকর্মী মহিলার যে সাজ পোষাক তোমাকে মুগ্ধ করেছে, বাড়ি ফিরে মনে চোখ দিয়ে দেখো হতে পারে তোমার কাছের মানুষকে দেখে ঐ সহকর্মীর চেয়েও বেশী মুগ্ধ হয়েছো। এই একই কথা মেয়েদের ক্ষেত্রেও। আসলে পরকীয়া টা শুধু একটা মোহ, মরিচিকার পেছনে ছোটা। যেখানে জীবনের কোন সুখ, স্বাচ্ছন্দ,সন্মান কোনটায় পাওয়া যায় না।পরকীয়া থেকে যেটা পাওয়া যায় সেটা হলো অবিশ্বাস অনাস্থা,পারিবারিক অশান্তি, প্রতারনা,আর ডাষ্টবিন, নর্দমায় কুড়িয়ে পাওয়া কিছু অসহায় মৃতপ্রায় প্রান। নিজেরা একটু সচেতন হই নিজেদের প্রতি, পরিবারের প্রতি,নিজেদের মানুষ গুলোর প্রতি। একে অন্যের ভলোলাগা না লাগাগুলোকে সহজ করে দেখি তবেই হয়তো পরকীয়া নামের মরিচিকার মোহ অনেকটা কমে যাবে।

লিখেছেন : সাজিয়া আফরিন 

লেখিকার আরো অন্যান্য লেখা পরুনঃ হুতুমপেঁচা ম্যাগাজিন -এ।